ইয়াবায় বিপন্ন জীবন

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০১৪, ১০:১৩

সর্বনাশা নেশার ট্যাবলেট ইয়াবা দেশজুড়ে তার ভয়ংকর থাবা বিস্তার করে চলেছে। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে প্রায় সব শ্রেণি-পেশার লোক এই নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েছেন। কেউ জেনে, আবার কেউ না জেনেই বিপন্ন করছেন নিজের জীবন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, দেশে এমন কোন পেশা নেই যেখানে ইয়াবা আসক্ত নেই। বিশেষ করে তরুণ সমাজ বেশি আসক্ত। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের মধ্যেও রয়েছেন অনেকে। ছাত্র সংগঠনগুলোতে তো অভাব নেই ইয়াবাসেবীর। রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের গ্রামে গ্রামে ইয়াবা ব্যবহার ও বেচাকেনা চলছে প্রকাশ্যে। এমন কি পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিকরা পর্যন্ত জড়িয়ে পড়েছেন এই মরণনেশার বাণিজ্যে। ফলে হেরোইন, ফেনসিডিলসহ অন্যান্য মাদকের ব্যবহার কমে গেলেও ইয়াবাসেবীর সংখ্যা দেশে ক্রমেই বাড়ছে।
প্রখ্যাত মনোরোগ বিজ্ঞানী ডা. মোহিত কামাল বলেন, দেশে ইয়াবা (অ্যামফিটামিন)  ব্যবহার মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে চলেছে। আর একারণে সমাজে নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা ও হত্যাকাণ্ডসহ নানা অপরাধ বাড়ছে। তিনি বলেন, ইয়াবা আসক্তরা জন্মদাতা বাবা-মাকে খুন করতেও দ্বিধা করে না। ইয়াবা খেতে খেতে তারা একেকজন ‘মানববোমা’য় পরিণত হয়। মনুষ্যত্ব বলে কোন কিছু তাদের ভিতরে আর থাকে না। খুনের পর খুন কিংবা অপরাধ করলেও এনিয়ে তাদের ভিতরে কোন অনুশোচনা হয় না।
এই মনোবিজ্ঞানী কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে ইত্তেফাককে বলেন, সম্প্রতি রাজধানীর চামেলীবাগে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ছাত্রী ইয়াবা আসক্ত ঐশী তার পুলিশ ইন্সপেক্টর পিতা ও মাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। কারণ ইয়াবা খেতে খেতে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যে সেবনকারীর পুরো মানসিক পরিবর্তন ঘটে যায়। বিষণ্নতা চরম আকার ধারণ করে। ভিতর ভিতর চরম নিষ্ঠুরতার সৃষ্টি হয়। কোমলমতি মেধাবী ছাত্রী ঐশীর সেই পরিবর্তন ঘটায় সে তার পিতা-মাতাকে হত্যা করেছে।
জানা গেছে, সম্প্রতি সিলেটে নিজের মাকে হত্যাকারী এক তরুণকে কারা কর্তৃপক্ষ এই মনোরোগ বিজ্ঞানীর কাছে চিকিত্সার জন্য পাঠান। ওই তরুণকে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘কেন তোমার মাকে খুন করেছো?’ সে সহজ ভাষায় ও কোন ধরনের অনুশোচনা ছাড়াই বলে, মায়ের কাছে ইয়াবা কেনার জন্য টাকা চেয়েছিলাম। মা বললেন, তোকে আর কতো টাকা দিব, এখনতো বাবা আমার হাতে টাকা নেই। সঙ্গে সঙ্গে সে তার মাকে চুলে ধরে পাটার মধ্যে মাথা রেখে পুতা দিয়ে থেতলে হত্যা করে!
মোহিত কামাল বলেন, দেশকে রক্ষা করতে ইয়াবা প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা ব্যতীত আর কোন বিকল্প নেই। রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে ইয়াবা প্রতিরোধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান এ মনোরোগ বিজ্ঞানী। কারণ সমাজে ইয়াবার বিস্তার এভাবে চলতে থাকলে সমাজ জুড়ে খুন-খারাবিসহ জঘন্য অপরাধ আশংকাজনক হারে বেড়ে যাবে এবং শিক্ষিত তরুণ সমাজের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে।
প্রখ্যাত নিউরোলজিস্ট ও নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটের যুগ্ম-পরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম বলেন, ইয়াবা আসক্তদের ‘নার্ভ সিস্টেম’ পুরোটাই ‘ড্যামেজ’ করে ফেলে। তারা মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে থাকে। নিজেরা আত্মহত্যা করে এবং অন্যদের খুন করে।
চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এমএন হুদা বলেন, তার কাছে প্রতিদিন ১০ থেকে ২০ জন তরুণ ইয়াবা আসক্ত চিকিত্সার জন্য আসে। তারা ইয়াবা খাওয়ার পর জীবন বিপন্ন হওয়ার কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলে। ইয়াবা আসক্তদের অনেকেই স্থায়ীভাবে যৌন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তাদের চিকিত্সা দিয়ে তেমন কোন লাভ হয় না। তাদের মধ্যে নানা মানসিক পরিবর্তন ঘটে, ফলে তারা নিষ্ঠুর আচরণ করে বলে এই বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক জানান।
