বাংলাদেশ থেকে প্রতি মাসে দুই হাজার নারী শ্রমিক নেবে আমিরাত

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০১৪, ১০:২১

বাংলাদেশ থেকে প্রতি মাসে দুই হাজার নারী শ্রমিক নেবে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। এই ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরে ইউএই’র সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই সমঝোতার আওতায় ১৪ পেশায় বাংলাদেশি এক হাজার নারীকর্মী প্রাথমিকভাবে নেবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি। পরে তা আরও বাড়বে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। গতকাল রবিবার আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে হোটেল সেন্ট রেগিসে এই সমঝোতা স্মারক সই হয় বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব খন্দকার শওকত হোসেন। এদিকে প্রধানমন্ত্রী পটুয়াখালীর পায়রায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য দুবাই পোর্ট ওয়ার্ল্ড কর্তৃপক্ষকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এছাড়া আবুধাবিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী প্রবাসে নিজ দেশের সুনাম ধরে রাখার আহবান জানিয়েছেন। ঢাকায় বিভিন্ন বার্তা সংস্থার খবরে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
সচিব খন্দকার শওকত হোসেন বলেন, এই সমঝোতা স্মারকের মূল লক্ষ্য হলো সুবিধাজনক শর্তে আরব আমিরাতে নারী শ্রমিক নেয়া, যাতে নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত হয়। তিনি জানান, নারীকর্মী পাঠানোর বিষয়ে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সোস্যাল সিকিউরিটি ফান্ডের অধীনে গঠিত কোম্পানি প্রফেশন লেবার রিক্রুটমেন্ট কোম্পানি আমালা গ্রুপের মধ্যে সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হয়। সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশের পক্ষে স্বাক্ষর করেন জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক বেগম শামসুর নাহার। আমিরাতের পক্ষে স্বাক্ষর করেন আমালা গ্রুপের চেয়ারম্যান হামাইদ মোহামেদ মুহিরি।
পায়রার গভীর সমুদ্র বন্দর
পটুয়াখালীর পায়রায় একটি গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী দুবাই পোর্ট ওয়ার্ল্ড কর্তৃপক্ষকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী গতকাল আবুধাবিতে তার হোটেল স্যুটে পোর্টের চেয়ারম্যান সুলতান আহমেদ বিন সুলাইয়েমের সঙ্গে এক বৈঠকে এ আমন্ত্রণ জানান। একই সঙ্গে তিনি পোর্ট চেয়ারম্যানকে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও একটি মেরিটাইম ড্রাইভওয়ে নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়েরও আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রীর মিডিয়া উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব এম আবুল কালাম আজাদ ও একেএম শামীম চৌধুরী এসময় উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে পররাষ্ট্র সচিব এম শহিদুল হক সাংবাদিকদের বলেন, পায়রা বন্দর ইতোমধ্যে চালু হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী ও চেয়ারম্যান এখানে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা টেকনাফ থেকে মিরেরসরাই পর্যন্ত ১৫০ কিলোমিটার মেরিটাইম ড্রাইভওয়ে নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য পোর্ট ওয়ার্ল্ড চেয়ারম্যানকে অনুরোধ জানান। শহিদুল হক বলেন, বৈঠকে বাংলাদেশে বিশেষ করে অবকাঠামোর উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্পে দুবাই পোর্ট ওয়ার্ল্ড কর্তৃপক্ষের বিনিয়োগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা সম্পর্কিত বিরোধ নিষ্পত্তির পর সমৃদ্ধ এই সমুদ্র এলাকায় ব্যাপক সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের অনুরোধে ইতিবাচক সাড়া দিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, তারা সাধারণত একটি সমুদ্র বন্দরকে টেকসই করতে এর সন্নিকটে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এ লক্ষ্যে শিগগিরই তার বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষে একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণে সম্মত হন। প্রধানমন্ত্রী গভীর সমুদ্র বন্দরের কাছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার চিন্তা-ভাবনাকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশে একটি বড় ধরনের বিমানবন্দর নির্মাণে আর একটি সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য দুবাই পোর্ট ওয়ার্ল্ড কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।
ঢাকায় আমিরাত দূতাবাসে লেবার অ্যাটাচে নিয়োগ দেয়া হবে
