স্বাস্থ্য খাতে নিয়োগ, বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতির প্রতিটি ধাপেই অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ক্ষেত্রে দলীয় তদবিরের পাশাপাশি ১০ হাজার থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়মবহির্ভূত অর্থের (ঘুষ) লেনদেন হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কর্মকর্তা, কর্মচারী, ইউনিয়ন নেতা, অফিস প্রধান, সহকারী, হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছাড়াও ক্ষমতাসীন দলের নেতারা এই উেকাচ গ্রহণ করে থাকেন। এছাড়া চিকিত্সকদের সাথে বেসরকারি খাতের ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর অবৈধ কমিশন লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
‘দেশের স্বাস্থ্য খাতে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ এবং উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এমন তথ্য তুলে ধরেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি। বিদ্যমান একাধিক সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে স্বাস্থ্য খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতীয় বাজেটে চিকিত্সা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোসহ ১৭ দফা সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীর হোটেল অবকাশে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে প্রতিবেদনের সার-সংক্ষেপ তুলে ধরেন টিআইবির প্রোগ্রাম ম্যানেজার তাসলিমা আক্তার। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। তারা বলেন, নিয়োগের ক্ষেত্রে কি পরিমাণ ঘুষ নেয়া হয়েছে সেটা অনুসন্ধান করেই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, স্বাস্থ্য খাতে সার্বিকভাবে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসনীয় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে জনবল সংকট ও ক্রমশ এ খাতের বাজেট কমে যাওয়ায় একদিকে অনিয়ম বাড়ছে, অন্যদিকে চিকিত্সা ব্যবস্থার প্রতি জনগণের অনাস্থা তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী এ খাতে জিডিপির পাঁচ শতাংশ ব্যয় হওয়ার কথা। অথচ বাংলাদেশে ব্যয় হচ্ছে দশমিক ৮৪ শতাংশ। এটি অত্যন্ত লজ্জার বিষয়। স্বল্প সম্পদ যথাযথভাবে ব্যবহার করা গেলে সেবার মান আরো বাড়ানো সম্ভব। এ অবস্থার পরিবর্তনে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সঠিকভাবে জাতীয় প্রাধান্য নির্ধারণ অপরিহার্য।
২০১৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৯ মাসব্যাপী পরিচালিত টিআইবির এ গুণগত গবেষণামূলক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তিভিত্তিক (অ্যাডহক) চিকিত্সক নিয়োগে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগে ১ থেকে ৫ লাখ টাকা নেয়া হয়। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ঢাকা এবং ঢাকার পাশের জেলায় বদলির ক্ষেত্রে নেয়া হয় ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা। চিকিত্সকদের উপজেলা এবং সদর থেকে ঢাকায় বদলি করতে নেয়া হয় ১ থেকে ২ লাখ টাকা। দুর্গম এলাকা থেকে সদরে, এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলা এবং উপজেলা থেকে সদরে বদলির জন্য ঘুষ দিতে হয় ১০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের বদলির জন্য দিতে হয় ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা। আর সুবিধাজনক স্থানে দীর্ঘদিন অবস্থানের জন্য আড়াই লাখ বা তার ওপরে উেকাচ দিতে হয়। ডিপার্টমেন্টাল প্রমোশন কমিটির (ডিপিসি) মাধ্যমে পদোন্নতির ক্ষেত্রে নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায় করা হয় ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, চিকিত্সকদের সঙ্গে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কমিশন ভিত্তিক অলিখিত চুক্তির মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও অভিযোগ রয়েছে। ডাক্তারদের ক্ষেত্রে এ কমিশনের হার ৩০ থেকে ৫০ ভাগ এবং দালালদের ক্ষেত্রে কমিশন ১০ থেকে ৩০ ভাগ পর্যন্ত হয়ে থাকে। গবেষণা প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, পদোন্নতির ক্ষেত্রে চাকরির অভিজ্ঞতা, জ্যেষ্ঠতা ও উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতাকে বিবেচনা করা হয় না। এছাড়া প্রকাশনাকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন, সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় পাস বা বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন সন্তোষজনক কি-না, তাও সব ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয় না। এছাড়া চিকিত্সকদের অতিরিক্ত যোগ্যতা ও ভুয়া পদবি ব্যবহারের অভিযোগ আছে।
তবে গবেষণা প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য খাতে বেশকিছু উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে। এর মধ্যে দেশব্যাপী কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় প্রাথমিক সেবা পৌঁছে দেয়া, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে ওষুধ শিল্পকে একটি রপ্তানিমুখী শিল্পে পরিণত করা উল্লেখযোগ্য।
গবেষণার পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বিদ্যমান আইনগুলো যুগোপযোগী না হওয়ায় চিকিত্সকের অবহেলার কারণে কোনো রোগীর মৃত্যু বা ক্ষতি হলে এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় না। এছাড়া বিনানুমতিতে কাজে অনুপস্থিতি ও বিলম্বে উপস্থিতির জন্য শাস্তির বিধান থাকলেও তার প্রয়োগ অত্যন্ত সীমিত।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মোট জনবলের ২০ ভাগ পদ শূন্য রয়েছে। বিদ্যমান জনবলের অনুপাতও বিশ্ব মানদণ্ড অনুপাতে খুবই কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী চিকিত্সক জনসংখ্যা অনুপাত ১:৬০০ হলেও বাংলাদেশে এটি ১:৩২৯৭। যেখানে আন্তর্জাতিকভাবে ডাক্তার ও নার্সের স্বীকৃত অনুপাত ১:৩, সেখানে বাংলাদেশে এ অনুপাত ১:০.৪।
স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে টিআইবি প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন আইন প্রণয়ন এবং বিদ্যমান আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার, বেসরকারি চিকিত্সা সেবা বিষয়ক খসড়া আইন চূড়ান্ত করণ, জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিসহ ১৭ দফা সুপারিশ করেছে।
সাংবাদিক সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- টিআইবির উপ-নির্বাহী পরিচালক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক রফিক হাসান এবং সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাহজাদা এম. আকরাম।
