অবৈধ চালকই ৭ লাখ

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০১৪, ০০:১০

পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো স্বীকার করেছে, বর্তমানে দেশে অবৈধ চালকের সংখ্যাই বেশি। তবে এদের মধ্যে দক্ষতা সম্পন্ন চালকের সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু বৈধ লাইসেন্স তাদের না থাকায় তারা অবৈধ। তবে এজন্য তারা দায়ী করেছেন লাইসেন্স প্রদানকারী বিআরটিএ কর্তৃপক্ষকে। প্রয়ো-জনীয় দক্ষতা থাকার পরও লাইসেন্স পেতে ঘাটে ঘাটে পোহাতে হয় বিড়ম্বনা। বিআরটিএ চালকদের যে পরিমাণ লাইসেন্স প্রদান করে তার দিগুণ প্রদান করে গাড়ির লাইসেন্স। গতকাল রবিবার রাজধানীর ট্রাক টার্মিনালে মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্যই জানালেন তারা।

 বর্তমানে সারাদেশে রেজিস্ট্রিকৃত যানবাহনের সংখ্যা ২১ লাখ। এর মধ্যে মোটরসাইকেল প্রায় ১১ লাখ। বাস, মিনিবাস, কাভার্ডভ্যান ও ট্রাকের সংখ্যা ১০ লাখ। বিআরটিএ থেকে প্রাপ্ত চালকদের লাইসেন্স ১৪ লাখ ৩১ হাজার। আর বৈধ লাইসেন্সবিহীন চালকের সংখ্যা প্রায় সাত লাখ। আর ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ।
প্রাপ্ততথ্যে বিগত ১৫ বছরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা আড়াই লাখেরও বেশি। আর এসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ী  চালকদের অধিকাংশেরই বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। যাদের সংখ্যা শতকরা ৬১ ভাগ।
এদিকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিআরটিএ-এর প্রধান কার্যালয়ে এক বৈঠক শেষে গতকাল রবিবার সাংবা-দিকদের জানান, আগামী ১০ নভেম্বর থেকে ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সবিহীন চালকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান চালানো হবে।  
মন্ত্রীর সভাপতিত্বে সড়ক নিরাপত্তা, সড়ক পরিবহন ও বিআরটিএ’এর সার্বিক কার্যক্রম বিষয়ক এক সমন্বয় সভায় এ সিন্ধান্ত নেয়া হয়। বৈঠক সূত্র জানায়, সারাদেশে বিআরটিএ’র অফিসসমূহে সেবা গ্রহিতাদের হয়রানি, দালাল ও প্রতারকদের দৌরাত্ম্য বন্ধেও বিশেষ অভিযান চালানো হবে।
ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সবিহীন চালকদের বিরুদ্ধে অভিযান সম্পর্কে ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্ল্যাহ বলেন, এ উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। এ ব্যাপারে আমাদের আপত্তি নেই। তবে অভিযানে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সহযোগিতা নিলে অভিযান ফলপ্রসূ হবে বলে মনে করি।
বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রোস্তম আলী খানও এ অভিযানকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, গাড়ি চালাবার মত দক্ষ চালকের অভাব রয়েছে। অনেক অভিজ্ঞ চালক বিদেশে চলে গেছে। তবে লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতার অভাবের কারণেই বাড়ছে অবৈধ চালকের সংখ্যা। তিনি মনে করেন, আইনের দৃষ্টিতে যারা (লাইসেন্স নেই বলে) অবৈধ চালক তাদের অনেকের মধ্যে ভাল চালক হবার সব যোগ্যতাই রয়েছে।
তিনি বলেন, বিআরটিএ যে পরিমাণ গাড়ির রেজিস্ট্রেশন দিয়ে থাকে সে পরিমাণে চালকের লাইসেন্স প্রদান করে না। তাছাড়া লাইসেন্স পেতে ঘাটে ঘাটে পোহাতে হয় ভোগান্তি। এ কারণে অনেকেই  ডুপ্লিকেট লাইসেন্স সংগ্রহে বাধ্য হয়।
ফিটনেসবিহীন গাড়ির ব্যাপারে তিনি কোন ধরনের আপত্তি না করলেও চালকের ব্যাপারে যাচাই বাছাইয়ে একটু সহানুভূতিশীল হওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, মহাসড়কে অনেক হেভি গাড়ির চালক রয়েছেন যারা দক্ষ। যাদের অনেকে ১৫/২০ বছর ধরে গাড়ি চালাচ্ছে। কিন্তু তাদের বৈধ লাইসেন্স নেই। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে বিআরটিএ যাচাই বাছাই করে যারা উপযুক্ত (দক্ষ) বলে বিবেচিত হবেন তাদেরকে যেন বৈধ লাইসেন্স প্রদান করে।
সূত্র জানায়, বিআরটিএ প্রধান কার্যালয়ের বৈঠকে জানানো হয়, নাটোরের বড়াইগ্রামে সম্প্রতি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার পর গত ২৩ অক্টোবর কল্যাণপুরে কেয়া পরিবহনের বাসডিপোতে বিআরটিএ বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। এতে কেয়া পরিবহনের ১৫টি ফিটনেসবিহীন গাড়ির জন্য প্রায় ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। কেয়া পরিবহনের নির্বাহীকে ২ মাসের কারাদণ্ড ও ৭ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও ১ মাসের কারাদণ্ড দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ ছাড়া হানিফ পরিবহনের বিরুদ্ধেও আইনানুগ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
সমন্বয় সভা শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, সারাদেশে বিআরটিএ’র অফিস চত্বরে দালাল প্রতিরোধ কার্যক্রমের আওতায় ইতোমধ্যে বেশকিছু দালাল ও প্রতারককে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া সম্প্রতি খুলনা বিআরটিএ অফিসে দালালদের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে একজন অফিস সহকারীকে ৩ মাসের কারাদণ্ড প্রদান করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
তিনি বলেন, দেশের ৬৪টি জেলায় ডিজিটাল নাম্বার প্লেট সংযোজনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় ঢাকা মহানগরী এলাকায় ১২টি আরএফআইডি স্টেশন স্থাপনের কাজও শেষ হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় সাড়ে ৪ লাখ রেট্রো-রিফ্লেক্টিভ নাম্বার প্লেট সংযোজনের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।

বৈঠকে সিন্ধান্ত নেয়া হয়, বিদ্যমান মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩-এর পরিবর্তে যুগোপযোগী সড়ক পরিবহন আইন-২০১৪ প্রণয়ন করা হচ্ছে। আইনের খসড়া আগামী ৩ মাসের মধ্যে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য পাঠানো হবে। এর আগে মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সভায় আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা এবং স্টেক-হোল্ডারদের সাথে আলোচনা করা হবে। প্রস্তাবিত খসড়ায় আইন ভঙ্গকারী সড়ক পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জরিমানা ও শাস্তির পরিমাণ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।