বিএনপির নীরবতায় নাখোশ জামায়াত

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০১৪, ১১:০১

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে আদালতের দেয়া রায় সম্পর্কে বরাবরই নিশ্চুপ থাকা, ‘রায়ের প্রতিবাদে’ ডাকা হরতালে পরোক্ষ সমর্থনও না জানানো এবং সর্বশেষ কারাগারে দলের সাবেক আমির গোলাম আযমের মৃত্যুতে শোক না জানানোয় ২০ দলের নেতৃত্বে থাকা বিএনপির ওপর রেগে আছে জোটসঙ্গী জামায়াত। এই তিন ঘটনায়, বিশেষ করে গোলাম আযমের মৃত্যুতে শোক না জানানোর কারণে এবং তার জানাজায় দলীয় বা জোটগতভাবে অংশ না নেয়ায় বিএনপি-জামায়াতের গাঁটছড়া কিছুটা হলেও শিথিল হয়েছে বলে মনে করছেন জোটের অপরাপর শরিকদের কেউ কেউ।
বিএনপির ওপর জামায়াতের রাগ বা অভিমানের প্রকাশ ঘটেছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে ২৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় দেয়া গোলাম আজমের চতুর্থ ছেলে আবদুল্লাহিল আমান আযমীর মন্তব্যে। নিজের ফেসবুকে ‘তারেকের নির্দেশে আযমের জানাজা বর্জন করল বিএনপি’ শীর্ষক একটি সংবাদ শেয়ার করে সেটির নিচে ইংরেজিতে লেখা প্রতিক্রিয়ায় আযমী বলেছেন, গোলাম আযমের মৃত্যুতে শোক না জানিয়ে বিএনপি অকৃতজ্ঞের মত কাজ করেছে। জামায়াত ছাড়া বিএনপি কখনো ক্ষমতায় যেতে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না বলেও মন্তব্য করেন গোলাম আযম পুত্র।
অবশ্য গোলাম আযমের ছেলের এই বক্তব্যকে তার ‘ব্যক্তিগত মতামত’ হিসেবে মনে করছে বিএনপি। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল শুক্রবার রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এই সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘সেটি গোলাম আযম পুত্রের ব্যক্তিগত মতামত। তাই আমরা বিষয়টি আমলে নেবো না। কারণ তিনি জামায়াতের কর্মকর্তা কিংবা সদস্য কিনা আমার জানা নেই। জামায়াতের সঙ্গে আমাদের যে জোট রয়েছে, তা একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে দ্রুত নির্বাচন ও দেশে যে দুঃশাসন চলছে তা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের জন্য।’
মির্জা ফখরুল এ-ও বললেন ‘গোলাম আজমের মৃত্যুতে শোক না জানানোয় জামায়াতের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি’। জামায়াতের কেউ অবশ্য এনিয়ে উদ্ধৃত হয়ে কিছু বলতেও রাজি হননি। জামায়াতের কেন্দ্রীয় এক নেতা, যিনি সাবেক সংসদ সদস্য গতকাল ইত্তেফাককে বলেন ‘গোলাম আজমের পুত্রের বক্তব্য তার ব্যক্তিগত এটা ঠিক। এটা আমাদের দলীয় কোনো প্রতিক্রিয়া নয়। কিন্তু একথাও ঠিক যে, গোলাম আজম আমাদের দলের সাবেক আমীর, বলতে গেলে তিনি আমাদের গুরু। সেখানে তার মৃত্যুতে বিএনপির অন্তত শোক না জানানোর বিষয়টি অগ্রহণযোগ্য।’
শুধু গোলাম আজমের মৃত্যুতে শোক না জানানো কিংবা তার জানাজায় অংশ না নেয়া নয়, পাশাপাশি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রতিটি মামলার রায়ে বিএনপির ধারাবাহিক নীরবতা এবং রায়ের প্রতিবাদে ডাকা কোনো হরতাল কর্মসূচিতেই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ কোনো ধরনের সমর্থন না জানানোর কারণেও বিএনপির ওপর ক্ষুব্ধ জামায়াত নেতা-কর্মীরা। জামায়াত সূত্র জানায়, সামনে সরকার বিরোধী সম্ভাব্য আন্দোলনের ক্ষেত্রে নিজেদের হিসাব-নিকাশ বুঝেই সিদ্ধান্ত নেবে দলটি। তাছাড়া বিএনপির ডাকা কর্মসূচির ক্ষেত্রেও ‘নীরবতা’ পালনের নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে ২০ দলীয় জোট শরিক জামায়াতের।
