নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনার ৬ মাস পূর্ণ হয়েছে গতকাল সোমবার। দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে এ মামলার এজাহারভুক্ত অনেক আসামি। মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন ভারতের কোলকাতায় গ্রেফতারের পর কারাগারে থাকলেও তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত। সাত খুনের দু’টি মামলায় র্যাব সদস্যসহ মোট ২৪ জনকে গ্রেফতার করা হলেও এখনো গ্রেফতার হয়নি কিলিং মিশনে জড়িত থাকা অনেকে। উল্টো এজাহারভুক্ত আসামিদের স্বজনরা এলাকায় ফিরে এসে বাদীপক্ষকে নানাভাবে হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, নূর হোসেনের শ্যালক ছাত্রলীগ নেতা নূরে আলম প্রকাশ্যেই দুলাভাইয়ের সম্পত্তি তদারকি করছেন। সিদ্ধিরগঞ্জ আওয়ামী লীগের কোন কোন নেতা যারা নূর হোসেনের সহযোগী ছিলেন তারাও কেউ কেউ নূর হোসেনের ব্যবসার দায়িত্ব নিয়েছেন। নূর হোসেনের একসময়ের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহচর আবারও পরিবহন চাঁদাবাজি শুরু করেছেন। ফলে সাত খুনের বিচার নিয়ে সাধারণ মানুষ সন্দেহ প্রকাশ করতে শুরু করেছে।
গত ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহীম অপহূত হন। পরে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সদ্য নির্বাচিত কাউন্সিলর সেলিনা ইসলাম বিউটি ও নিহত আইনজীবী চন্দন সরকারের মেয়ে জামাতা ডা. বিজয় কুমার পাল বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় পৃথক দু’টি মামলা করেন। তবে ঘটনার ৬ মাস অতিবাহিত হলেও মামলা দুটির অভিযোগপত্র ও তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জমায় বিলম্ব হওয়া এবং নূর হোসেনের সহযোগীদের সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার তত্পরতা দেখে সাধারণ মানুষ শঙ্কিত।
মামলার বাদী কাউন্সিলর সেলিনা ইসলাম বিউটি জানান, সাত খুনের ঘটনার ৬ মাস পূর্ণ হলেও এজাহারভুক্ত আসামিদের বাড়িতে একদিনও অভিযান চালায়নি পুলিশ। ইয়াসিনের পরিবার ঈদ-উল-আযহার সময় এসে কুরবানি দিয়েছে। তারা বিভিন্ন মাধ্যমে আমাদেরকে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। বলছে আমাদের বিরুদ্ধে নাকি ৬টি মামলা দিবে। সাদেক নূর হোসেনের সাম্রাজ্যের দেখভাল করছে তার নিজস্ব ক্যাডারদের দিয়ে। আমাদের কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে ২০টি মামলা দিয়ে এলাকা ছাড়া করবে-এমন মন্তব্যও করেছে। এছাড়া এজাহারভুক্ত অপর আসামিদের পরিবারের সদস্যরাও এলাকায় ফিরে এসেছে। তারাও নানা মাধ্যমে হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছে। ফিরে এসেছে নূর হোসেনের পরিবারের সদস্যরাও। পুলিশ প্রশাসন বলছে, নূর হোসেনকে দ্রুতই দেশে ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু তার কোন লক্ষণ আমরা দেখতে পাচ্ছি না। শুনতে পাচ্ছি চার্জশিটের আগে নাকি অনেক আসামিরই নাম বাদ দেয়া হবে। তবে আমরা পুলিশ প্রশাসনের উপর আস্থা রাখতে চাই।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির ওসি মামুনুর রশিদ মণ্ডল জানান, মামলায় এ পর্যন্ত র্যাবের ৩ জন ঊর্ধ্বতন র্কমর্কতা ও ১১ জন সদস্যসহ মোট ২৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়ে তিন র্যাব কর্মকর্তাসহ ১২ জন আদালতে দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। এছাড়া ঘটনার সাক্ষী হিসেবে ১৪ জন আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। এজাহারভুক্ত পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আইনানুগ প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বলে তিনি জানান।
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন জানান, এজাহার নামীয় ৬ আসামির মধ্যে নূর হোসেন কলকাতায় গ্রেফতার হলেও তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার কোন চেষ্টাই করছে না সরকার। সরকার ইচ্ছে করলে খান সুমনের মতো তাকেও জামিন করিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনতে পারতো। এজাহার নামীয় অপর ৫ আসামি বর্তমানে দেশে অবস্থান করলেও তাদেরকে গ্রেফতারের বিষয়ে কোন পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। কিলিং মিশনে থাকা র্যাবের আরো কয়েকজন সদস্য এখনো গ্রেফতার হয়নি। নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনতে পারলে ৬ কোটি টাকা লেনদেনের রহস্য উন্মোচিত হতো।
এদিকে এই খুনের ঘটনায় উচ্চ আদালতের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটি স্থানীয় এমপি শামীম ওসমান, নারায়ণগঞ্জের সিটি মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভি, আইজিপি, র্যাবের মহাপরিচালক, সাত খুনের মামলার অন্যতম আসামি বহিষ্কৃত তিন সেনা ও নৌ কর্মকর্তাসহ চার শতাধিক ব্যক্তির বক্তব্য গ্রহণ করলেও কবে নাগাদ তারা তদন্ত রিপোর্ট জমা দিবে তা নির্দিষ্ট করে বলছে না।
