বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজে জাল সনদে চাকরি নেয়া শিক্ষকদের চাকরিচ্যুত করার উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরসহ সরকারি যেসব কর্মকর্তা জড়িত তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) ইতিমধ্যে জাল সনদধারী দুইশ শিক্ষকের সন্ধান পেয়েছে। আরো যাচাই-বাছাই শেষে জাল সনদধারী শিক্ষকদের চাকরিচ্যুত করা হবে। প্রতিদিনই নতুন নতুন জাল সনদধারী শিক্ষক শনাক্ত করা হচ্ছে বলে ডিআইএ-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি ছাড়াও শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিনিধি হিসাবে সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক, উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও সংশ্লিষ্ট স্কুলের প্রধান শিক্ষক উপস্থিত থাকেন। কলেজে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ থাকেন। এছাড়া একজন শিক্ষককে এমপিওভুক্তির সময় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী জড়িত থাকেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, জাল সনদ দিয়ে নিয়োগ ও এমপিওভুক্তি হলে এসব কর্মকর্তারা কোনভাবেই দায় এড়াতে পারেন না। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় জড়িতদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যু?গ্ম-সচিব (অডিট ও আইন) রঞ্জিত কুমার সেন বলেন, জাল সনদে নিয়োগ প্রক্রিয়া ও এমপিওভুক্তিতে যেসব সরকারি কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সদস্য জড়িত থাকেন, তাদের সকলের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তিনি জানান, কারো সনদ জাল হলেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। একাধিক তদন্তের মাধ্যমেই জাল সনদের বিষয়টি প্রমাণ করা হবে। কারো হয়রানি হওয়ার সুযোগ থাকবে না।
ডিআইএ-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কম্পিউটার প্রশিক্ষণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জাল সনদ দেখিয়ে শিক্ষকরা চাকরি নিয়েছেন। বিভিন্ন তদন্তের মাধ্যমে এটি প্রমাণিত হয়েছে। এসব শিক্ষক সরকারি তহবিল থেকে পাঁচ কোটি টাকার বেশি তুলে নিয়েছেন।
কিভাবে জাল সনদ প্রমাণ করা হয়- এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির উপ-পরিচালক মো. রাশেদুজ্জামান বলেন, কোন অভিযোগ পাওয়ার পর মূল সনদ সংগ্রহ করে সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে তা পাঠিয়ে জানতে চাওয়া হয়, এই সনদ জাল কিনা। এ বিষয়ে সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান যেটিকে জাল বলবে, সেটিই জাল হিসাবে প্রমাণিত হয়। সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানই নিশ্চিত করতে পারে- কোন সনদ জাল বা কোনটি প্রকৃত সনদ।
শরিয়তপুরের সখিপুর ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সালাহউদ্দিনের বিএ সার্টিফিকেট জাল হিসাবে প্রমাণ করেছে ডিআইএ। তিনি সরকারি তহবিল থেকে নয় লাখ ৭৫ হাজার টাকা তুলে নিয়েছেন বলে ডিআইএ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সালাহউদ্দিন বলেন, ২৪ বছর ধরে চাকরি করছি। কোন অন্যায় করিনি। ডিআইএ মিথ্যা তথ্য দিয়েছে। আমার কাছে জবাব চেয়েছে। জবাব দিয়েছি। ডিআইএ-এর রিপোর্টের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট মামলা করেছি।
টাঙ্গাইলের ঘোনারচালা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মারুফা আক্তার শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার জাল সার্টিফিকেট জমা দিয়ে চাকরি নিয়েছেন। পরবর্তীতে ডিআইএ-এর তদন্ত শেষ হবার পরপরই পরিবারিক সমস্যা দেখিয়ে চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। প্রতিষ্ঠানটির সহকারী প্রধান শিক্ষক কাদের মর্তুজা বলেন, হয়তো সার্টিফিকেটে সমস্যা আছে এ কারণেই মারুফা আক্তার চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। আমরা ডিআইএ-এর রিপোর্টের বিষয়টি জেনে মারুফা আক্তারের কাছ থেকে বেতন হিসাবে নেয়া দুই লাখ টাকা আদায় করেছি।
জানতে চাইলে মাউশির পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) অধ্যাপক আতাউর রহমান বলেন, ২০০৫ সালের পূর্বে বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে শিক্ষকরা এমপিও পেয়েছেন। ওই সময় কেউ যদি জাল সনদ দিয়ে এমপিওভুক্ত হন, তার দায় ভার ব্যানবেইসের। তবে ২০০৫ সালের পর কোন অনিয়ম হলে দায়ভার মাউশির।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মাউশির কোন পর্যায়ের কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট থাকেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এমপিওভুক্ত হতে হলে গর্ভনিং বডির রেজুলেশন, নিয়োগ পরীক্ষার ফল, কাজে যোগদানপত্র, প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতির কাগজপত্রসহ প্রতিষ্ঠান প্রধানের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। এই আবেদন প্রথমে কলেজ পর্যায়ের হলে উপ-পরিচালক (কলেজ-২) এবং স্কুলের হলে উপ-পরিচালক (মাধ্যমিক)-এর কাছে পাঠানো হয়। তারা সংশ্লিষ্ট শাখায় সেকশন অফিসের কাছে পাঠান। যাচাই-বাছাই শেষে সেকশন অফিসাররা সহকারী পরিচালক, উপ-পরিচালক ও সবশেষে পরিচালকের কাছে পাঠান। এবং সর্বশেষ পরিচালকের স্বাক্ষরেই এমপিওভুক্ত হন শিক্ষকরা। তিনি বলেন, জাল সনদ দিয়ে কেউ যাতে এমপিওভুক্তি না পেতে পারে এ বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রয়েছে।
