সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও জীবন-যাপন প্রণালির অভাবে উন্নত বিশ্ব অপেক্ষা দেশে অধিক সংখ্যক তরুণী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। দেশের স্তন ক্যান্সার রোগীর মধ্যে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ তরুণী। ধারণা করা হয়— ফাস্ট ফুডের আসক্তি, শাক-সবজি ও ফল-মূল খাওয়ায় অনিহা, ভেজাল খাদ্য গ্রহণ ও নিয়মিত ব্যায়াম বা হাঁটার অভ্যাস না থাকায় এই শ্রেণির মেয়েরা স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে।
জাতীয় ক্যান্সার নিস্টিটিউটের ২১ বছর বয়সের এক স্তন ক্যান্সার রোগী। তিনি বুকে একটি বড় চাকা নিয়ে এখানে চিকিত্সার জন্য আসেন। সবে কয়েক মাস তার বিয়ে হয়েছে। স্বামী পরিবারের সবাই তাকে নিয়ে চিন্তিত। তার শাক-সবজি খেতে কখনই ভালো লাগে না। তার চিকিত্সক জানান বুকের ক্যান্সার তার ফুসফুসেও আক্রমণ করেছে। ফুসফুসে একটি চাকা আছে। প্রথমে বুকে, পরে তার ফুসফুসে অপারেশন হবে। তিনি একজন ঝুঁকিপূর্ণ রোগী। আর এক রোগীর বয়স ১৮ বছর। তিনি বাঁ বুকে একটি চাকা অনুভব করে মাকে জানান। মা তাকে জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে নিয়ে আসেন। পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া যায়, তার ক্যান্সার হয়েছে। তার মা জানান— মেয়ে ফাস্ট ফুড বেশি খেত। এমন অনেক তরুণী জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে স্তন ক্যান্সার চিকিত্সা নিচ্ছেন।
উন্নত বিশ্বে ত্রিশ বছর পরে এমনকি চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ বছর বয়সে স্তন ক্যান্সার ঝুঁকি থাকে। দেশে এই উল্লেখিত বয়সের নারীদের স্তন ক্যান্সার হলেও তরুণীদের মধ্যেও স্তন ক্যান্সার বেড়ে চলেছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বিজ্ঞজনেরা। তারা বলেন— ত্রিশের পরে বা চল্লিশ কিংবা পঞ্চাশ বছরে হওয়া স্তন ক্যান্সারের চেয়ে তরুণীদের স্তন ক্যান্সার বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে থাকে। যত কম বয়সে স্তন ক্যান্সার, তত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তারা। এই বিষয় জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের স্টো প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. গোলাম মোস্তাফা ইত্তেফাককে বলেন— টিনএজার ক্যান্সার রোগীদের গ্রাম-শহর সব জায়গায় দেখো যায়। এর কারণ হিসেবে বর্তমানে ভেজাল খাদ্য গ্রহণ অন্যতম বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন— বংশগত ক্যান্সার ছাড়াও শহরে এই বয়সের মেয়েদের মধ্যে ফাস্ট ফুড প্রীতি স্তন ক্যান্সার ঝুঁকি বাড়ায়। এ ছাড়া, দুই-এক তলার জন্য সিঁড়ি না ব্যবহার করে লিফট ব্যবহার, হাঁটার অভ্যাস কম, নিয়মিত ব্যায়াম না করা ও কায়িকশ্রম কম করা টিনএজাররা ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। তারা মাদকাসক্ত কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মাদকগ্রহণ স্তন ক্যান্সারের একটি কারণ বটে তবে আমরা তাদের কাছে এই বিষয় প্রশ্ন করি না। তিনি বলেন, আর্ন্তজাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা গ্লোবক্যানের পরিসংখ্যান মতে দেশের স্তন ক্যান্সারে প্রতিবছর ১৭ হাজার ৭৮১ জন নারী আক্রান্ত হন এবং এই কারণে ৮ হাজার ৩৯৬ জন নারীর মৃত্যু ঘটে। তবে ধারণা করা হয়— প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি। সংশ্লিষ্ট চিকিত্সকের হিসাব মতে প্রতিবছর ৩৬ হাজার রোগী স্তন ক্যান্সারের কারণে মারা যায়। এদের মধ্যে টিএনএজারদের সংখ্যা সাড়ে পাঁচ হাজারের মত। তবে সঠিক পরিসংখ্যান নাই বলে তাদের ধারণার ওপর কাজ করতে হয়। উন্নত দেশে টিএনজারদের মধ্যে স্তন ক্যান্সারের আক্রান্তের সংখ্যা শতকরা ১ থেকে ২ শতাংশ হলেও আমাদের দেশে তা অনেক বেশি।
টিনএজার স্তন ক্যান্সার আক্রান্ত হলে, তা নিরাময় কতটুকু সম্ভব— এমন এক প্রশ্নের জবাবে শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ব বিদ্যালয়ের গাইনি ক্যান্সার বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সাবেরা খাতুন বলেন— স্তন ক্যান্সারের চারটি স্তর নির্ধারণ করে আমরা চিকিত্সা করি। ফাস্ট স্টেজে ধরা পরলে, রোগ নিরাময় সম্ভব। আর অন্য স্তরগুলোতে পর্যায়ক্রমে জটিল থেকে জটিলতর অবস্থা থাকে। ফলে রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়। টিনএজ স্তন ক্যান্সার রোগীদের চিকিত্সা সর্ম্পকে তিনি বলেন, দুভাবে আমরা রোগীদের চিকিত্সা করি। প্রথমে ক্যামোথেরাপি দিয়ে চাকাটা ছোট করে অপারেশন করি। ক্যান্সারের প্রাদুর্ভাবের প্রকোপ থেকে রোগীকে রক্ষা করি। পরে প্রয়োজন বোধে রেডিও থেরাপিও দেয়া হয়। এ ক্ষেত্রে রোগী নিজে চাকা অনুভব করে পরে অভিভাবকদের জানান। অভিভাবক চিকিত্সকের কাছে আনতে আনতে রোগ ছড়িয়ে পড়ে। তারা বিষয়টি সর্ম্পকে সচেতন না হওয়ায় দ্রুতই তা অন্যত্র চলে যায়। ফলে বেশির ভাগ সময়ে তারা দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ পর্যায়ে চিকিত্সকের কাছে আসে।
সাবেরা খাতুন বলেন— আমি অনেক নারীকে দেখেছি স্তনে চাকা দেখা দিলে তারা শুরুতে হোমিওপ্যাথি চিকিত্সা নেন। এতে ঝুঁকি আরো বেড়ে যায়। টিভিতে অনেক লতা-পাতার ওষুধ দিয়ে ক্যান্সার নিরাময়ের বিজ্ঞাপন দেখানো হয়। তিনি এই সব প্রচারণা থেকে সবাইকে দূরে থাকতে পরামর্শ দেন। অধ্যাপক মো. গোলাম মোস্তাফা আরো বলেন, আগেই বলেছি যত কম বয়সে স্তন ক্যান্সার, তত বেশি অ্যাগ্রেসিভ হয়। চল্লিশ-পঞ্চাশ কিংবা ষাটোর্ধ্ব বয়সে স্তন ক্যান্সার নিরাময় সহজ। এ বয়সের রোগীরা অনেক দিন ক্যান্সার সারভাইভাল হিসেবে বেঁচে থাকতে পারে, যা অল্প বয়সে স্তন ক্যান্সার আক্রান্তদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে হয় না। চিকিত্সা করেও পাঁচ বছরের অধিক সময় তাদের বাঁচিয়ে রাখা যায় না।
