পুড়ে গেল তিন কালের সাক্ষী মেরি এন্ডারসন

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০১৪, ২৩:৫৫

১৯৩৩ সালে কলকাতা শিপইয়ার্ডে জন্ম তার। ঘুরে বেড়িয়েছে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও মেঘনা নদীর বুকে। তিন কাল অর্থাত্ ব্রিটিশ শাসন, পাকিস্তান শাসন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সাক্ষী। তার কোলে চড়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন ব্রিটিশ বাংলার গভর্নর। ঘুরে বেড়িয়েছেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। হঠাত্ আগুন লাগলো শরীরে। পুড়ে গেল মেরী এন্ডারসন। জীবনের সাড়া নেই তাতে। না, কোন মানবীর গল্প এটি নয়। এটি এককালের বিলাসবহুল প্রমোদতরী ও অধুনা ভাসমান রেস্তোরাঁ ‘মেরী এন্ডারসন’- এর গল্প। গত বুধবার রাতে নারায়ণগঞ্জের পাগলায় বুড়িগঙ্গায় আগুনে সিংহভাগ পুড়ে যায় প্রায় শতাব্দী পুরনো এ জাহাজের। ঐতিহ্যবাহী তরীটিকে পুরনো আদলে সংরক্ষণের তাগিদ দিয়েছেন ইতিহাসবিদরা।

জাতীয় আর্কাইভস সূত্র জানা যায়, ব্রিটিশ শাসন আমলে বিলাসবহুল প্রমোদতরী হিসেবে নির্মিত হয়েছিল মেরী এন্ডারসন। এটি ছিল বাষ্পীয় ইঞ্জিন চালিত জাহাজ। শুরুতে এর নাম ছিল ‘স্টেট ইয়ট মেরী এন্ডারসন’। ১৯৩৩ সালে কলকাতা শিপইয়ার্ডে এর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। ১৫০ ফুট দীর্ঘ এ জাহাজ নির্মাণে তখন ব্যয় হয়েছিল এক লাখ ২৪ হাজার ৭০২ টাকা। বাংলায় নিযুক্ত ব্রিটিশ গভর্নরের ব্যবহারের জন্য এটি নির্মিত হয়েছিল।
জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া থেকে জানা যায়, ১৯৩৩ সালে বাংলার গভর্নর ছিলেন স্যার জন এন্ডারসন। জন এন্ডারসনের মেয়ে মেরী এন্ডারসনের নামে এর নামকরণ করা হয় ‘স্টেট ইয়ট মেরী এন্ডারসন’। শুরুতে প্রমোদতরী হিসেবে ব্যবহূত হলেও প্রায় তিন যুগ ধরে এটি ভাসমান রেস্তোরাঁ ও বার হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছিল। এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন। তবে পর্যটন করপোরেশনের একটি সূত্র জানায়, ইংল্যান্ডের রাণী এলিজাবেথ ১৯১৮ সালে ব্রিটিশ শাসন আমলে নৌপথে বাংলাদেশ ভ্রমণে এসে তত্কালীন সরকারকে জাহাজটি তার মা রাণী মেরীর নামে দান করেন। রাণীর মা মেরীর নামে জাহাজের নামকরণ করা হয়।
বাংলাপিডিয়া ও বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর পাকিস্তান আমলেও তত্কালীন পূর্ব বাংলার গভর্নর  মেরী এন্ডারসন ব্যবহার করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের ব্যবহারের জন্য এটি সংরক্ষিত ছিল। ঐতিহাসিক তরীটির যথার্থ ও সর্বাধিক ব্যবহারের লক্ষ্যে ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান এটিকে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করেন। করপোরেশন তরীটিকে একটি ভাসমান রেস্তোরাঁয় রূপান্তরিত করে। ১৯৭৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর এর উদ্বোধন করা হয়। নারায়ণগঞ্জ জেলার সদর উপজেলায় বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী পাগলায় মেরী এন্ডারসনকে নোঙ্গর করে রাখা হয়। মনোরম পরিবেশে ভাসমান রেস্তোরাঁ ও বার হিসেবে এটি ব্যবহূত হয়ে আসছিল। একটি দর্শনীয় স্থান ও চলচ্চিত্রের সুট্যিং স্পট হিসেবেও এটি পরিচিত।
দীর্ঘদিন ধরে যে স্থানে মেরী এন্ডারসন নোঙ্গর করে অবস্থান করছিল সেই স্থানেই জাহাজের অভ্যন্তরে গত বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা ফায়ার সার্ভিসের ৫টি ইউনিট সোয়া এক ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে রাত ১টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। কিন্তু ততক্ষণে জাহাজটির প্রায় পুরোটাই পুড়ে গেছে। তবে কোন হতাহতের সংবাদ পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের কাছ থেকে লিজ নিয়ে মেরী এন্ডারসন পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে হক ট্রেডার্স। এ প্রতিষ্ঠানের যৌথভাবে মালিক ঢাকার গুলশানের মাহামুদুল হক ও শ্যামল। তাদের প্রতিনিধি হিসেবে সালাউদ্দিন নামের এক ব্যক্তি ভাসমান রেস্তোরাঁ ও বারে মদের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন।
নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-পরিচালক মোমতাজ হোসেন জানান, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা ফায়ার সার্ভিসের ৫টি ইউনিট ও নৌ বাহিনীর একটি টিম প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও রেস্তোরাঁটির বেশিরভাগ অংশ পুড়ে গেছে। তবে আগুন লাগার কারণ নিশ্চিত করতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ। বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ব্যবস্থাপক নজরুল ইসলাম জানান, অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ৫ কোটি টাকা সমমূল্যের আসবাবপত্রের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জাহাজটি শত বছরের ঐতিহ্য। ক্ষতির পরিমাণ টাকার অঙ্কে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।
ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম বলেন, আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে দীর্ঘদিনের স্মারক চিহ্ন হিসেবে মেরী এন্ডারসন অস্তিত্বমান ছিল। ইতিহাসের প্রয়োজনে এটিকে পুরনো আদলে ফিরিয়ে এনে সংরক্ষণ করা জরুরি।

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান অপরূপ চৌধুরী ভস্মীভূত জাহাজটি পরিদর্শন করেন। তিনি জানান, জাহাজের নিচতলায় জেনারেটর ও দাহ্য পদার্থ থাকার কারণে মুহূর্তের মধ্যে আগুন ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ঘটনাটি তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে অগ্নিকাণ্ডের কারণ, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় ও জাহাজটি পুরনো আদলে ফিরিয়ে আনতে করণীয় সম্পর্কে রিপোর্ট দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।