ভয়াবহ বিস্তার: রাজধানীর অলিগলি ছাড়াও গুলশান বনানীসহ অভিজাত এলাকায় দেদারসে ইয়াবা বেচাকেনা ও খাওয়া চলছে। ইয়াবা নেই রাজধানীতে এমন  কোন এলাকা নেই। রাজধানীর বাইরে জেলা ও উপজেলা শহর ছাড়াও প্রতিটি গ্রামে ইয়াবা বেচাকেনা চলছে। এটি গ্রামে ‘বাবা’ হিসাবে খ্যাত। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেছেন,  ইয়াবার ব্যবহার সমাজে এমন পর্যায়ে চলে গেছে যা অধিদফতরের একার পক্ষে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। যেখানে অধিদফতরের এক শ্রেণির কর্মকর্তা, পুলিশসহ নিয়ন্ত্রণকারী প্রশাসনের কর্মকর্তারা মাদক ব্যবসায় জড়িত এবং নিয়মিত ব্যবহারকারী, সেখানে ইয়াবা প্রতিরোধে ফলাফল শূন্যই হবে বলে ওই কর্মকর্তারা জানান। তারা ইয়াবা প্রতিরোধে সকল পেশার লোকজনকে এগিয়ে আসার এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর আহবান জানান।
৪২টি পয়েন্ট দিয়ে প্রবেশ করে ইয়াবা: মিয়ানমারে উত্পাদিত ইয়াবা ট্যাবলেট সীমান্তবর্তী কক্সবাজার জেলার অন্তত ৪২টি পয়েন্ট দিয়ে দেশে প্রবেশ করে। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরসহ বিভিন্ন প্রশাসন এ প্রবেশ পথগুলো  চিহ্নিত করেছে। পুলিশ  র্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার ও জড়িতদের গ্রেফতার করে। কিন্তু তারা আইনের ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে বের হয়ে পুনরায় ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। জানা গেছে, সর্বনাশা ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বেশিদিন আটকে রাখা যায় না। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা এ ব্যবসায় জড়িত। ব্যবসার টাকার ভাগ মাঠ থেকে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত যায়।
এদিকে হুন্ডির মাধ্যমে ইয়াবার টাকা লেনদেন হচ্ছে বলে জানা গেছে। হুন্ডির মাধ্যমে মিয়ানমারে এই টাকা পাচার করা হয়। প্রতি মাসে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা এভাবে মিয়ানমারে কোটি কোটি টাকা পাচার করছে। আবার অনেকে মেয়েদের নামে বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট খুলে টাকা লেনদেন করছে। এতে বেসরকারি ব্যাংক বেশি ব্যবহার হচ্ছে।
তালিকায় ৭৬৪ ইয়াবা ব্যবসায়ী: ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত রয়েছেন সাবেক ও বর্তমান এমপি, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশের অসাধু কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ। সম্প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বৃহত্তর চট্টগ্রামের ৭৬৪ জন ইয়াবা ব্যবসায়ীর নামের তালিকা যুক্ত করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য মতে, ওই তালিকায় এক এমপি ও তার চার ভাইসহ টেকনাফ পৌরসভার ২৫১ জনের নাম রয়েছে। এছাড়া ওই তালিকায় স্থান পেয়েছে মহেশখালী উপজেলার ৬ জন ও বান্দরবান জেলার ২৯ জনের নাম। একই সঙ্গে মিয়ানমারের উচ্চ পর্যায়ের ৩৬ ইয়াবা গডফাদারের নাম রয়েছে। আলাদা করে রয়েছে টেকনাফের আলোচিত ৭ প্রভাবশালী এবং ৭ পুলিশ কর্মকর্তার নাম। তবে টেকনাফ উপজেলার  আরো দুই শতাধিক ইয়াবা ব্যবসায়ীর নাম ওই তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেছে বলে জানা গেছে।
মূল হোতারা অধরা:বিজিবি, পুলিশ, কোস্টগার্ড, গোয়েন্দা পুলিশ, র্যাব, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে শুরু করে দেশের সকল আইন প্রযোগকারী সংস্থা ইয়াবা উদ্ধারে তত্পর থাকলেও এখনও অধরাই রয়ে গেছে তালিকাভুক্ত শীর্ষ ইয়াবা গডফাদাররা। টেকনাফসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মাসে লাখ লাখ ইয়াবা উদ্ধার হচ্ছে, মামলাও হচ্ছে। কিন্তু মূল হোতারা  গ্রেফতার হচ্ছে না। বিজিবির দাবি, তারা হাতেনাতে ইয়াবা পাচারকারী ও মূল হোতাদের ধরে মামলা দিয়ে থাকে। কিন্তু এ মামলার তদন্তভার থাকে পুলিশের হাতে। পুলিশ বেশির ভাগ মামলা থেকে এসব আসামিদের নাম বাদ দিয়ে দেয়। এতে তাদের করার কিছু থাকে না। এদিকে পুলিশের দাবি, মামলার এজাহারের দুর্বলতা  ও উপযুক্ত সাক্ষি-প্রমাণের অভাবে পুলিশ কাউকে অভিযুক্ত করতে পারে না। ফলে অনেক মামলার এজাহারে আসামি হিসেবে নাম থাকলেও চার্জশিটে নাম দেয়া যায় না। ফাইনাল রিপোর্টে তারা খালাস পেয়ে যায়।
ইয়াবা রোধে যৌথ অভিযান: গত ৩০ অক্টোবর সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠকে ইয়াবা রোধ করতে নাফ নদীতে দু’দেশের যৌথ অভিযান পরিচালনায় সম্মত হয়েছে ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ’ (বিজিবি) ও মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ‘বর্ডার গার্ড পুলিশ’ (বিজিপি)। মিয়ানমারের মংডু শহরে অনুষ্ঠিত ওই  পতাকা বৈঠক শেষে চট্টগ্রাম ফিরে এসে বিজিবি’র রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাবিবুল করিম সাংবাদিকদের জানান, বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে সুসমপর্ক জোরদার, সীমান্ত বাণিজ্য সমপ্রসারণ, ইয়াবা রোধে দু’দেশের যৌথ অভিযান পরিচালনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে কবে নাগাদ এই অভিযান পরিচালিত হবে সে ব্যাপারে তিনি কিছু জানাননি।