মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের রিভিউ পিটিশন দাখিলে কোন সাংবিধানিক সুযোগ নেই। সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদে নতুন সংশোধনীতে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সবধরনের সাংবিধানিক অধিকার হরণ করা হয়েছে। তবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারকদের তাদের রায়ের ভুল-ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ সবসময়ই রয়েছে। এখন আপিল বিভাগ যদি মনে করে, কামারুজ্জামানের রায়ে মারাত্মক ত্রুটি রয়েছে তাহলে স্বপ্রণোদিত হয়ে অথবা অন্য কোনভাবে দৃষ্টিগোচর হলে তারা তাদের রায় পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
রিভিউয়ের বিষয়টি একটি সাংবিধানিক অধিকার। এই অধিকার সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদ আদালতকে দিয়েছে। এতে বলা আছে, “সংসদের যে কোন আইনের বিধি-বিধানাবলী সাপেক্ষে এবং আপিল বিভাগ কর্তৃক প্রণীত যে কোন বিধি-সাপেক্ষে আপিল বিভাগের কোন ঘোষিত রায় বা প্রদত্ত আদেশ পুনর্বিবেচনার ক্ষমতা উক্ত বিভাগের থাকিবে।”
১৯৮৮ সালে প্রণীত আপিল বিভাগের বিধিমালার ৬ষ্ঠ অধ্যায়ে রিভিউ পিটিশন দাখিলের জন্য ৩০ দিনের সময়ের কথা বলা আছে। এ প্রসঙ্গে আসামিপক্ষের আইনজীবী এম তাজুল ইসলাম বলেন, রিভিউ করা কামারুজ্জামানের সাংবিধানিক অধিকার। এই সুপ্রিম কোর্টও সৃষ্টি হয়েছে সংবিধানের দ্বারা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে এই সুপ্রিম কোর্ট সৃষ্টি হয়নি। তিনি বলেন, রায়ের কপি হাতে পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে রিভিউ পিটিশন দাখিলের সাংবিধানিক অধিকার তাদের রয়েছে। কিন্তু সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ক্ষেত্রে সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হবে না। সংবিধানের ৪৭ ক (১) ও (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আসামির রিভিউ আবেদন দাখিলের সুযোগ নেই। ৪৭ ক। (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের (৩) দফায় বর্ণিত কোন আইন প্রযোজ্য হয়, সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ, ৩৫ অনুচ্ছেদের (১) ও (৩) দফা এবং ৪৪ অনুচ্ছেদের অধীন নিশ্চয়কৃত অধিকারসমূহ প্রযোজ্য হইবে না। ” ৪৭ ক। (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “এই সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের (৩) দফায় বর্ণিত কোন আইন প্রযোজ্য হয়, এই সংবিধানের অধীন কোন প্রতিকারের জন্য সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করিবার কোন অধিকার সেই ব্যক্তির থাকিবে না।” প্রসঙ্গত ওই (৩) দফায় বলা হয়, “এই সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীন অন্যান্য অপরাধের জন্য কোন সশস্ত্র বাহিনী বা প্রতিরক্ষা বাহিনী বা সহায়ক বাহিনীর সদস্য (বা অন্য কোন ব্যক্তি, ব্যক্তি সমষ্টি বা সংগঠন) কিংবা যুদ্ধবন্দীকে আটক, ফৌজদারিতে সোপর্দ কিংবা দণ্ডদান করিবার বিধান সম্বলিত কোন আইন বা আইনের বিধান এই সংবিধানের কোন বিধানের সহিত অসামঞ্জস্য বা তাহার পরিপন্থি, এই কারণে বাতিল বা বেআইনি হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে না।”
উল্লেখ্য, ৪৭ অনুচ্ছেদের মূল সংশোধনীটি ১৯৭৩ সালের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে যুক্ত করা হয়েছিলো। এটি মূলত সশস্ত্র বাহিনী বা প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিলো। পরে ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীতে ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টিকে এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর ফলে যেসব ব্যক্তি যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত হয়েছেন তাদের সাংবিধানিক অধিকার নেই। রিভিউর আবেদন দাখিল করার বিষয়টি একটি সাংবিধানিক অধিকার। এ কারণে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কামারুজ্জামানের রিভিউ আবেদন দাখিল করার কোন অধিকার নেই। তবে এই বিধানটি শুধু মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এর মাধ্যমে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকদের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়নি।
সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদে রিভিউর যে ক্ষমতার কথা বলা আছে তা মূলত আপিল বিভাগের ক্ষমতা। এখানে উল্লেখ রয়েছে, আপিল বিভাগের কোন ঘোষিত রায় বা প্রদত্ত আদেশ পুনর্বিবেচনার ক্ষমতা উক্ত বিভাগের থাকবে। অর্থাত্ এই অধিকার আদালতের। এখন যদি আপিল বিভাগ মনে করেন তাদের রায়ে মারাত্মক ত্রুটি রয়েছে তাহলে এই ত্রুটি সংশোধনের অধিকার তাদের রয়েছে। এটি তারা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে করতে পারেন অথবা অন্য কোনভাবে তাদের দৃষ্টিগোচর হলে তারা সেটি আমলে নিতে পারেন।
এ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, আইন অনুসারে সুপ্রিম কোর্টে রিভিউ আবেদন করতে পারলেও রিভিউ আমলে নেয়া কিংবা না নেয়া আদালতের ব্যাপার। তবে রায়ের বিরুদ্ধে কাদের মোল্লার রিভিউ আবেদন খারিজ করার দৃষ্টান্ত রয়েছে আদালতের।
এদিকে কাদের মোল্লার রিভিউ আবেদনের বিষয়ে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রায় এক বছরেও প্রকাশ হয়নি। এর ফলে কামারুজ্জামানের রিভিউ পিটিশন দাখিলের সুযোগ আছে কি নেই এ বিভ্রান্তি রয়েছে।
