অস্ত্র কিনছে মহল্লার ছিঁচকে সন্ত্রাসীরা

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০১৪, ১০:২৭
 হঠাত্ করেই রাজধানীতে অবৈধ অস্ত্রের চাহিদা বেড়েছে। মহল্লা ভিত্তিক ছিঁচকে সন্ত্রাসীরা এখন অস্ত্র কিনে নিজেদের কাছে মজুদ করছেন। অস্ত্র পাওয়া সহজ এবং দামও নাগালের মধ্যে থাকায় সব ধরনের সন্ত্রাসীই অস্ত্র কিনছেন। সম্প্রতি ৮টি অবৈধ অস্ত্রসহ ৮ সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। গ্রেফতারকৃত অস্ত্র ব্যবসায়ীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এমন তথ্যই পেয়েছেন গোয়েন্দারা। গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে অস্ত্র ব্যবসায়ীরা জানিয়েছে, তারা এই মুহূর্তে অস্ত্র দেশে আনতে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত ব্যবহার করছেন। সীমান্ত একটু শিথিল হলেই অস্ত্র আসে বেশি। তবে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী অস্ত্র আনেন ব্যবসায়ীরা। কয়েকটি অস্ত্রের চাহিদা পেলেই আনা হয়। ব্যবসায়ীরা আগে থেকে অস্ত্র এনে মজুদ করেন না।
গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে রিমান্ডে থাকা অস্ত্র ব্যবসায়ী মনিরুজ্জামান শিমুল জানিয়েছেন, তিনি মূলত চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ঢাকায় এনে ক্রেতাদের কাছে সরবরাহ করে থাকেন। তবে সীমান্তের ওপার থেকে বাহকরা অস্ত্র এনে দেন এদেশীয় অস্ত্রের ডিলারদের কাছে। রাজধানীতে অস্ত্র ক্রেতাদের একটি তালিকা তৈরি করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। এই তালিকা ধরে গ্রেফতার অভিযানও শুরু হয়েছে। তবে সরবরাহকারীরা গ্রেফতার হওয়ায় ওই সব ব্যক্তিকে এখন আর খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ। এই তালিকায় উঠতি রাজনীতিক ও রাজনীতিকের ছেলে-স্বজনও আছে।
অনেক বেশি লাভজনক হওয়ায় অস্ত্র ব্যবসার দিকে ঝোঁক বেশি সন্ত্রাসীদের। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার ছানোয়ার হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, অস্ত্র ক্রেতা ও বিক্রেতাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেছে, সীমান্তের ওপরেই অনেকগুলো অস্ত্র তৈরির লেদ রয়েছে। লেদে একএকটি পিস্তল তৈরি করতে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা পড়ে। ৭.৬৫ এমএম পিস্তল এদেশের সীমান্তের মধ্যে পৌঁছাতে দাম পড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। আর ক্রেতা পর্যায়ে এগুলো বিক্রি হয় ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকায়। যদিও বছর খানেক আগে এসব অস্ত্র পাওয়া যেত ৪০ হাজার টাকার মধ্যেই। এখন দাম বাড়লেও অস্ত্রের মানও বেড়েছে। পিস্তলের বাটে সুদৃশ্যমান কাঠের টুকরো সেট করা হয়েছে। ফলে অস্ত্রগুলো আগের থেকে অনেক বেশি মজবুত হয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ৮টি অবৈধ অস্ত্রসহ ৮ ক্রেতা-বিক্রেতাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ওই অভিযানের পর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার (গোয়েন্দা) মনিরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, রাজধানীতে বর্তমানে অস্ত্র কেনে এলাকাভিত্তিক ১৫টি গ্রুপ। প্রতিটি গ্রুপে রয়েছে ৫/৬ সদস্য। তারা ডিলারদের কাছে অস্ত্রের চাহিদাপত্র দেন। ডিলাররা চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র এনে গ্রুপগুলোর কাছে সরবরাহ করেন।
মনিরুল ইসলাম বলেন, রাজধানীর কিছু এলাকায় সম্প্রতি গোলাগুলির ঘটনায় অনেক লোকের প্রাণহানি ঘটে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়। এর আগে গত আগস্ট থেকে টানা অভিযানে একাধিক অস্ত্র ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতদের তথ্যের ভিত্তিতে অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী ও ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। অস্ত্র কেনাবেচার সাথে রাজনৈতিক দল ও সদস্যদের সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আসামিদের দেয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করার চেষ্টা করছে ডিবি। গ্রেফতারকৃত ও পলাতক অস্ত্র ব্যবসায়ীরা রাজনৈতিক দলের কোন পদে রয়েছেন তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘পুলিশের চেকপোস্ট ও অভিযান একটু শিথিল হলেই অস্ত্র ব্যবসায়ীরা সুযোগ নেন। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকায় অস্ত্র ক্রেতা-বিক্রেতাদের দিকে খুব একটা নজর দেয়নি পুলিশ। আর এই সুযোগেই বিপুল পরিমাণ অস্ত্র তারা নিয়ে এসেছেন। সে কারণে সম্প্রতি পাড়া-মহল্লার গণ্ডগোলেও অস্ত্রের ব্যবহার শুরু হয়েছে। তবে ভয়ঙ্কর তথ্য হলো- পেশাদার ডাকাত দলগুলোর হাতে অনেক অস্ত্র চলে গেছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। সেই সব অস্ত্র এখন উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।’ ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, গত আগস্ট মাস থেকে পুলিশ অভিযান শুরু করেছে। এই অভিযান চলমান থাকবে।
গত শনিবার আজিমপুরের শহীদ মাজারের সামনের একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে দুইটি পিস্তলসহ চার ডাকাতকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। তারা হলেন— ডাকাত দলের সর্দার জুলহাস আকন (৪৮), আব্দুস সাত্তার (৪৫), রকি হোসেন (৩২) ও এমদাদ হোসেন (৩০)। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে রবিবার যাত্রাবাড়ির মীরহাজিরবাগ থেকে কামাল ওরফে পিচ্চি কামাল (৪৮) নামে এক সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়। তার কাছ থেকে একটি শাটারগান উদ্ধার করা হয়। ডাকাত দলের সর্দার জুলহাস ১২ বছর জেল খেটে কিছুদিন আগে বের হয়েছে। রকি ও সাত্তারও ৬ বছর করে জেল খেটেছেন এবং এমদাদ ২ বছর জেল খেটে কিছুদিন আগে ছাড়া পান। এরা সবাই পেশাদার ডাকাত।