বাংলাদেশ থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) শ্রমিকদের আসার প্রক্রিয়া আরো সহজ করার লক্ষ্যে ঢাকায় আরব আমিরাত দূতাবাসে একজন লেবার অ্যাটাচে নিয়োগ দেয়া হবে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ আল-নাহিয়ান গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাত্ করে একথা বলেন।
আবুধাবির সেন্ট রেগিস হোটেলে দুপুরে এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, পরাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব আবুল কালাম আজাদ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে বলেন, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ আল-নাহিয়ানকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এর আগে ২০০৯ সালে বাংলাদেশ সফরের স্মৃতিচারণ করে ফের বাংলাদেশ সফর করবেন বলে জানান।
প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা
প্রধানমন্ত্রী গতকাল আবুধাবিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বলেন, যে দেশে থাকবেন, সে দেশের আইন মানতে হবে। আগে বাংলাদেশের লোকদের বিদেশে সুনাম ছিল। কিছু লোকের জন্য এই সুনাম নষ্ট হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসীদের সংশ্লিষ্ট দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে বাংলাদেশের সুনাম ধরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আমরা চাই না প্রবাসে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হোক। কিছু ঘটনা ঘটে গেছে। আইন ভাঙলে ভুক্তভোগী নিজেরাই হবেন।
হোটেল সেন্ট রেগিসের হলরুমে বাংলাদেশ দূতাবাস এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বিদেশে আমাদের সুনামের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। আমাদের লোকজন অনেক বেআইনি কাজ করছে, যাতে আমরা পিছিয়ে পড়ছি। জনশক্তি রপ্তানিতে বাংলাদেশ যেন ভবিষ্যতে ‘বেকায়দায়’ না পড়ে, সেজন্য সবার সহযোগিতার আশা করেন তিনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সরকারের কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা চাই, আমাদের দেশের প্রতিটি মানুষ সোনালী মানুষ হোক। বিশেষ করে যারা বাইরে আছেন তারা। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদানের কথা স্মরণ করে সরকার প্রধান বলেন, আপনারা আপনাদের অজান্তেই দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। দেশের অবদানে কাজ করে যাচ্ছেন। প্রবাসীদের বাংলাদেশে বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (সিআইপি) হিসেবে ঘোষণা দেয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিও প্রবাসীদের সামনে তুলে ধরেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।
পদ্মা সেতু প্রকল্পে কোন দুর্নীতি হয়নি বলে নিজের দেয়া চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন আমরা নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু করছি। এত বড় প্রকল্পের কাজ নিজেরা করতে পারলে বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকবে কেন? প্রবাসীদের ভোট দেয়া নিয়ে নির্বাচন কমিশন কাজ করছে বলেও প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন।
প্রবাসীদের দেশে বিনিয়োগের সুযোগ থাকার কথা উল্লেখ করে তা গ্রহণের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। প্রবাসীদের সুবিধায় প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক গঠনেরর কথাও বলেন তিনি। বিদেশে বাংলাদেশিদের সুনাম যাতে ক্ষুণ্ন না হয়, সেজন্য কর্মী পাঠানোর আগে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। জনগণের উন্নয়নে নেয়া সরকারের পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, মানুষের অধিকার নিশ্চিত করাই আমার একমাত্র কাজ। বাংলাদেশ এখন আর ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে চলে না। বাংলাদেশ এখন এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন আবুধাবিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ইমরান। পরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংস্কৃতি, যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী শেখ নাহিয়ান মুবারাক আল নাহিয়ানের দেয়া নৈশভোজে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী।
টানা দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম সফরে শনিবার আবুধাবি পৌঁছান শেখ হাসিনা। আজ সোমবার সকালে আবুধাবি থেকে দুবাই যাবেন শেখ হাসিনা। সেখানে আমিরাতের উপরাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী এবং দুবাইয়ের শাসক শেখ মুহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুমের সঙ্গে তিনি বৈঠক করবেন। দুপুরে রাস আল খাইমাহ গিয়ে এই রাজ্যের শাসক সাউদ বিন সাকর আল কাশিমির দেয়া মধ্যাহ্নভোজে যোগ দেবেন বাংলাদেশের সরকার প্রধান। এরপর বিকেলে দুবাই থেকে দেশের উদ্দেশে রওনা হবেন তিনি।