বায়তুল মোকাররম মসজিদে জানাজার মধ্য দিয়ে বাবার কবরের পাশে শায়িত হলেন মানবতা বিরোধী অপরাধে ৯০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত ও জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম। শনিবার পৌনে ২ টায় বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে জানাজার জন্য উত্তরগেটে লাশবাহী ফ্রিজ ভ্যান আনা হলে সেটি লক্ষ্য করে একজন পথচারী জুতা নিক্ষেপ করেন। এসময় জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা তাকে ধাওয়া দিলে কিছু সময়ে জন্য সেখানে এক উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করে। পুলিশের মধ্যস্থতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসলেও এসময় আশেপাশে অন্তত ৬টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। পুলিশ দাবি করেছে, জানাজায় অংশ নিতে আসা জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা এই ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়।
জানাজার আগে থেকেই গণজাগরণ মঞ্চের একাংশ, অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম, সম্মিলিত ইসলামী জোটসহ কয়েকটি সংগঠন বায়তুল মোকাররমে গোলাম আযমের জানাজার প্রতিবাদে পার্শ্ববর্তী এলাকায় বিক্ষোভ করে। তারা গোলাম আযমকে বাংলাদেশের মাটিতে দাফনের প্রতিবাদ করেন। জানাজার জন্য পুলিশ বায়তুল মোকাররম মসজিদের আশেপাশের সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দিলে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। দুর্ভোগ পোহাতে হয় নগরবাসীকে।
জানাজাকে কেন্দ্র করে বায়তুল মোকাররম ও আশেপাশের এলাকায় সকাল থেকে বিপুল সংখ্যক পুলিশ-র্যাব মোতায়েন ছিল। বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে পুলিশের জোরদার পাহারা ছিল। কাকরাইল মোড় থেকে শুরু করে নাইটিঙ্গেল মোড়, ফকিরাপুল, দৈনিক বাংলা, পল্টন কালভার্ট রোড, সেগুনবাগিচা, পল্টন মোড় হয়ে মুক্তাঙ্গন ও বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও র্যাব সদস্যকে সতর্ক অবস্থায় দেখা গেছে। এসব এলাকার মধ্যে দৈনিক বাংলা ও মুক্তাঙ্গন এলাকায় পুলিশের জলকামান, এপিসি ও প্রিজনভ্যানের উপস্থিতিও দেখা গেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া এ্যান্ড পাবলিক রিলেশন শাখার উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান জানান, গোলাম আযমের জানাজায় সম্ভাব্য সহিংসতা ঠেকাতে আগে থেকে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা ছিল। জানাজায় অংশ নিতে আসা মুসল্লীদের মধ্যে সন্দেহভাজনদের শরীর তল্লাশি করে পুলিশ।
গতকাল সকাল থেকেই বায়তুল মোকাররম মসজিদের আশেপাশের সড়কগুলোতে পুলিশ কড়া নিরাপত্তা দেয়। জানাজায় অংশ নিতে আসা জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের মধ্যে সন্দেহভাজনদের শরীর তল্লাশি করা হয়। কয়েকজন কর্মীর পকেট থেকে পুলিশ ইটের টুকরা উদ্ধার করে। মগবাজারের কাজী অফিসের গলি থেকে বায়তুল মোকাররম মসজিদ পর্যন্ত সড়কে পুলিশের ছিল কড়া টহল। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে মগবাজারের বাড়ি থেকে লাশবাহী ফ্রিজ ভ্যানে করে কফিনটি বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। লাশবাহী এই ফ্রিজ ভ্যানের নিরাপত্তা দেয় জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা। তারা একটি মানব ব্যারিকেড তৈরি করে গাড়িটিকে ঘিরে ধরে ধীরে ধীরে মসজিদের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
