ভেড়ামারায় জাতীয় গ্রিডে কারিগরি সমস্যার কারণে সারাদেশে বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ
হয়ে যায় ভেড়ামারা বিদ্যুত্ কেন্দ্রে ভারত থেকে আসা ৫০০ মেগাওয়াটের লাইন বসে গেছে
জাতীয় গ্রিডে কারিগরি ত্রুটির কারণে গতকাল শনিবার রাজধানীসহ সারাদেশে বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (রাত সাড়ে ৯টা) রাজধানীর কয়েকটি এলাকাসহ দেশের প্রায় ১৪টি জেলায় বিদ্যুত্ সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও অধিকাংশ এলাকা রয়েছে অন্ধকারে। জাতীয় গ্রিডের এ ত্রুটির সাথে বন্ধ হয়ে যায় দেশের সবকটি বিদ্যুত্ কেন্দ্র। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও কমপক্ষে ১২ ঘণ্টা সময় লাগবে বলে কর্মকর্তারা সর্বশেষ জানিয়েছেন।
রাজধানীর রামপুরায় গতকাল বেলা সাড়ে ৩টায় ন্যাশনাল লোড ডেসপ্যাচ সেন্টারে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে বিদ্যুত্ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিদ্যুত্ বিপর্যয়ের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে সাংবাদিকদের বলেছেন, বিদ্যুত্ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে। জাতীয় গ্রিড লাইন মেরামতে প্রকৌশলীরা কাজ করছেন।
গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এ বিদ্যুত্ বিপর্যয় হয়। বিদ্যুত্ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার বাহিরচর ইউনিয়নের ষোলদাগ গ্রামে জাতীয় গ্রিডে ত্রুটির কারণে সারাদেশে বিদ্যুত্ বিপর্যয় হয়েছে। ভেড়ামারায় জাতীয় বিদ্যুত্ সঞ্চালন লাইনে ত্রুটি দেখা দেয়ার পর ব্ল্যাক আউট হয়েছে। গতকাল দেশে ছয় হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল বলে জানা গেছে। রাত ৮টা পর্যন্ত বিদ্যুতের উত্পাদন প্রায় ৭০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে।
এদিকে বিদ্যুত্ না থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছে হাসপাতালের রোগীসহ বিদ্যুতের উপর নির্ভরশীলরা। অনেকেই ইত্তেফাকে ফোন করে তাদের উদ্বেগ, উত্কণ্ঠার কথা জানান।
রাজধানীর এপার্টমেন্ট ও আবাসিক এলাকায় দিনভর জেনারেটর চালু রেখে বিদ্যুত্ যোগান দেয়ার চেষ্টা করা হয়। যেসব আবাসিক এলাকা ও বহুতল ভবনে জেনারেটর নেই সেগুলোতে পানি সংকটের সৃষ্টি হয়। এছাড়া সিএনজি ও জ্বালানি তেলের ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি সরবরাহে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
সারাদেশে বিদ্যুত্ বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আহমেদ কায়কাউসকে প্রধান করে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করেছে সরকার। আগামী তিনদিনের মধ্যে কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
ভেড়ামারা (কুষ্টিয়া) সংবাদদতা এ কে এম কাওছার হোসেন জানান, শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ভেড়ামারায় জাতীয় বিদ্যুত্ সঞ্চালন লাইনে এ বিপর্যয় ঘটে। কুষ্টিয়া থেকে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান বলেন, “বেলা ১১টা ২৯ মিনিটে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার ষোলদাগ এলাকায় জাতীয় বিদ্যুত্ সঞ্চালন লাইনে ত্রুটি দেখা দেয়ার পর ব্ল্যাক আউট হয়েছে। ভারতীয় এবং বাংলাদেশি লাইনের সংযোগস্থলে ত্রুটি দেখা দিয়েছে। সঞ্চালন লাইন মেরামতে কাজ শুরু হয়েছে বলে তিনি জানান
ভেড়ামারা বিদ্যুত্ সরবরাহের আবাসিক প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম জানান, বিদ্যুত্ লাইন চালানোর পর আবার ত্রুটি দেখা দেয়ায় তা বন্ধ করে দিতে হয়েছে। বিদ্যুত্ কখন দেয়া হবে তা এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি পিজিসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএ বাকি বলেন, জাতীয় গ্রিড বসে গেছে। তাই সারাদেশে বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। কখন বিদ্যুত্ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে তা বলা মুশকিল। তবে তিনি জানিয়েছেন, ভারত থেকে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা বিদ্যুত্ কেন্দ্রে যে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ আসে সেই লাইনটি বসে যাওয়ার প্রভাবে এ বিপর্যয় হয়েছে।
