বিএনপি-জামায়াত জোটের সম্ভাব্য সব ধরনের সহিংসতা ও নাশকতা মোকাবেলায় হার্ডলাইনে সরকার। কোনভাবেই দেশকে গত ৫ জানুয়ারির পূর্বাবস্থায় ফিরে যেতে দেবে না আওয়ামী লীগ। বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের যেকোনো আন্দোলন বা নাশকতার চেষ্টা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলায় সর্বা-ত্মক প্রস্তুতি চলছে সরকার ও আওয়ামী লীগে। কোনো ছাড় নয়, বরং ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থানে থেকে বিরোধী পক্ষের আন্দোলন ও নাশকতা দমনের যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে সরকার ও দলের হাইকমান্ড থেকে। একই সঙ্গে ঢাকা বিভাগের সব জেলায় দলের সম্মেলন দ্রুত সম্পন্ন করারও তাগিদ দেয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, রাজনৈতিক ছাড়াও প্রশাসনিকভাবেও নেয়া হচ্ছে ব্যাপক প্রস্তুতি। বিএনপি-জামায়াত জোট অধ্যুষিত জেলা-উপজেলাগুলোকে কঠোর নজরদারীর মধ্যে আনতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নির্দেশ পেয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ব্যাপক তত্পরতা শুরু করেছে বলেও জানা গেছে।
গতকাল সোমবার রাতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা নিজেদের মধ্যে দীর্ঘ বৈঠক করেছেন। সূত্র জানায়, বৈঠকে সম্প্রতি ঢাকা অচল করে দিতে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার হুমকি, কোলকাতাসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে আল-কায়েদা, জেএমবিসহ উগ্র সাম্প্রদায়িক জঙ্গি গোষ্ঠির অপতত্পরতা এবং বিএনপি-জামায়াত জোটের বিভিন্ন গোপন বৈঠকের বিষয়গুলো আলোচনায় প্রাধান্য পায়। বৈঠক থেকে ঢাকাসহ আশপাশের জেলাগুলোতে সংগঠনকে চাঙ্গা ও শক্তিশালী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে জেলা থেকে ওয়ার্ড পর্যায়ে দলীয় সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি গঠন দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দেয়া হয়। ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, কাজী জাফরউল্লাহ, সাহারা খাতুন, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ছাড়াও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
অপরদিকে রাজনৈতিকভাবে বিএনপি-জামায়াত জোটের আন্দোলন মোকাবেলায় অচিরেই দেশের সব জেলা, মহানগর, উপজেলা, ওয়ার্ডসহ সব পর্যায়ে দলের সম্মেলন ও কাউন্সিল শেষ করতে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড থেকে ইতিমধ্যে লিখিত নির্দেশ পাঠানো হয়েছে সারাদেশের তৃণমূল নেতাদের কাছে। দলীয় নির্দেশনা পাওয়ার পর জমে উঠেছে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের রাজনীতি। দীর্ঘদিন পর জেলা, মহানগর ও উপজেলা কাউন্সিলকে ঘিরে ঝিমিয়ে পড়া সংগঠনটি চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।
সরকার ও আওয়ামী লীগ সূত্র জানায়, সরকারের এই হার্ডলাইনের অবস্থানের কথা শুক্রবার অনুষ্ঠিত দলের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকেই জানিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও দলের মুখপাত্র সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। এছাড়া বেশকিছু গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টও এখন সরকারের হাতে। আগামী বছরের শুরুতেই বিএনপি-জামায়াত আন্দোলনের নামে নাশকতা-সহিংসতার মাধ্যমে দেশকে আবার ৫ জানুয়ারির পূর্বাবস্থায় নিয়ে যাওয়ার গোপন ষড়যন্ত্রের কথাও উঠে এসেছে ওই রিপোর্টে। এ কারণে সম্ভাব্য সব আন্দোলন রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলায় আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই সারাদেশে দলকে সাংগঠনিক শক্তির ওপর দাঁড় করাতে আওয়ামী লীগে ব্যাপক তোড়জোড় শুরু হয়েছে।
