গৃহকর্মী নির্যাতন: চার মাসে ১০৭ জনের আত্মহত্যা

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০১৪, ১৬:৩৯
পপি আক্তার (ছদ্মনাম)। বয়স বিশ থেকে বাইশের মধ্যে। গ্রামের বাড়ি রংপুরে। বাবা নেই। মা আছেন। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় তিনি। অভাবের সংসারে একটু স্বচ্ছলতা আনতে গ্রাম থেকে কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসে ২০১৩ সালের শেষ দিকে। পূর্ব পরিচিত একই এলাকার এক মহিলার সহায়তায় রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকার এক বাসায় গৃহকর্মীর কাজ নেন। ঐ বাসায় গৃহকর্তা কয়েক বছর আগেই মারা গেছেন। তার ৬ মেয়ে। কোনো ছেলে সন্তান নেই। পাঁচ মেয়ের বিয়ে হয়েছে। তবে তারা সবাই ঘর জামাই। পপির প্রথম দিকটা ভালই কাটছিল। গৃহকর্ত্রীও তাকে মেয়ের মতোই ভাল বাসতেন; কিন্তু ঝামেলা শুরু করে গৃহকর্ত্রীর মেয়ের জামাইরা। ঘরে সুন্দরী স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও কু-নজর পড়ে পপির উপর। ভুলিয়ে-ভালিয়ে পর্যায়ক্রমে প্রত্যেক জামাই পপির সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করে। প্রথম দিকে পপি চাকরি হারোনার ভয় মুখ বুঝে সহ্য করে; কিন্তু শেষটায় যৌন নির্যাতনের ঘটনা এতোটাই বেড়ে যায়, যাতে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় পপি। কারণ বিষয়টি এমনই ছিল যে, মুখ ফুটে কাউকে বলার মতোও অবস্থা ছিল না। শেষ মুহূর্তে বিষয়টি জানাজানি হয়। ধানমন্ডি থানায় মামলা করে পপি। পুলিশ যৌন নির্যাতনের অভিযোগে পাঁচ জামাইকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠায়। এ তথ্য জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ধানমন্ডি জোনের সহকারী কমিশনার রেজাউল করিম।
ডিএমপি ও অন্যান্য সূত্রের তথ্য থেকে জানা যায়, রাজধানীতে গৃহকর্মীর সংখ্যা ১ লাখ ৩২ হাজার। পপি শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা না করলেও অনেক গৃহকর্মী এ পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। প্রাপ্ত তথ্যে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়,  রাজধানীতে প্রতি মাসে যতো আত্মহত্যার ঘটনা (অপমৃত্যু) ঘটে তার বেশির ভাগই করেন গৃহকর্মীরা। গত চার মাসে রাজধানীতে আত্মহত্যার (অপমৃত্যুর) ঘটনা দেড় শতাধিক। এরমধ্যে ১০৭ জনই গৃহকর্মী (জুলাই মাসে ২৪ জন, আগস্ট মাসে ২১ জন, সেপ্টেম্বর মাসে ২৭ জন, অক্টোবর মাসে ৩৫ জন)। সর্বশেষ গত শুক্রবার মহাখালী এলাকার এক বাসায় আত্মহত্যা করেন সালমা আক্তার (১৭) নামে এক গৃহকর্মী। ঘটনাস্থল পরির্দশনকারী বনানী থানার এসআই শরিফ হোসেন বলেন, মহাখালীর ব-ব্লকের এক বাসায় বাথরুমের দরজা ভেঙে সালমার লাশ উদ্ধার করা হয়। লাশ ময়না তদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। কী কারণে সে আত্মহত্যা করেছে তা জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। দুই মাস আগে ঐ বাসায় কাজে এসেছিল। তার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জে।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, উদ্ধার হওয়া লাশের (গৃহকর্মী) ব্যাপারে বেশির ভাগই হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। তবে প্রায় প্রত্যেকটি ঘটনাকে আত্মহত্যা বলেই চালানো হচ্ছে; কিন্তু অভিযোগ থাকলেও পুলিশের পক্ষ থেকে সবক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। কারণ অধিকাংশ ঘটনায় নিহতদের স্বজনরা কিছু টাকার বিনিময় আপোষ করতে বাধ্য হয়।
সূত্র জানায়, গৃহকর্মী আত্মহত্যার ঘটনায় (অনেক ক্ষেত্রে হত্যার অভিযোগ থাকে) উভয় পক্ষই সিংহভাগ ঘটনায় আপোষ করে। তবে অভিযুক্ত পক্ষ পুলিশকে ‘খুশি’ করে থাকে।
ডিএমডির ধানমন্ডি জোনের সহকারী পুলিশ কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, অধিকাংশ ঘটনায় দেখেছেন, পরিস্থিতি শিকার হয়ে গৃহকর্মীরা আত্মহননের পথ বেছে নেয়। এর প্রধান শারীরিক ও যৌন নির্যাতন।
তিনি বলেন, গ্রামের দরিদ্র পরিবারের মেয়েরাই পেটের দায় শহরের বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে কাজে আসে। নতুন পরিবেশ। সব কিছু বুঝতে তাদের সময় লাগে; কিন্তু সামান্য ভুলের জন্য প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হয় গৃহকর্মীরা। পরিণতিতে যৌন হয়রানির শিকাড় হতে হয়। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে- গৃহকর্মীদের সামনে আর কোন পথ খোলা থাকে না। বাধ্য হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তারা।
তিনি বলেন, বর্তমান সময় গৃহকর্মী যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে তা ভুক্তভোগীরা অনুধাবন করতে পারবেন; কিন্তু সে বিষয়টির দিকে অনেকেই খেয়াল রাখে না। গ্রাম থেকে আসা এসব মেয়েদের নিজ সন্তানের মতো আদর-যন্ত্র দিলে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতো না।
একই ধরনের মন্তব্য করেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের পরির্দশক হালিমা খাতুন। তিনি বলেন, ভিকটিক সাপোর্ট সেন্টারে যাদের নগরীর বিভিন্ন থানা থেকে পাঠানো হয় তাদের একটি বড় অংশই গৃহকর্মী। যারা গৃহকর্ত্রীর নির্যাতনের শিকার হয়ে বাসা থেকে পালিয়ে ছিল। পরে পথচারীরা তাদের উদ্ধার করে থানায় হস্তান্তর করে।