নরসিংদী প্রতিনিধি নিবারণ রায় জানান, জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ের কারণে ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুত্ কেন্দ্রের ৬টি ইউনিটে সাড়ে ৯শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন বন্ধ হয়ে গেছে। পল্লী বিদ্যুত্ সমিতি-২ এর জিএম সাইরুল ইসলাম জানান, জাতীয় গ্রিড বিপর্যয়ে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সকাল সাড়ে ১১টা থেকে বিদ্যুত্ নেই বলে তিনি জানান।
সিলেট অফিস জানায়, সারা দেশের মত সিলেটেও বিদ্যুত্ বিভ্রাট চলছে। ফলে গ্রাহকরা মারাত্মক দুর্ভোগে পড়েছেন। বাসা-বাড়ি, ব্যবসা বাণিজ্য কেন্দ্রে সংকট দেখা দিয়েছে। বেলা সাড়ে ১১ টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত নগরীসহ আশপাশ এলাকায় বিদ্যুত্ সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। বেলা আড়াইটার পর শহরের কুমারগাঁও ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ কেন্দ্র থেকে নগরীতে রেশনিং এর মাধ্যমে বিদ্যুত্ সরবরাহ করা হচ্ছে বলে নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল হোসেন জানান।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, বিদ্যুতের অভাবে জেলার জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। জেলা বিদ্যুত্ বিভাগ এর নির্বাহী প্রকৌশলী জুলকার নাইন শফি জানান, রাত ১১টা নাগাদ গাইবান্ধায় বিদ্যুত্ আসার সম্ভাবনা আছে।
রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, বিদ্যুত্ না থাকায় এলাকায় চালকলসহ বিভিন্ন কলকারখানায় উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, চট্টগ্রাম কাপ্তাই জলবিদ্যুত্ কেন্দ্রের দু’টি ইউনিট চালানোর চেষ্টা করা হলেও সম্ভব হয়নি।
বিদ্যুত্ না থাকায় হাসপাতাল, ছোট ও মাঝারি শিল্প কারখানায় উত্পাদন ব্যাহত হয়। ছোট ছোট গার্মেন্টস কারখানায় সৃষ্টি হয় অচলাবস্থা। ইপিজেডগুলোর নিজস্ব পাওয়ার প্ল্যান্ট থাকাতে সেখানে উত্পাদন সচল ছিলো। চট্টগ্রামে পিকআওয়ারে দৈনিক ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ চাহিদা রয়েছে। বিকাল ৫টায় পিডিবি’র হাটহাজারী ন্যাশনাল গ্রিড মেশিন থেকে জানানো হয়, তারা অল্প পরিমাণে বিদ্যুত্ সরবরাহ পেয়েছে।
পিরোজপুর অফিস জানায়, বিদ্যুত্ না থাকায় জেলার সর্বত্র চিকিত্সা সেবা, পানি সরবরাহ, ব্যবসা-বাণিজ্য, বাসা-বাড়িতে দুর্ভোগ নেমে আসে। বিদ্যুতের অভাবে পাড়েরহাট, পাথরঘাটা, রায়েন্দা, বাগেরহাট, আলীপুর, মহিপুর, আমুয়া প্রভৃতি স্থানে বরফকল বন্ধ হয়ে যায়। মত্স্য আহরণ মৌসুমে বরফ উত্পাদন ব্যাহত হওয়ায় আহরিত মাছ সংরক্ষণ বিঘ্নিত হবে বলে ব্যবসায়ীরা জানান। স্বরূপকাঠী থেকে প্রাপ্ত সংবাদে জানা গেছে, কৌড়িখারা বিসিক নগরীতে শিল্প উত্পাদনও বন্ধ রয়েছে।
ফের বিপর্যয় বিদ্যুত্ গ্রিডে
গতকাল সন্ধ্যে ৭টায় বিদ্যুত্ সচিব মনোয়ার ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, জাতীয় গ্রিডে ত্রুটি সারাতে গিয়ে ফের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে জাতীয় গ্রিডে। ফলে বিদ্যুত্ সঙ্কট দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমরা অনেক ইমপ্রুফ করেছি, তবে তাড়াহুড়ো করছি না। কারণ, এতে অনেক বড় বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে। বিদ্যুত্ সচিব বলেন, ‘আমরা আন্তরিকতার সাথে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আশা করছি, দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হবে।’
রাজধানীর কয়েকটি এলাকসহ ১৪ জেলায় বিদ্যুত্ এসেছে
গতকাল রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত রাজধানীর মতিঝিল, ধানমন্ডি, শ্যামপুর, জুরাইন, পোস্তগোলা, যাত্রাবাড়ী, বাসাবো, মুগদা, বাড্ডা, রামপুরাসহ বিভিন্ন জায়গায় বিদ্যুত্ এসেছে। এছাড়া চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, মৌলভিবাজার, কিশোরগঞ্জ, কক্সবাজার, ফেনী, কুষ্টিয়া, বরিশাল, নাটোর, কুমিল্লা, গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট ও নরসিংদী জেলায় বিদ্যুত্ এসেছে।
বিদ্যুত্ মন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, আশা করছি রাতের মধ্যেই রাজধানীসহ দেশের অনেক জায়গায় বিদ্যুত্ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