এদিকে বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের আন্দোলন ও নাশকতা প্রতিরোধে আওয়ামী লীগের সব স্তরের নেতাকর্মীকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে দলের ৭৩টি সাংগঠনিক জেলার নেতাদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে হাইকমান্ড থেকে। দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ সকল জেলা, মহানগর, উপজেলা ও ওয়ার্ডের সম্মেলনের মাধ্যনে নতুন নেতৃত্ব গঠনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে তৃণমূল নেতাদের।
তবে চিঠি দিয়ে দল গোছানোর এই উদ্যোগ সম্পর্কে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এসব নিয়মিত সাংগঠনিক কর্মসূচি। প্রতিপক্ষ দল বা জোটের আন্দোলন মোকাবেলার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। তবে রাজনৈতিক আন্দোলন রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলার প্রস্তুতি অবশ্যই তাদের রয়েছে।
সূত্র জানায়, দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনের নামে যেকোনো ধরনের নাশকতা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, আন্দোলনের নামে জ্বালাও-পোড়াও, মানুষ হত্যা ও সন্ত্রাস করা হলে কঠোর জবাব দেয়া হবে। কেউ নৈরাজ্য করলে সরকার তাদের ছেড়ে দেবে না। আমরা জনগণের পাশে আছি। কেউ জনগণের ক্ষতি করতে চাইলে তাদের উপযুক্ত জবাব দেয়া হবে।
দলের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পরিকল্পিতভাবে দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য বিএনপি-জামায়াত জোটের গোপন ষড়যন্ত্রের একটি তথ্য সরকারের হাইকমান্ডের হাতে এসেছে। আর এ চক্রান্তের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াত ছাড়াও উগ্র সাম্প্রদায়িক বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীও জড়িত রয়েছে। আর ওই প্রতিবেদন পাওয়ার পরপরই বিরোধীপক্ষের সম্ভাব্য নাশকতা ও সহিংসতা মোকাবেলায় দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান, কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি ঝিমিয়ে পড়া সংগঠনকে শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে ডিসেম্বরের মধ্যে সারাদেশে সম্মেলন শেষ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
ডিসেম্বরের মধ্যে সারাদেশে কাউন্সিল সম্পন্ন করার লিখিত নির্দেশনার পর আওয়ামী লীগের তৃণমূলের রাজনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। সম্মেলনকে সামনে রেখে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা আবার দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দেশব্যাপী চলা তৃণমূলের কাউন্সিল সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে কেন্দ্রীয়ভাবে গঠন করা হয়েছে ১০টি শক্তিশালী সাংগঠনিক টিমও। দলের জ্যেষ্ঠ ও প্রবীণ নেতাদের পাশাপাশি মন্ত্রী-এমপি-সংসদ সদস্যদের নিয়ে গড়ে তোলা সাত বিভাগের জন্য সাতটি পৃথক টিম ছাড়াও ঢাকা বিভাগের জন্য দুটি এবং চট্টগ্রাম বিভাগের জন্য অতিরিক্ত আরেকটি টিম গঠন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। ১০ জানুয়ারির মধ্যে রাজশাহী বিভাগের সম্মেলন শেষ করতে বিভাগের বিভিন্ন প্রতিটি জেলা ও অধীন ইউনিটের সম্মেলনের তারিখও ঘোষণা করা হয়েছে।
খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেন, জঙ্গিবাদি-মৌলবাদি আর বিএনপি-জামায়াত এক ও অভিন্ন। এখন তারা সুবোধ বালকের মতো কথা বলছে। কিন্তু এটা তাদের আসল রূপ নয়। তাদের আসল রূপ দেখা গিয়েছিল ২০১৩ সালের শেষের দিকে। আবার যদি ওই রূপে ফেরে, কোন অবস্থাতেই তাদের ছাড় দেয়া হবে না। আগামীতে সহিংসতা বা নাশকতার সঙ্গে কেউ জড়িত হলে তাদের কঠোর হস্তে দমন করা হবে। কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না।
