স্থায়ী সামরিক শাসনের ছক ছিল ১-১১তে!

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০১৪, ০১:২৫

ড. ফখরুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার চেয়েছিল গণতেন্ত্রর বদলে চিরস্থায়ী সামরিক শাসন। আর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টাদের সভায় দুই নেত্রীকে গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আড়ালে থেকে কলকাঠি নাড়ে দুইটি শক্তিশালী দূতাবাস। তবে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের গণআন্দোলনের কারণে তাদের ষড়যন্ত্র সফল হয়নি।

সমপ্রতি একটি দৈনিকে সাক্ষাত্কারে যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে অবস্থানরত ওয়ান ইলেভেন পরিকল্পনা বাস্তবায়নকারী ডিজিএফআইয়ের তত্কালীন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ফজলুল বারী নানা তথ্য দেন। এর প্রেক্ষিতে সে সময় রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশের শর্তে ইত্তেফাককে জানান, ব্রিগেডিয়ার বারী এখন বিভ্রান্তিকর নানা তথ্য দিচ্ছেন। সে সময় প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা অধিদফতরের (ডিজিএফআই) মহাপরিচালক ওই দুই দূতাবাসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। দূতাবাসের কর্মকর্তারা তার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করে কর্মপরিকল্পনা ঠিক করে দিতেন।
ইত্তেফাকের সঙ্গে সাক্ষাত্কারে ওই কর্মকর্তা দুই নেত্রীকে গ্রেফতারে কার কি ভূমিকা ছিল তা আকার-ইঙ্গিতে জানিয়ে দেন। জানান, দায়িত্বের কারণে তাকে অনেক বৈঠকে উপস্থিত থাকতে হয়েছে।
তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর সামরিক সরকার দেশের ক্ষমতা দখল করে। সেসময় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি তেমন ছিল না। পরবর্তীতে  জিয়াউর রহমান নিহত হলে পুনরায় সামরিক সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতা গ্রহণ করে। তখন বিএনপিও সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী ছিল না। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সাংগঠনিকভাবে নিজেদের শক্তিশালী করে গড়ে তুলে। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশ চালাতে গিয়ে বুঝতে পেরেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভিত কত শক্ত। রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের দুর্বার আন্দোলনের মুখে নেপথ্যে থাকা ওই দূতাবাস একসময় তাদের পরিকল্পনা পরিবর্তন করে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, সেসময় সেনা প্রধান জেনারেল (অব.) মইন ইউ আহমেদ, লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, মেজর জেনারেল (অব.) এমএ মতিন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আমিন ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) বারী এবং উপদেষ্টাদের মধ্যে কার কি ভূমিকা তা স্বচক্ষে দেখেছেন। এখন অনেকে সাধু বনে গেছে। সেসময় প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দিন আহমেদ ছাড়াও ৫ জন উপদেষ্টা ছিলেন বেশ সক্রিয়। ২০০৭ সালের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
ওই কর্মকর্তা জানান, তখন তিনিও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে ৫ উপদেষ্টা ছাড়াও ঐ সময়ের সেনা প্রধান জেনারেল মইন, লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, ডিজিএফআই’র তত্কালীন মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল) আমিন উপস্থিত ছিলেন। সেসময় ব্রিগেডিয়ার আমিন যা বলতেন  সবাই তাতে সায় দিতেন।
কারণ হিসেবে ঐ শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, তাকে দুটি শক্তিশালী দেশ পরামর্শ দিতেন। আর সব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব তার উপরই ছিল। বৈঠকে দুই নেত্রীকে গ্রেফতার করে স্থায়ী সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠায় ছক আঁকা হয়। দুই নেত্রীর কাকে আগে গ্রেফতার করা হবে এনিয়ে প্রশ্ন উঠে। চারদলীয় জোট সরকারের ঠিক পরপরই আসে ১/১১। খালেদা জিয়াকে প্রথমে গ্রেফতারের প্রস্তাব উঠে বেঠকে। কিন্তু তিনজন উপদেষ্টা, দুই সেনা কর্মকর্তা ও দুই দূতাবাসের পরামর্শ অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে আগে গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই ধানমন্ডির সুধাসদন থেকে শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়। দুর্নীতির অভিযোগে সেসময় চারদলীয় জোট সরকারের অনেক নেতার নাম দুর্নীতি দমন কমিশন প্রকাশ করে। তাদের গ্রেফতারও করা হয়। খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার না করার জন্য কতিপয় সেনা কর্মকর্তা ও বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত দেশসমূহ থেকে চাপ আসে।
অবশেষে শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারের ৪৮ দিন পর ২০০৭ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হয়।

ওই কর্মকর্তা ইত্তেফাকের এ প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ব্রিগেডিয়ার বারীর মত তার কিছু লেখার ইচ্ছা নেই। এদেশে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে, হয়তো সামনেও হবে। কিন্তু যারা এগুলো করেন তারা থাকেন পর্দার অন্তরালে।