দুপুর ১টার দিকে কফিনবাহী গাড়ি বায়তুল মোকারম মসজিদের উত্তরগেটের সড়কের বিপরীত দিকে দারুস সালাম আর্কেড ভবনের সামনে পৌঁছলে একজন পথচারী গাড়ি লক্ষ্য করে জুতা নিক্ষেপ করেন। মাথায় লাল সবুজ খচিত কাপড় দিয়ে বাঁধা ঐ যুবক ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিয়ে জুতা নিক্ষেপ করার পর জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা তাকে ধাওয়া দেয়। এর আগে ১৯৮১ সালের ১ জানুয়ারি প্যালেস্টাইন যুদ্ধে শহীদ হওয়া দুই বাংলাদেশির জানাযায় গোলাম আযম অংশ নিলে মুসল্লীরা তাকে জুতা পেটা করেছিলেন। লাশবাহী গাড়িটি সেখানে পৌঁছালে পশ্চিম পাশের পুলিশ বক্সের সামনে অবস্থান নেয়া গণজাগরণ মঞ্চের একাংশ, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরামের ব্যানারে কয়েকজন কর্মী জুতা প্রদর্শন করেন। জামায়াত-শিবিরের কর্মীরাও তাদের লক্ষ্য করে পাল্টা জুতা প্রদর্শন করে। তবে পুলিশের হস্তক্ষেপে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
দুপুর পৌনে দুইটার দিকে গোলাম আযমের চতুর্থ ছেলে আবদুল্লাহিল আমান আল আযমীর ইমামতিতে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। আযমী জানাযা শেষে উপস্থিত মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে বলেন, তার বাবা জীবত্দশায় জ্ঞাতসারে কাউকে দুঃখ-কষ্ট দেননি। অজ্ঞাতে কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা করবেন। তার জন্য দোয়া করবেন যেনো আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করেন।’ তবে জীবদ্দশায় মুক্তিযুদ্ধের সময় কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাননি গোলাম আযম। তার মৃত্যুর পর পরিবারের পক্ষ থেকেও ক্ষমা চাওয়া হলো না।
জানাযা শেষে ফের গোলাম আযমের লাশ পুলিশ পাহারায় মগবাজার বাসবভনে নিয়ে যাওয়া হয়। জানাযায় শরিক জামায়াত-শিবির কর্মী শোক র্যালি করে লাশের সঙ্গী হয়। লাশবাহী গাড়িটি মাঝে রেখে নেতাকর্মীরা দীর্ঘসময় পায়ে হেঁটে মগবাজার কাজী অফিস গলিতে পৌঁছায়। গোলাম আযমের লাশবাহী গাড়ির সামনে ছিল জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিশাল মোটর সাইকেল বহর। এছাড়া ঐ গাড়ির পেছনে জামায়াত-শিবির কর্মীদের বহনকারী কয়েকটি ট্রাকের বহরও ছিল। বিকেল সোয়া তিনটায় মগবাজারের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
গোলাম আযমের জানাযায় বিএনপিসহ ২০ দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শওকত মাহমুদ সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। বিএনপির চেয়ারপার্সনে আরেক উপদেষ্টা ডা. জেড এম জাহিদ জানাযায় অংশ নেন। সাংবাদিক নেতা রুহুল আমিন গাজী, বিএনপির অঙ্গ-সংগঠন জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের সভাপতি আব্দুল মালেক, খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মুহম্মদ ইসহাক, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামী, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, এনডিপির চেয়ারম্যান গোলাম মোর্তজা, নেজামে ইসলাম পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আব্দুর রকিব, জাগপার সাধারণ সম্পাদক খন্দকার লুত্ফর রহমান, ইসলামিক পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আব্দুল মোবিন। জোটের বাইরে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলনের ঢাকা মহানগরী আমির এটিএম হেমায়েত উদ্দিন, মুসলিম লীগের নুরুল হক মজুমদার জানাযায় অংশ নেন। তবে গোলাম আযমের প্রবাসী পাঁচ ছেলের কেউ-ই বাবার জানাযায় অংশ নিতে দেশে আসেননি।
জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদ, ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমানও আসেননি জানাযায়। গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকায় তারা পলাতক আছেন। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও প্রচার সম্পাদক তাসনীম আলম, সহকারী প্রচার সম্পাদক মতিউর রহমান আকন্দ ও ঢাকা মহানগরী জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, জামায়াত ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের, নূরুল ইসলাম বুলবুল, সহকারী প্রচার সম্পাদক মতিউর রহমান আকন্দ ও ঢাকা মহানগরী জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, শিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক মনির আহম্মেদসহ শতাধিক নেতা উপস্থিত ছিলেন।
