বিদ্যুত্ বিপর্যয়ের কারণে গতকাল শনিবার সারাদেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিত্সা কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়েছে। অনেক স্থানে রোগীর মৃত্যুর অভিযোগও উঠেছে। কোন কোন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে জেনারেটর থাকলেও পুরো হসপাতালে জেনারেটর সুবিধা দেয়া যায়নি। ছিল ওয়াসার পানির তীব্র সংকট। কোন কোন হাসপাতালে বিকাল ৫টা থেকে কোথাও এর আগে থেকে ছিল না পানি। পানির অভাবে কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস সেবা বন্ধ হয়ে যায়। সংকট দেখা দেয় ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটেও। পানি সংকটে সব হাসপাতালে দেখা গেছে হাহাকার। হাসপাতালে এমন বিপর্যয় অতীতে আর কখনো হয়েছে কিনা তা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের জানা নেই।
ঢাকার বাইরে বেশির ভাগ হাসপাতালে জেনারেটর নেই। যেখানে আছে, সেগুলোও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। গতকাল বিদ্যুত্ বিপর্যয়েও সেগুলো সচল করা সম্ভব হয়নি। জেলা সদর ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিত্সা দুপুর থেকে বন্ধ হয়ে যায়। জরুরি চিকিত্সা কোনভাবে দিচ্ছেন চিকিত্সকরা। স্বাস্থ্য অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডা. সুভাষ কুমার সাহা বলেন, শুনেছি সারাদেশে চিকিত্সা সেবা বিঘ্নিত হয়েছে। সব হাসপাতালে তিনি খোঁজ-খবর নিচ্ছেন বলে জানান।
অভিযোগ উঠেছে, স্বাস্থ্য খাতের কোটি কোটি টাকা লুটপাট ও অপচয় হয় অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং নানা কারণে। প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ যেকোন বিপর্যয় মোকাবিলার ব্যবস্থা নেয়া হয়নি কোন চিকিত্সা সেবা কেন্দ্রে। স্বাস্থ্য অধিদফতর ও মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজ কতিপয় কর্মকর্তার কাছে এ ধরনের জরুরি সার্ভিস কখনো গুরুত্ব পায়নি। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ হাসপাতালে জেনারেটর সার্ভিসের জন্য অর্থ বরাদ্দ কিংবা জেনারেটর সরবরাহ করার আবেদন করলেও সাড়া পায়নি। সিনিয়র বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকগণ বলেন, বিদ্যুত্ বিপর্যয়ে ডায়ালাইসিসসহ জরুরি চিকিত্সা সেবা ব্যাহত হয়েছে। অনেক সংকটাপন্ন রোগীর প্রাণহানি ঘটেছে। ২৪ ঘণ্টা পুরো হাসপাতালে এ ধরনের বিপর্যয় মোকাবিলায় জেনারেটর সাপোর্ট নেই। কোন কোন হাসপাতালে জেনারেটর থাকলেও সীমিত আকারে সেটি সাপোর্ট দেয়। এমন পরিস্থিতিতে রোগীর মৃত্যুর জন্য দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা দায়ী হবেন বলে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানান।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল দেশের সর্ববৃহত্ চিকিত্সা সেবা কেন্দ্র। প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার রোগী চিকিত্সাধীন থাকে। বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৪ হাজারের অধিক রোগী ও জরুরি বিভাগে সহস্রাধিক রোগী চিকিত্সার জন্য আসে। এ হাসপাতালে জেনারেটর বেশির ভাগ জায়গায় নেই। অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ ও সিসিইউ কিছু সংখ্যক ওয়ার্ডে রয়েছে। অন্যান্য সরকারি হাসপাতালের জেনারেটর অবস্থা বর্ননা করার প্রয়োজন নেই। