টেকসই উন্নয়নের জন্য গ্রামের উন্নয়ন জরুরি

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০১৪, ২৩:৫৫
আমি পারি,
আমরা পারি, আমার দেশ পারে—
হতে হবে
মূলমন্ত্র
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. এপিজে আবদুল কালাম সমৃদ্ধির জন্য প্রত্যেকটি দেশের ভিশন, মিশন থাকা এবং তা বাস্তবায়নে কঠোর শ্রমের প্রয়োজনীয়তা ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেতাকে অপ্রত্যাশিত বাস্তবতার সময়েও শক্ত মনোবল নিয়ে এগুতে হবে। কাজের ব্যর্থতায় এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে হতে হবে সাহসী। ব্যবস্থাপনায় মহত্বের পরিচয় দিতে হবে। নেতার সব কাজ স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত হতে হবে। পাশাপাশি তাকে সত্ হতে হবে। সব সময় নিজের মধ্যে পুষতে হবে একটি বিশ্বাস ‘আমি পারি, আমরা পারি এবং আমার দেশই পারে’। এ ধরনের মনোভাব শিক্ষাক্ষেত্র থেকে শিক্ষকদেরকেই তৈরি করে দিতে হয়। আর দৃঢ় মনোবল সম্পন্ন সত্ নেতাই পারে একটি দেশ ও জাতিকে সমৃদ্ধশালী বানাতে। তিনি বলেছেন, একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য গ্রামের উন্নয়ন জরুরি।
গতকাল শনিবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) ১১০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এমসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট রোকেয়া আফজাল রহমানের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী। অনুষ্ঠানে দেশের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ, অর্থনীতিবিদ ও নানা পেশার শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
ড. এপিজে আবদুল কালাম বলেন, পরিবার ও শিক্ষাক্ষেত্র থেকে ছাত্রদের মধ্যে ভালো মানসিকতা  লালন করার শিক্ষা দিতে হবে। ভালো মানসিকতা থেকে ভালো চরিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠবে। যা একটি দেশকে শান্তি ও সমৃদ্ধি আনতে সহায়ক হবে। তিনি বলেন, একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য গ্রামাঞ্চলের উন্নয়ন করা জরুরি। শহরের মতো প্রযুক্তি ও শিক্ষাগত সুযোগ দিলে গ্রামাঞ্চল হয়ে উঠবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান নিয়ামক। ভারত ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাণিজ্যের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধির অনেক সুযোগ রয়েছে। যেসব প্রতিবন্ধকতার জন্য বাণিজ্য বাড়ছে না তা আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান করা প্রয়োজন। বর্তমানে বাংলাদেশের ১৫ শতাংশ আমদানি আসে ভারত থেকে। প্রতিবছর দুই দেশের মধ্যে ৬ বিলিয়ন ডলার বাণিজ্য হয়। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন এ বাণিজ্য ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশিও হওয়া সম্ভব। এ বাণিজ্য হলে দুই দেশই লাভবান হবে। ড. এপিজে আবদুল কালাম বলেন, বিশ্ব থেকে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার নিরসন করে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ও ভারত একসঙ্গে কাজ করতে পারে। কারণ পাট উত্পাদনে বাংলাদেশের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে ভারতের পাট শিল্পও সম্ভাবনাময়ী। এ বিষয়ে দুই দেশের বেসরকারি খাত এগিয়ে আসতে পারে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে বন্ধুত্ব বিরাজমান উল্লেখ করে এপিজে আবদুল কালাম বলেন, ৫৪টি নদী এ দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব বৃদ্ধি করেছে। বড় দু’টি নদী গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র এ দুই দেশের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে। বিশ্বের সর্ববৃহত্ ম্যানগ্রোভ বনেও এ দুই দেশ অংশীদার। সাংস্কৃতিক দিক থেকে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কবি নজরুল ইসলাম দুই দেশের মধ্যে অভিন্ন ধারা তৈরি করেছে। এপিজে আবদুল কালাম বলেন, সার্ক অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য কিছু সুযোগ রয়েছে। এ অঞ্চলে মোট ১৪৭ কোটি মানুষ বাস করে। যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ২৫ ভাগ। তাছাড়া এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত অনেক মিল রয়েছে। যা ব্যবসায়িক উন্নয়নের জন্য খুবই ইতিবাচক।
