বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপাক্ষিক সকল ক্ষেত্রে সম্পর্ক ও যোগাযোগ আরো বিস্তৃত করবে। বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদের হুমকি ও বাংলাদেশের সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমেও দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। গতকাল বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে শেষ হওয়া বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় অংশীদারিত্ব সংলাপে দুই পক্ষ এই মনোভাব প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি ওয়েন্ডি শারমেন দুই দিনব্যাপী এই সংলাপে নেতৃত্ব দেন। সংলাপ শেষে একটি যৌথ বিবৃতি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর প্রকাশ করেছে। যৌথ বিবৃতিতে আগামীতে বৃহত্তর সহযোগিতার ক্ষেত্রও চিহ্নিত করার পাশাপাশি দ্বিতীয় অংশীদারি সংলাপ পরবর্তী দুই দেশের শক্তিশালী সহযোগিতার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
এবারের অংশীদারিত্ব সংলাপে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শক্তিশালী ও ক্রমবর্ধমান দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে সম্পর্ক আরো জোরদারে দুই পক্ষ একমত হয়েছে। সংলাপে দুই দেশের ওয়ার্কিং গ্রুপের আলোচনায় উন্নয়ন ও সুশাসন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ?এবং নিরাপত্তা সহযোগিতাসহ দ্বি-পাক্ষিক ও আঞ্চলিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি উঠে আসে। ২০১২ সালে শুরু হওয়া অংশীদারিত্ব সংলাপ দু’টি মধ্যপন্থী ও বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশের মধ্যে সম্পর্ক গভীর ও বিস্তৃত করতে ফলপ্রসূ আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করেছে বলে মনে করে উভয় দেশ। এছাড়া সহসাই দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠক অনুষ্ঠানেরও সিদ্ধান্ত হয়েছে। সংলাপে ৯ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন শহীদুল হক।
এবারের অংশীদারিত্ব সংলাপে দুই দেশের ভবিষ্যতে বৃহত্তর সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রগুলো শনাক্ত করা হয়েছে। আঞ্চলিক নেতৃত্বে বাংলাদেশের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক একীভূতকরণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক করিডোরের উন্নয়ন, আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যে সহায়তা, জ্বালানি সহায়তা এবং অর্থনীতিতে নারীর বর্ধিত অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সর্বাত্মক সহায়তা দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই প্রথম অংশীদারি সংলাপের আওতায় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র সাইবার স্পেসে ক্রমবর্ধমান হুমকির বিষয়ে আলোচনা করেছে। একটি মুক্ত ও নিরাপদ সাইবার স্পেসের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্ব দুটি দেশই উপলব্ধি করতে পেরেছে এবং সাইবার নিরাপত্তা জোরদার ও সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় বৃহত্তর সম্পৃক্ততার সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদের হুমকি মোকাবিলায় উভয় দেশই সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন ও সহিংসতা রোধে সহায়তা চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির অপরিহার্য অংশ হিসেবে নারী ও মেয়ে শিশুদের সমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ তাদের পারস্পরিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। মাতৃমৃত্যু হার কমানো, মেয়ে শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ এবং দারিদ্র্যতা হ্রাসে বাংলাদেশের অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে উভয় প্রতিনিধি দল নারী শিশুদের মাধ্যমিক শিক্ষার ব্যবস্থা এবং বাল্য ও জোরপূর্বক বিবাহ রোধে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে একমত হয়েছে।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং পারস্পরিক মূল্যবোধ ও স্বার্থ রক্ষায় সংলাপের ক্ষেত্রে তরুণদের সম্পৃক্ত করার বিষয়ে উভয়পক্ষ একমত হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা বিষয়ক বিনিময় বৃদ্ধির মাধ্যমে উভয় দেশই জনগণের মধ্যে সম্পর্ক আরো বিস্তৃত করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আলোচনায় ইবোলা প্রতিরোধে বাংলাদেশের সক্ষমতা আরো জোরদার করতে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছে।
দ্বিতীয় অংশীদারিত্ব সংলাপের পর দুই দেশের মধ্যে শক্তিশালী সহযোগিতার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও এবারের সংলাপে উঠে এসেছে। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, সন্ত্রাস মোকাবিলায় সহযোগিতার উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশ ও এ অঞ্চলে পারস্পরিক তথ্য আদান-প্রদান ও যোগাযোগের উন্নয়ন হয়েছে। দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা কাঠামো চুক্তি (টিকফা) স্বাক্ষর হওয়ায় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বাধাসমূহ চিহ্নিত এবং এ বিষয়ে আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
গত ১৭ মাসে নিরাপত্তা সহযোগিতা দুই দেশের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র কোস্টগার্ড কাটার জারভিস প্রদান করেছে। যার নতুন নাম সমুদ্র জয়। দ্বিতীয় কোস্ট গার্ড কাটার রাস বাংলাদেশকে দেয়ার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে সমুদ্রসীমা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়বে।
শ্রমিক নিরাপত্তা ও শ্রম অধিকার বিশেষ করে পোশাক শ্রমিকদের জন্য বাংলাদেশের কাজকে যুক্তরাষ্ট্র সক্রিয়ভাবে সমর্থন করছে বলেও সংলাপে জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে সক্রিয় নাগরিক সমাজের উপস্থিতিকে গুরত্ব দেয় এবং উভয় দেশ নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্র ও মৌলিক স্বাধীনতার ব্যাপারে নাগরিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ কাজ সংরক্ষণের বিষয়ে আলোচনা করেছে। তৃতীয় অংশীদারি সংলাপের সফল সমাপ্তিতে উভয়পক্ষ সন্তোষ প্রকাশ করেছে এবং আগামী বছর ঢাকায় চতুর্থ অংশীদারিত্ব সংলাপ আয়োজনে সম্মত হয়েছে বলে যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
অভিনন্দন
অংশীদারিত্ব সংলাপে মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি ওয়েন্ডি শারমেন সম্প্রতি কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি এসোসিয়েশন, ইন্টারন্যাশনাল পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন, ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের নির্বাচনে বিজয় অর্জন করায় বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