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় বিদ্যুত্ চলে যাওয়ার পর এ জেনারেটর দিয়ে জরুরি অপারেশন করা হয়। সঙ্গে শুরু হয় পানি সংকট। সিটিস্ক্যান, এমআরআইসহ সকল ধরনের পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায়। তিনটা পর্যন্ত ডায়ালাইসিস কোন রকমে চললে এরপর পানি সরবরাহ না থাকায় ডায়ালাইসিস সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে। সংকটাপন্ন রোগীর স্বজনরা শুরু করে আহাজারি। সন্ধ্যায় খাবার সরবরাহ করা নিয়ে কর্তৃপক্ষ পড়ে বিপাকে। এ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. মুসফিকুর রহমান বলেন, ওয়াসার কাছ থেকে ২ গাড়ি পানি ক্রয়ের জন্য ব্যবস্থা করেছেন। এ পানি আসলে রোগীদের রান্নার কাজ শুরু হবে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত ওয়াসা থেকে পানি সরবরাহ করা হয়নি। এ কর্মকর্তা বলেন, তার চাকরি শেষ প্রান্তে পৌঁছেছে। এমন পরিস্থিতি আর কখনও দেখেননি তিনি। রোগীদের চরম ভোগান্তির শেষ নেই। টয়লেটের দুর্গন্ধে হাসপাতালে থাকা কষ্টকর। বহির্বিভাগে চিকিত্সকরা নিজ মোবাইল ফোন দিয়ে রোগীদের চিকিত্সা দিতে দেখা যায়। এমন পরিস্থিতিতে ডাক্তার, নার্স, কর্মচারী ও কর্মকর্তারা চিকিত্সা সেবা দিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্বপালন করে যাচ্ছেন। চিকিত্সক উপস্থিত থাকলে কি হবে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অন্যান্য ব্যবস্থা বন্ধ থাকলে রোগীদের চিকিত্সা সেবা যা হওয়ার তা হচ্ছে বলে চিকিত্সকরা জানান।
মিটফোর্ড হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট, কিডনি ইনস্টিটিউট, মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, পঙ্গু হাসপাতাল, নিউরো সায়েন্স ইনস্টিটিউট, মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ও বক্ষব্যাধি হাসপাতালে চিকিত্সা সেবার একই অবস্থা।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. নাসিম বলেন, জেনারেটর চালু করে রোগীদের চিকিত্সা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছি। সারাদেশের চিকিত্সা সেবা মনিটরিং করছি।
সিলেটের ইত্তেফাকের প্রতিনিধি ফখরুল ইসলাম জানান, ওসমানি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও সদর হাসপাতালে জরুরি কিছু অপারেশন ব্যতীত পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ।
চট্টগ্রামে ইত্তেফাকের স্টাফ রিপোর্টার নিজাম উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ আশপাশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের অবস্থা করুণ। জেনারেটর দিয়ে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কিছু জরুরি অপারেশন করা হয়েছে। বাকি সবই বন্ধ। এ হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শহীদুল গনি বলেন, জেনারেটর দিয়ে জরুরি চিকিত্সা ব্যবস্থা যেটুকু কভার করতে পেরেছে। তা করেছি।
বরিশালে ইত্তেফাকের স্টাফ রিপোর্টার লিটন বাসার জানান, বরিশাল শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ আশপাশের উপজেলা স্বাস্থ্য সেবা বন্ধ। তবে উক্ত মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল জেনারেটর দিয়ে জরুরি চিকিত্সা সেবা যেটুকু সম্ভব। কর্তৃপক্ষ সেটুকু দিয়েছে।
খুলনা থেকে ইত্তেফাকের প্রতিনিধি এনামুল হক জানান, খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতাল, শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং সদর হাসপাতালে চিকিত্সা সেবা প্রায় বন্ধ। জেনারেটর দিয়ে জরুরি চিকিত্সা সেবার ঠেকা কাজ চালানো হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা সবই বন্ধ। রোগীদের আহাজারি দেখার কেউ নেই।
খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবদুস সামাদ বলেন, ছোট জেনারেটর দিয়ে যেটুকু সম্ভব সার্ভিস দিয়েছি।
