ভুয়া ওয়ারেন্ট চক্রের মামলা বাণিজ্য

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০১৪, ০০:০৬

সারাদেশে ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে ভয়ঙ্কর ফাঁদ পাতা প্রতারক চক্র ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করছে। আর মামলা করে প্রতারক চক্রটি আপসের নামে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছে। এসব মামলা তদন্ত নিয়ে পুলিশও বিপাকে পড়েছে।

প্রতারক চক্রের হয়রানি থেকে মুক্তি পেতে ভুক্তভোগীরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন। রাজধানীর তেজগাঁও, ডেমরা, উত্তরা পশ্চিম, ওয়ারী, দক্ষিণখান, উত্তরখানসহ ১৫টি থানায় মিথ্যা মামলা দায়েরের অভিযোগ রয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে চক্রটি সরাসরি আদালতে মামলা দায়ের করার পর তা থানায় তদন্তে আসলে বিষয়টি সাজানো বলে পুলিশের তদন্তে প্রমাণ মিলে।
রাজধানীর ৪৯টি থানার মধ্যে ওয়ারী থানার ওসি তপন চন্দ  সাহার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এই চক্র খুবই প্রভাবশালী। তারা আদালত ও থানায় মামলা দায়ের করে উল্টো আরো পুলিশকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়ে আসছে। তাদের দায়ের করা মামলা তদন্তে ভুয়া প্রমাণ হলে তারা ঐ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দিয়ে পুলিশ সদর দফতরের কাছে অভিযোগও করে।
যাত্রাবাড়ীর বিপ্লব খান স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে অভিযোগ করেন, গুলিস্তানের ৫২/এ, কাপ্তান বাজারের হিউম্যান রিসোর্স এন্ড হেলথ ফাউন্ডেশন নামে একটি নাম সর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের মেহেদী হাসান নামে মিডিয়া পরিচালক ওয়ারী থানায় ৮ জনের নাম উল্লেখ করে একটি অপহরণ ও হত্যা চেষ্টার অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেন। মামলায় আসামিরা হলেন ছোবহান, কবির গাজী, ইউসুফ, তানভীর রাজা, সাবের, হাবিব, দুলাল সোহাগী ও বিপ্লব। এ আসামিদের সঙ্গে মেহেদী হাসান যোগাযোগ করে মামলার আপসনামার নামে প্রত্যেকের কাছ থেকে এক লাখ টাকা করে চাঁদা দাবি করেন। পরে তিনি ওয়ারী থানার ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বিষয়টি তদন্ত করে মতামত দেন যে ঐ মামলার অভিযোগ সবই ভুয়া। এরপর ওয়ারী থানার ওসি মামলার বাদী মেহেদী হাসানকে খোঁজ করলে তিনি পলাতক থাকেন।
এরকম জনৈক মিয়াজী সেলিম গত ২৩ মার্চ ওয়ারী থানায় মানব পাচার আইনে ১০ জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা করেন। পুলিশ মামলাটি তদন্ত করে ধারণা করছে, মামলার অভিযোগ ভুয়া। ইতিমধ্যে এই মামলার আসামিদের কাছ থেকে বাদী টাকা আদায় করার অভিযোগও জমা পড়েছে ডিএমপি সদর দফতরে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) সদর দফতরের অপরাধ শাখার একজন কর্মকর্তা জানান, গত এক বছর ধরে মেহেদী হাসান, মিয়াজী সেলিমসহ অন্তত ১০ ব্যক্তি ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা তৈরি করে পুলিশকে বিভ্রান্ত করেছে। তারা বিভিন্ন আদালতের সিল, স্বাক্ষর ও কাগজ জাল করে ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা তৈরি করে পুলিশ সদর দফতরে ডাকযোগে পাঠিয়ে দেয়। পুলিশ এসব গ্রেফতারি পরোয়ানা সংশ্লিষ্ট থানায় পাঠানোর পর আসামিরা বিপাকে পড়েন। আসামি হিসাবে অনেক গণমান্য ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট থানার ওসি থানায় ডেকে আনার পর গ্রেফতারি পরোয়ানাটি ভুয়া বলে প্রমাণ হয়।
ডিএমপি’র একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, কয়েকদিন আগে উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকা থেকে একজন ব্যবসায়ী সদর দফতরে অভিযোগ দিয়েছেন। তিনি অভিযোগে উল্লেখ করেছেন যে, উত্তরা এলাকার একটি চক্র গত এক বছর ধরে তার বিরুদ্ধে চারটি ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা দিয়ে হয়রানি করেছে। গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে পুলিশ বাসায় যাওয়ার পর তার মান সম্মান নিয়ে প্রতিবেশিদের মধ্যে প্রশ্নের উদ্রেক হয়। এ নিয়ে তিনি সামাজিকভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। 
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশের সদর দফতরসহ আইন-শৃঙ্ক্ষলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার অভিযোগ বাক্সে এ ধরনের চক্রের সদস্যদের থানায় ও আদালতে মিথ্যা মামলা দায়ের করার অভিযোগ পড়ছে প্রতিদিন। অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট দফতর তদন্ত করে এ ব্যাপারে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া এ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস শাখার উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা তৈরি চক্রটি সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রের বেশ কয়েকজন সদস্যকে ইতিপূর্বে গ্রেফতার করা হয়েছে। চক্রটি আদালত বা থানায় মামলা দায়ের করে আসামিদের কাছ থেকে টাকাও আদায় করছে। তবে ভুক্তভোগীদের এসব অভিযোগ পুলিশের কাছে দিলে তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করে চক্রটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সুপ্রিমকোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক এডভোকেট শ.ম. রেজাউল করিম বলেন, ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা তৈরি অথবা মিথ্যা মামলা দায়ের করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার অপরাধে সর্বোচ্চ ৭ বছরের জেল হতে পরে। এছাড়া পৃথক আইনে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সরকারি কর্মচারীদের হয়রানি করার জন্য অভিযুক্তদের ৫ বছর সাজা দেয়ার বিধান রয়েছে।