ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগ অন্যান্য দেশের জন্য অনুসরণীয় হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল। গতকাল বৃহস্পতিবার ইতালির মিলানে দশম আসেম সম্মেলন শুরুর আগে এক বৈঠকে শেখ হাসিনার প্রশংসা করে জার্মান চ্যান্সেলর এই মন্তব্য করেন বলে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেসসচিব বিজন লাল দেব জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী বিজন পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হককে উদ্ধৃত করে টেলিফোনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সম্মেলন শুরুর আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন অ্যাঙ্গেলা মার্কেল।” বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করেন জার্মান চ্যান্সেলর।
বৈঠকে শেখ হাসিনা তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের কল্যাণে তার সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ মার্কেলের কাছে তুলে ধরেন। ২০০৯ সালে সরকারের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এই খাতের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ২২৬ শতাংশ বাড়ানোর কথাও বাংলাদেশের পোশাকের অন্যতম প্রধান ক্রেতা ইউরোপের দেশটির সরকার প্রধানের কাছে তুলে ধরেন তিনি। জার্মান চ্যান্সেলর সরকারের এই পদক্ষেপগুলোতে সন্তোষ প্রকাশ করেন বলে বিজন লাল দেব জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং স্থিতিশীলতা নিয়ে নিজের সন্তোষের কথাও তুলে ধরেন মার্কেল।
আসেম সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে, চীনের প্রধানমন্ত্রী লি খা ছিয়াং, কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেন এবং ব্রুনাইয়ের সুলতান হাসান আল বলখিয়াহর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন শেখ হাসিনা।
গ্রিসের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক
বাসস জানায়, গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টিনিও সি. সামারাস গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার ইতালির মিলানে শেখ হাসিনার সঙ্গে এক বৈঠকে গ্রিক প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির প্রশংসা করে বলেন, শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দশম আসেম শীর্ষ সম্মেলনের পাশাপাশি বাংলাদেশ মিটিং রুমে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠক শেষে পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক এ ব্যাপারে সাংবাদিকদের অবহিত করেন। এসময় প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সচিব বিজন লাল দেব উপস্থিত ছিলেন। পররাষ্ট্র সচিব বলেন, দুই নেতা খুবই উষ্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আলোচনা করেন। শেখ হাসিনা দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। শেখ হাসিনা বাংলাদেশ সরকারের দেয়া বিনিয়োগবান্ধব সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগের জন্য গ্রিসের প্রতি অনুরোধ জানান।
তিনি গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে বলেন, ১৯৭২ সালে যেসব ইউরোপীয় দেশ স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে গ্রিস তার মধ্যে অন্যতম। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তার সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের বর্ণনা দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এসব ইস্যুতে তার সরকার জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রেখেছে।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সাফল্যের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের বাস্তব পদক্ষেপের কারণে গত কয়েক বছর ধরে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ওপরে বজায় রয়েছে। গ্রিসে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা তাদের কল্যাণে আরো পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সামারাসের প্রতি অনুরোধ জানান। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা সরকারের কঠোর অবস্থানের প্রশংসা করেন সামারাস। এ প্রসঙ্গে দুই প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার মত প্রকাশ করেন। তারা এশিয়া ও ইউরোপের উন্নয়নেও একসঙ্গে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
শেখ হাসিনা গ্রিসের প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। আমন্ত্রণ গ্রহণ করে সামারাস শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানান এবং তাকেও গ্রিস সফরের আমন্ত্রণ জানান। বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবদুস সোবহান সিকদার এবং ইতালিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম শাহাদাত্ হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশে বিনিয়োগে ইতালির উদ্যোক্তাদের উত্সাহিত করার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রী রেনজির
বাসস জানায়, ইতালির প্রধানমন্ত্রী ম্যাট্টিও রেনজি বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগে তার দেশের উদ্যোক্তাদের উত্সাহিত করার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বিদেশি উদ্যোক্তাদের উত্সাহিতকরণে উন্মুক্ত বিনিয়োগ নীতি বজায় রাখার জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করেন।
মিলানে দশম আসেম শীর্ষ সম্মেলনের পাশাপাশি গতকাল মিলান কংগ্রেসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে ইতালির প্রধানমন্ত্রী এই আশ্বাস দেন।
বৈঠক শেষে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক এ ব্যাপারে সাংবাদিকদের অবহিত করেন। এসময় প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সচিব বিজন লাল দেবও উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ ও ইতালির মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ৭০ কোটি মার্কিন ডলারের কাছাকাছি উল্লেখ করে ম্যাট্টিও রেনজি বলেন, আরো উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে এই পরিমাণকে দ্বিগুণ এমনকি তিনগুণও করা যেতে পারে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি এ খাতের উন্নয়নে অব্যাহত সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিলান কংগ্রেসের বাংলাদেশ মিটিং রুমে সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন লফভেনের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে বিশেষ করে জাহাজ নির্মাণ শিল্পে সুইডেনের আরো বিনিয়োগ কামনা করে বলেন, এই খাতে বিনিয়োগে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি শিক্ষাখাতে তার সরকারের সাফল্যের কথা উল্লেখ করে এখাতেও বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
বৈঠকে সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভে ৪০ বছর পূর্তির কথা উল্লেখ করে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ভূমিকার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন।
আলোচনার এক পর্যায়ে স্টিফেন লফভেন অটিজম প্রসঙ্গ তোলেন এবং বিশ্বব্যাপী এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা হোসেন পুতুলের ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি সায়মাকে তাঁর শুভেচ্ছা পৌঁছে দিতে শেখ হাসিনাকে অনুরোধ জানান। এসময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব আবদুস সোবহান সিকদার এবং ইতালিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শাহাদাত্ হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
