জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন আর নেই (ইন্নালিল্লাহি... রাজিউন)।
সোমবার দুপুর আড়াই’টার দিকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে (এনআইসিভিডি) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা গেছে, মাইনুল হোসেন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রবিবার হাসপাতালে ভর্তি হন। তার ডায়াবেটিস ছিল অনিয়ন্ত্রিত। রক্তচাপও ছিল খুব কম। হাসপাতালে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে তাকে চিকিৎসা দেয়া হলেও বাঁচানো যায়নি। বেলা আড়াইটার দিকে তিনি মারা যান।
জাতীয় স্মৃতিসৌধের এই নকশাকারের অকাল মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
তার মৃত্যুতে আরো শোক প্রকাশ করেন জাতীয় সংসদের স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, স্বাস্থ্য মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পীকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া, চীফ হুইপ আ স ম ফিরোজ ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক শোক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণে স্থপতি মইনুল হোসেনের অনন্য সাধারণ নকশায় নির্মিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ বাংলা এবং বাঙালি জাতির সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে চির ভাস্বর থাকবে। প্রধানমন্ত্রী মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন।
এই বরেণ্য শিল্পীর মৃত্যু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন শোক প্রকাশ করেছে।
লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা একুশে পদকপ্রাপ্ত এ স্থপতির জন্ম ১৯৫২ সালের ৫ মে মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ীর দামপাড়া গ্রামে। তার বাবা মুজিবুল হক ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে ইতিহাস পড়াতেন। স্থপতি মাঈনুল বেশ কিছুদিন যাবত অসুস্থ ছিলেন। তিনি সবার কাছে থেকে দূরে, অবসর জীবনযাপন করতেন।
জাতীয় স্মৃতিসৌধের এ স্থপতি ১৯৭০ সালে ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগে। থাকতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী হলে। ১৯৭৬ সালে তিনি প্রথম শ্রেণীতে স্থাপত্যবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। ওই বছরেরই এপ্রিলে ইএএইচ কনসালটেন্ট লিমিটেডে জুনিয়র স্থপতি হিসাবে যোগদান করেন। কয়েক মাস পর চাকরি ছেড়ে একই বছরের আগস্টে যোগ দেন ‘বাংলাদেশ কনসালট্যান্ট লিমিটেড’-এ।
১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ সরকারের গণপূর্ত বিভাগ মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ লাখ শহীদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এরপর নকশা আহ্বান করা হয়। তখন ২৬ বছরের তরুণ স্থপতি মাঈনুল ইসলাম স্মৃতিসৌধের নকশা জমা দেন। প্রায় ১৭-১৮ জন প্রতিযোগীর ৫৭টি নকশার মধ্যে তার প্রণীত নকশা গৃহীত হয় এবং তার করা নকশা অনুসারেই ঢাকার অদূরে সাভারে নির্মিত হয় জাতীয় স্মৃতিসৌধ।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে ঢাকা শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে নবীনগরে এই স্মৃতিসৌধ নির্মাণের ঘোষণা দেন।
মাঈনুলের করা স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণের সর্বমোট আয়তন ৮৪ একর। স্মৃতিস্তম্ভ পরিবেষ্টন করে রয়েছে ২৪ একর এলাকাব্যাপী বৃক্ষরাজিশোভিত একটি সবুজ বলয়। স্মৃতিসৌধটির উচ্চতা ১৫০ ফুট। সৌধটি সাত জোড়া ত্রিভুজাকৃতির দেয়াল নিয়ে গঠিত। দেয়ালগুলো ছোট থেকে ক্রমশঃ বড়ক্রমে সাজানো হয়েছে। এই সাত জোড়া দেয়াল বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাতটি ধারাবাহিক পর্যায়কে নির্দেশ করে। সেগুলো হচ্ছে- ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৬’র শাসনতন্ত্র আন্দোলন, ১৯৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬’র ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ এর গণ-অভ্যূত্থান এবং ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ। এই সাতটি ঘটনাকে স্বাধীনতা আন্দোলনের পরিক্রমা হিসাবে বিবেচনা করে সৌধটির নকশা তৈরি করেছেন স্থপতি এবং সে অনুযায়ী নির্মিত হয়েছে স্মৃতিসৌধ।
জাতীয় স্মৃতিসৌধ ছাড়াও এ শিল্পী ৩৮টি বড় বড় স্থাপনার নকশা করেন। এর মধ্যে আইআরডিপি ভবন কারওয়ানবাজার, ভোকেশনাল টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ও ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ভবন, চট্টগ্রাম ইপিজেড, বাংলাদেশ চামড়াজাত প্রযুক্তির কর্মশালা ভবন, উত্তরা মডেল টাউন, বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার খাদ্য গুদামের নকশা, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস ভবন উল্লেখযোগ্য।