ইডব্লিউজির আলোচনা

নির্বাচনী ব্যয় বাড়ানোর পক্ষে রাজনীতিকরা

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০১৪, ২০:০৭
 
 
 
 
 
নির্বাচনী ব্যয় বর্তমানে নির্ধারিত ২৫ লাখ টাকা থেকে আরো বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন রাজনীতিকরা। তারা বলেছেন— নির্বাচন একটি উত্সব। সেই সঙ্গে ব্যয়বহুলও। প্রার্থী চাইলেও কম খরচ করতে পারেন না। এ কারণে রাজনীতিবিদরা অর্থ উর্পাজনের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। পাশাপাশি ‘সরকারি অনুদানেই নির্বাচনী ব্যয়’ পরিচালিত হওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন রাজনীতিকরা।
মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিরা এ সব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা আনায়ন’ শীর্ষক এই গোলটেবিলের আয়োজন করে ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ (ইডব্লিউজি)।
গোলটেবিল বৈঠকে রাজনীতিকদের বাইরের আলোচকরা বলেন— এখন শুধু রাজনীতিবিদরা রাজনীতি করে না। কিছু মুনাফালোভীদের হাতে রাজনীতি চলে যাচ্ছে। রাজনীতি এবং রাজনৈতিক অবস্থানই দ্রুত মুনাফা লাভের অন্যতম মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।
ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের পরিচালনা কমিটির সদস্য হারুন অর রশিদের পরিচালনায় গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নেন-আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ এমপি, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুক, জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম মুহম্মদ কাদের, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান, ডেমোক্রেসি ওয়াচের নির্বাহী পরিচালক তালেয়া রেহমান, ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের পরিচালক আব্দুল আলীম প্রমুখ।
মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন— নির্বাচন এখন ব্যয়বহুল। নির্দিষ্ট অর্থে নির্বাচন করা কঠিন। আমাদের যে নির্বাচনী ব্যয় ২৫ লাখ টাকা বেঁধে দেয়া হয়েছে, তা পরিবর্তন করা দরকার। দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একজন প্রার্থী চাইলেও কম খরচ করতে পারবে না। কারণ, রাজনীতি রাজাদের নীতির মতো। মধ্যবিত্তের রাজনীতি করার সুযোগ আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। এ জন্য রাজনীতিকদের বৈধভাবে অর্থ উপার্জনের পরামর্শ দেন তিনি।
হানিফ বলেন— রাজনীতিবিদদের এখন রাজনীতির সঙ্গে ব্যবসাও করতে হবে। বৈধভাবে আয় করতে হবে। এরপর জনগণকে সাহায্যও করতে হবে। বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, জাতীয় ঐকমত্য ছাড়া সরকারি অনুদানে নির্বাচন করা সম্ভব নয়। তাই ভালো উদ্যোগের ক্ষেত্রে দেশের সবাইকে ঐকমত্য পোষণ করা উচিত।
বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুক বলেন— নির্দিষ্ট খরচ বেঁধে দিয়ে নির্বাচন হয় না। প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয় নির্ধারণ করে দিতে চাইলে অবশ্যই সেটা বাস্তবসম্মত হতে হবে। আমলারা এটা ঠিক করে দিলে হবে না। কারণ, তারা রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের খবর জানেন না।
তিনি বলেন— বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনে পর্যাপ্ত পরিমাণে জনবল নেই। সে কারণে তারা যথাযথভাবে নির্বাচনী ব্যয় পর্যবেক্ষণ করতে পারেন না। এ ছাড়া, নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী নয় এবং যারা এ সমস্ত বিষয় পর্যবেক্ষণ করবেন, তারাই অধিকাংশ সময় দলীয় লোক হয়। গণতান্ত্রিক নিয়ামক হচ্ছে প্রশাসনিক ব্যবস্থা, যা নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা দেখা যাচ্ছে না।
জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম মুহম্মদ কাদের (জি এম কাদের) বলেন, নির্বাচনী ব্যয় ২৫ লাখ টাকা যৌক্তিক নয়। কোনো রাজনৈতিক দল নির্দিষ্ট খরচ দিয়ে দল পরিচালনা করতে পারে না। বিভিন্ন অনুদান নিয়েই দল পরিচালনা করতে হয়। নির্বাচনী খরচ হিসেবে করে করা যায় না। এখানে অনেকগুলো বিষয় থাকে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচাক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন— যত দিন পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করা যাবে না তত দিন পর্যন্ত রাজনৈতিক অর্থায়নের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যাবে না। এখন শুধু রাজনীতিবিদরা রাজনীতি করেন না। মুনাফালোভীদের হাতে রাজনীতি চলে যাচ্ছে। দেশ স্বাধীনের পর দেশে মাত্র ১৭.৫ শতাংশ ব্যবসায়ী এমপি ছিলেন। এখন সেটি ৫৯ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে।
টিআইবি নির্বাহী বলেন— কোনো বিশেষ পেশার লোক রাজনীতিতে আসতে পারবেন না, সেটা আমরা বলি না। তবে এখন একটি ধারা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, সেটি হলো— রাজনীতি এবং রাজনৈতিক অবস্থানই দ্রুত মুনাফা লাভের অন্যতম মাধ্যম। নির্বাচন কমিশনে যে নির্বাচনী ব্যয় দেয়া হয় বাস্তবতা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা হলো— নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্য একটি ‘ব্ল্যাক ম্যাজিক এরিয়া’। এখানে মনোনয়ন নিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন হয়।
তিনি আরো বলেন— জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের প্রাধান্য দেয়া প্রয়োজন। নেপাল ও ইন্দোনেশিয়ার চেয়ে বাংলাদেশের আইনি কাঠামো ভালো। তবে চর্চার দিক থেকে খুবই খারাপ। আইন রয়েছে, তার যথাযথ প্রয়োগ করতে পারি না। সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো ও নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা রয়েছে।
গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা আরো বলেন— রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব বিশ্বের বহু দেশে পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশ এ থেকে ব্যতিক্রম নয়। নির্বাচনী ব্যয় ও দল পরিচালনার জন্য অর্থের প্রয়োজন। বাংলাদেশে এখনো এমন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা তৈরি হয়নি।