তিনি বলেন, বর্তমানে বিশ্ব যেসব ঝুঁকি মোকাবেলা করছে সেগুলো হলো- দরিদ্রতা, অশিক্ষা, নিরাপদ খাবার পানির অভাব, সম্পদের অদক্ষ বণ্টন, মূল্যবোধ ভিত্তিক মানসম্পন্ন শিক্ষার অভাব এবং সুচিকিত্সার অভাব। এ বিষয়গুলোকে সব দেশ মিলে মোকাবেলা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, বিশ্বের সার্বিক উন্নয়নের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে উন্নয়নের একটি ভিশন থাকতে হবে। গ্রাম ও শহর, ধনী ও দরিদ্র এবং উন্নত ও উন্নয়নশীলদের মধ্যে পার্থক্য যেন সংকীর্ণ হয়ে আসে। এনার্জি ও সুপেয় পানির পর্যাপ্ত ও দক্ষ বণ্টন নিশ্চিত হতে হবে। সব দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। মূল্যবোধ ভিত্তিক শিক্ষা, সুচিকিত্সা, সুশাসন, দুর্নীতি মুক্ত পরিবেশ তৈরি এবং শিশু ও নারীদের জন্য অত্যাচারমুক্ত সমাজ গড়তে হবে। বিশ্বব্যাপী পরিবেশ বান্ধব অর্থনীতি এবং সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গড়তে হবে। বিশেষ করে সার্কভুক্ত অঞ্চলের জনগণ যেহেতু সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ তাই এখানে সম্পদের বণ্টনে বেশি দক্ষতা থাকা প্রয়োজন। এসব কিছু সম্ভব করতে পিইউআরএ (প্রোভাইডিং আরবান এমিনিটিস ইন রুরাল এরিয়াস) বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। এটাই হতে পারে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন ঝুঁকি মোকাবেলার উপায়।
পিইউআরএ হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতিতে চার ধরনের যোগাযোগ বাড়ানোর একটি প্রক্রিয়া। প্রথমত, অবকাঠামোগত সরাসরি যোগাযোগ (ফিজিকাল কানেকটিভিটি), ইলেক্ট্রনিক যোগাযোগ, জ্ঞানের প্রসার এবং অর্থনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করা। এসবের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে শহরের সব ধরনের আধুনিক সুবিধা পৌঁছে দিতে হবে। এপিজে আবদুল কালাম বলেন, শহর অঞ্চলের সাথে গ্রামাঞ্চলের ভালো সড়ক ব্যবস্থা এবং রেলওয়ের মাধ্যমে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করতে হবে। এছাড়া গ্রামে মানসম্মত স্কুল, কলেজ এবং হাসপাতাল থাকা প্রয়োজন। গ্রামাঞ্চলে আধুনিক প্রযুক্তির সহজপ্রাপ্তি এবং প্রশিক্ষণের সুযোগ থাকতে হবে। এছাড়া সব ধরনের জ্ঞান অর্জনের সব মাধ্যম ও সুযোগ থাকা প্রয়োজন। এগুলো নিশ্চিত করা সম্ভব হলে গ্রামাঞ্চলের উন্নয়ন হবে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিনিয়োগের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলও অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখবে। এ ধরনের উন্নয়ন হবে দেশের টেকসই উন্নয়ন।

বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসের যে ঝুঁকি তা দূর করতে তিনি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, দরিদ্রতা না থাকলে সন্ত্রাসের প্রবণতাও কমে আসবে। আর দরিদ্রতা থাকলে সন্ত্রাসের প্রকোপ বেড়ে যায়। সাবেক তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদের এক প্রশ্নের জবাবে সন্ত্রাস দমনে করণীয় সম্পর্কে তিনি এ কথা বলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিন আহমেদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঢাকার ওপর চাপ কমাতে কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পকে শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি গ্রামের উন্নতি করতে হবে।