ইবোলা ভাইরাস ঠেকাতে দেশের বিমান, সমুদ্র ও স্থলবন্দরগুলোতে সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। ইতিমধ্যে সরকার এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। বিমানবন্দরগুলোতে থার্মালস্ক্যানার মেশিন স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিমান, সমুদ্র ও স্থলবন্দরে ২৫টি শক্তিশালী মেডিক্যাল টিম কাজ করছে। সার্বক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আর যাত্রীদের সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহ করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ। আক্রান্ত দেশসমূহ থেকে বিমানে ওঠার আগে যাত্রীদের তালিকা ইমিগ্রেশনে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জানা গেছে, এ বিষয়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থার অংশ হিসাবে বিমানবন্দরে অবতরণের পর প্রত্যেক যাত্রীকে একটি ফরম পূরণ করতে হবে। ওই ফরমে বিগত ২১ (তিন সপ্তাহ) দিন যাত্রীরা কোথায় কোথায় অবস্থান করেছেন তার বিবরণ দিতে হবে। বিমান কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের উদ্দেশে ওই ফরম পূরণের জন্য ঘোষণা দেবেন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাত্রীর ব্যাপারে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ হবে। এছাড়া বিদেশ থেকে আসা কিংবা বিদেশ যেতে ইচ্ছুক কোন যাত্রীর শরীরে জ্বর, বমি অথবা শরীরের কোনো স্থান থেকে রক্তক্ষরণ দেখা গেলে তাকে বিশেষ মেডিক্যাল টিমে চিকিত্সা দেয়ার নির্দেশনা রয়েছে। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ লাইবেরিয়া, সিয়েরালিওন, গিনি, নাইজেরিয়া ও সেনেগাল থেকে আসা যাত্রীদের দিকে বেশি নজর দিচ্ছে মেডিক্যাল টিম। এতো নজরদারির পরও ইবোলা ভাইরাস নিয়ে আতঙ্ক কাটছে না। কিছু যাত্রী তথ্য গোপন করার চেষ্টা করছেন - এটা আতঙ্কের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অবশ্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, আগেও বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস মোকাবিলায় দেশের চিকিত্সকরা সক্ষমতা দেখিয়েছেন। তাই ইবোলা সংক্রমণ প্রতিরোধেও তারা সফল হবেন। এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। মোহাম্মদ নাসিম ইবোলা সংক্রমণ প্রতিরোধে থার্মালস্ক্যানার মেশিনসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয়ে আর্থিক সহায়তা দিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
গত ৫ ও ৬ অক্টোবর লাইবেরিয়া থেকে পাঁচজন যাত্রী দেশে আসেন। কোন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই বিমানবন্দর থেকে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। পরে এটি নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে তিন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করা হয়। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানান, অনেক যাত্রী আক্রান্ত দেশসমূহ থেকে দেশে ফিরলেও তারা বিষয়টি গোপন রাখছেন। এটা বড় টেনশনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতিমধ্যে মাদারিপুরের কালকিনির চারজন, বরিশালের গৌরনদীর একজন ও খুলনার এক যাত্রী লাইবেরিয়া থেকে দেশে ফিরে গোপনে গ্রামের বাড়িতে চলে যান। পরবর্তীতে ঐসব গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এই ছয় যাত্রীকে ঢাকায় এনে তাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে এবং ২১ দিন নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। এ পর্যন্ত ইবোলা ভাইরাসের কোন লক্ষণ তাদের মধ্যে দেখা যায়নি। তারা এখন মুক্ত। গতকাল পর্যন্ত লাইবেরিয়া, গিনি, সিয়েরা লিওন ও নাইজেরিয়া থেকে আসা ১৭০ যাত্রীকে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। তাদেরও ২১ দিন বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। তবে এখন পর্যন্ত কারো মধ্যে ইবোলা ভাইরাসের লক্ষণ দেখা যায়নি।
