নাটোরে দুটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩৩ জন নিহত ও অর্ধশতাধিক যাত্রী আহত হয়েছে। বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া-হাটিকুমরুল সড়কের রেজুর মোড়ে গতকাল সোমবার বেলা সাড়ে তিনটায় কেয়া পরিবহন ও অথৈ পরিবহনের দুটি বাসের সংঘর্ষে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। আহতদের রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বড়াইগ্রাম স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, নাটোর সদর হাসপাতাল, বনপাড়া আমেনা হাসপাতাল, পাটোয়ারী হাসপাতাল ও জয়নব হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগই ছিল অথৈ পরিবহনের যাত্রী। তবে বাস দুটিতে ঠিক কতো যাত্রী ছিল তা এখনো জানা যায়নি।
এদিকে, দুই বাসের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা খতিয়ে দেখতে নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) এবং বিআরটিএ-র সহকারী পরিচালক। কমিটিকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
নাটোর ফায়ার সার্ভিস, হাইওয়ে পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা রাজশাহীগামী কেয়া পরিবহনের বাসটি একটি ট্রাককে ওভারটেক করার সময় নাটোর থেকে গুরুদাসপুরগামী অথৈ পরিবহনের বাসটির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। কেয়া পরিবহনের বাসটির ঠিক পিছনে প্রাইভেটকারে থাকা বড়াইগ্রামের ব্যবসায়ী মাজেদুল ইসলাম নয়ন বলেন, রেজুর মোড়ে বিকট শব্দে বাস দুটির সংঘর্ষ ঘটে। পরে বাস দুটি ছিটকে সড়কের দুই পাশের দুটি গর্তে পড়ে। দুমড়ে মুচড়ে যায় বাস দুটি। রক্তাক্ত হতাহত যাত্রীদের সড়কে, বাসের ভেতর ও বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। সে এক ভয়াবহ দৃশ্য।
জানা গেছে, আহতদের চিত্কার-আর্তনাদ ও দুর্ঘটনার শব্দে এলাকাবাসী ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। খবর পেয়ে নাটোর, লালপুর ও দয়ারামপুর ফায়ার সার্ভিস ও থানা এবং হাইওয়ে পুলিশ দ্রুত ছুটে আসে। এলাকাবাসীর সহায়তায় তারা উদ্ধার তত্পরতা শুরু করে। রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ৩৩ জন নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বনপাড়া পুলিশ ফাঁড়িতে রাখা ছিল ২৫ জনের মৃতদেহ, নাটোর সদর হাসপাতালে ৫ জনের এবং বড়াইগ্রাম স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ছিল ৩ জনের মৃতদেহ।
এদিকে নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালের এক চিকিত্সকের ওপর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হামলার প্রতিবাদে গতকাল কর্মবিরতি কর্মসূচি থাকলেও প্রশাসনের অনুরোধে তাত্ক্ষণিক চিকিত্সকরা আহতদের চিকিত্সা সেবায় এগিয়ে আসেন। ঘটনার পরপরই নাটোর জেলা প্রশাসক মশিউর রহমান, পুলিশ সুপার বাসুদেব বণিক, বড়াইগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ একরামুল আলম, বড়াইগ্রাম পৌর মেয়র ইসাহাক আলী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
নিহতদের মধ্যে কয়েকজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার জোনাইল ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক আওয়ামী লীগ নেতা জামাল হোসেন (৪০), তার মেয়ে জান্নাতী (৫), একই উপজেলার বাজিতপুর গ্রামের আলাল উদ্দিন, সংগ্রাম পুরের আব্দুর রহমানের স্ত্রী আতিকা বেগম, খোকসা গ্রামের কৃষ্ণ পদ সরকার (৫৫), ইন্দ্রাপাড়া গ্রামের জান মোহাম্মদ (৪৮), গুরুদাসপুর উপজেলার সিধুলী গ্রামের এবাদ আলী (৪৫), শরীফ উদ্দিন (৩০) লাবু, (৩৫), আলাল (৫৫), সোহরাব হোসেন, আয়নাল হক (৩৫), সতের আলী প্রামাণিকের দুই ছেলে রব্বেল আলী (৪৫) ও আতাহার আলী (৫০), বৃচাপিলা গ্রামের বাবুল (৪০), আব্দুল আওয়াল (৩০), তেলটুপি গ্রামের আবু সাইদের মেয়ে মোহনা খাতুন (৫), অথৈ পরিবহনের চালক আলম হোসেন (৪০), গুরুদাসপুরের জাকের আলী ও হানিফ।
অথৈ পরিবহনের যাত্রীদের মধ্যে বেশির ভাগই সিধুলী গ্রামের ডা. ইয়ারুল ও আমিরুল ইসলাম জোড়া খুনের মামলায় নাটোর কোর্টে হাজিরা দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন বলে জানা গেছে।
প্রাণহানিতে রাষ্ট্রপতির শোক
রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ নাটোরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানিতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। গতকাল এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে আহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তাদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।
প্রধানমন্ত্রীর শোক
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলায় মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানিতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। গতকাল এক শোকবার্তায় তিনি নিহতদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। প্রধানমন্ত্রী দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত সুচিকিত্সার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। আহতদের সু-চিকিত্সা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। বিরোধী দলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মো. মসিউর রহমান রাঙ্গা সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানিতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
চিকিত্সার নির্দেশ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়াস্থ মহাসড়কের রাজ্জাক মোড়ে দুটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে হতাহতদের চিকিত্সা সেবা নিশ্চিত করতে রাজশাহী, নাটোর, বগুড়া ও পাবনাসহ আশপাশের সকল হাসপাতালের ডাক্তারদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। এ সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯ জন নিহত হওয়ায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন। একইসঙ্গে তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, আহতদের চিকিত্সা নিশ্চিত করতে নাটোর ও আশপাশের জেলার সিভিল সার্জনদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে কারো অবস্থা খারাপ হলে এ্যাম্বুলেন্সযোগে দ্রুত ঢাকা নিয়ে আসার নির্দেশও দেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় কেউ যেন চিকিত্সাহীনতায় না ভোগে তা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