প্রসঙ্গত, একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গত বুধবার জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির রায় দেয় যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বরাবরের মতোই এই রায়ে প্রতিক্রিয়া দেয়নি বিএনপি। একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধে ট্রাইব্যুনাল এই পর্যন্ত দশটি মামলার রায় দিয়েছে। প্রতিটি রায়ের পরেই প্রতিক্রিয়াহীন ছিল বিএনপি।
২০ দলের একাধিক সূত্র জানায়, জামায়াতকে নিয়ে গত কয়েক মাস ধরেই বিএনপিসহ জোটের অন্যান্য শরিকদের মধ্যে এক ধরনের সন্দেহ-অবিশ্বাস কাজ করছে। পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের পর দলটির নিষ্ক্রিয়তা, জোট রাজনীতিতে অনাগ্রহ এবং একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত দলের শীর্ষ নেতাদের কারও কারও ক্ষেত্রে বিচার কাজে হঠাত্ ধীরগতি, হরতাল ডাকলেও তাতে আগের মতো তেজ না থাকায় জামায়াতকে নিয়ে জোটে সংশয় বিরাজ করছে। সম্প্রতি জোটের একাধিক বৈঠকে বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে এই সংশয়ের কথা ব্যক্ত করেছেন খোদ বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াও। তবে এ বিষয়ে জামায়াতের অন্যতম শীর্ষ নেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ইত্তেফাককে বলেছেন, ‘এটা ভিত্তিহীন ও অপপ্রচার’।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আগাম নির্বাচনের আশা দেখছে বিএনপি
এদিকে, ‘গণতান্ত্রিক সরকার যেকোনো সময় নির্বাচন দিতে পারে’—বৃহস্পতিবার গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই মন্তব্য করায় তাতে আগাম নির্বাচনের আশা দেখছে বিএনপি।
গতকাল দলের এক যৌথসভা শেষে এই বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আমরা মনে করি, প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি প্রকারান্তরে জনগণের দ্রুত নির্বাচনের দাবিকে স্বীকার করছেন। সরকার জনগণের দাবির কাছে নতি স্বীকার করতে শুরু করেছে।’ তিনি বলেন, জনগণ দেশে একটি দ্রুত নির্বাচন চায়। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তিনি বুঝতে শুরু করেছেন। সেজন্য নির্বাচন নিয়ে তার ওই বক্তব্য তাত্পর্যপূর্ণ বলে আমরা মনে করি। এক প্রশ্নের জবাবে ফখরুল বলেন, ‘ সরকার যখনই নির্বাচন দেবে, তখনই বিএনপি নির্বাচনে যেতে রাজি আছে। তবে তা হতে হবে সব দলের অংশগ্রহণমূলক একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন।’ বিএনপি নির্বাচন ও আন্দোলনের সব প্রস্তুতি নিয়েই এগোচ্ছে বলেও জানান বিএনপির মুখপাত্র।
৭ নভেম্বর উপলক্ষে বিএনপির ১০ দিনের কর্মসূচি
৭ নভেম্বর ‘বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষে ১০ দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। এর মধ্যে কেন্দ্রীয়ভাবে দু’দিনের কর্মসূচি হবে। এছাড়া ৫ থেকে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত থাকবে ১০ দিনের কর্মসূচি। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- ৭ নভেম্বর ভোরে দলীয় কার্যালয়ে দলীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল ১০টায় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নেতা-কর্মীদের শেরেবাংলা নগরে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো, ৮ নভেম্বর বিকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ। গতকাল দলের এক যৌথ সভায় এসব কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।