এদিকে মরণব্যাধি ইবোলা প্রতিরোধে এখনো কাঙ্ক্ষিত তহবিল জোগাড় না হওয়ায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে আবারো জরুরি ভিত্তিতে তহবিল প্রদানের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে একশ’ কোটি ডলারের জন্য আবেদন জানানো হলেও জাতিসংঘ তহবিলে মাত্র এক লাখ ডলার জমা পড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান ইবোলা ভাইরাস সম্পর্কে আক্ষেপ করে বলেছেন, পশ্চিম আফ্রিকায় যখন ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়েছিল, বিশ্বের শক্তিশালী দেশসমূহের তখন ঘুম ভাঙ্গেনি। তারা এর প্রতিরোধে জোরালোভাবে এগিয়ে আসেনি। যেইমাত্র আমেরিকার একজন মারা গেছেন তখনই আমেরিকাসহ বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর টনক নড়েছে এবং প্রতিরোধ কার্যক্রমে তারা জোরালো ভূমিকা রাখছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বলা হয়েছে, আক্রান্ত চারটি দেশসহ উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা পশ্চিম আফ্রিকার ১৫টি দেশকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখা হয়েছে। নতুন করে এসব দেশে যাতে সংক্রমণের ঘটনা না ঘটে সে জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, পশ্চিম আফ্রিকার কয়েকটি দেশ থেকে ছড়িয়ে পড়তে থাকা ইবোলা ভাইরাসে মাত্র ৭ মাসে সাড়ে চার হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছে। লাইবেরিয়া, গিনি, সিয়েরা লিওনে ইবোলা আক্রান্ত হয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। মানুষের বর্জ্যবাহিত এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে স্বীকৃত কোনো ওষুধ না থাকায় রোগটিকে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাস প্রতিরোধে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে ব্যাপক সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ইবোলা প্রতিরোধে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর ও বিমানবন্দরে সার্বক্ষণিকভাবে দু’টি মেডিক্যাল টিম কাজ করছে। সমুদ্রবন্দর ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থাকায় চট্টগ্রাম ইবোলা ভাইরাসের ঝুঁকির মধ্যে থাকলেও এ পর্যন্ত এ ভাইরাসে আক্রান্ত কারো সন্ধান পাওয়া যায়নি। মেডিক্যাল টিমে কর্তব্যরত চিকিত্সকরা জানান, ইবোলা ভাইরাস আক্রান্ত আফ্রিকার পাঁচটি দেশের কোনো নাগরিক চট্টগ্রামে আসা মাত্রই তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। চিহ্নিত পাঁচটি দেশ থেকে আগত যাত্রীরা ছাড়াও প্রয়োজনে অন্যান্য যাত্রীদেরও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সরফরাজ খান চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, দেশের বৃহত্তম সমুদ্র বন্দর এবং একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থাকায় চট্টগ্রামে ইবোলা ভাইরাসের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। প্রতিদিনই সমুদ্র বন্দর দিয়ে অসংখ্য বিদেশি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আসছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ইবোলা প্রতিরোধে চট্টগ্রামে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।
সিলেটে অফিস জানায়, ইবোলা ভাইরাস ঠেকাতে সিলেটে ব্যাপক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সিভিল সার্জন অফিস জানায়, সিলেটের বিভিন্ন ইমিগ্রেশন পয়েন্টে মেডিক্যাল টিমকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটে এখন পর্যন্ত ইবোলার রোগীর কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। সিলেটের সিভিল সার্জন আজহারুল ইসলাম গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে মেডিক্যাল টিম কাজ করছে। এছাড়া তামাবিল, সুতারকান্দি, জকিগঞ্জ স্থলবন্দর দিয়ে যারাই ঢুকছে-ইমিগ্রেশনে আগেই তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে।
বেনাপোল (যশোর) সংবাদদাতা জানান, বেনাপোল চেকপোস্টে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা কেন্দ্রে ইবোলা ভাইরাস সনাক্তকরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। যশোরের সিভিল সার্জন ডা. আতিকুর রহমান জানান, বেনাপোল চেক পোস্টে ইবোলা ভাইরাস সনাক্তকরণের কাজ চলছে। সন্দেহভাজন কোন রোগী দেখলে তাকে যশোর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
