শিক্ষা ক্যাডারে পদোন্নতিতে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন, ক্ষোভ

আপডেট : ১১ নভেম্বর ২০১৪, ২৩:৩৬

শিক্ষা ক্যাডারে পদোন্নতিতে আবারো জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষা প্রশাসন ও কলেজগুলোতে কনিষ্ঠদের অধীনে সহস্রাধিক জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে চাকরি করতে হচ্ছে। জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনও তৈরি করছেন কনিষ্ঠরা। এতে পদোন্নতি বঞ্চিত জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ ও হতাশা। যার প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের পাঠদানেও। তারা বলছেন, মনে কষ্ট নিয়ে আর যাই হোক শিক্ষার্থীদের নিজের সেরাটা দেয়া যায় না। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র এবং শিক্ষা ক্যাডারের একাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তা জানান, এই ক্যাডারের কর্মকর্তারা প্রতিনিয়ত পদোন্নতি জট, অর্জিত ও শ্রান্তি বিনোদন, সাপ্তাহিক ছুটি জটিলতা, আন্তঃক্যাডার বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলছে পদোন্নতি জট। দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি বঞ্চিত হওয়ায়, পদোন্নতিতে জ্যেষ্ঠতা লংঘন করায় এবং ছুটি জটিলতায় আর্থিক সুবিধা কমে যাওয়ায় শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

দীর্ঘদিন পর গত ১৩ অক্টোবর ৩৬৭ জনকে সহযোগী থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। ৭ম থেকে ১৩তম ব্যাচের অনেক শিক্ষককে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়া না হলেও ১৪ এবং ১৬তম ব্যাচের কয়েকটি বিভাগের শিক্ষকদের পদোন্নতি দেয়া হয়েছে।
গত ৮ নভেম্বর সহযোগী অধ্যাপক পদে ৬৪৩ এবং সহকারী অধ্যাপক পদে ১০৪৫ জন পদোন্নতি পেয়েছেন। সহযোগী অধ্যাপক পদে ২২তম ব্যাচে যোগদানকারী কয়েকটি বিষয়ের শিক্ষক পদোন্নতি পেলেও ১৪ থেকে ২১তম ব্যাচে যোগদানকারী বিপুল সংখ্যক শিক্ষক জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন। প্রভাষক হতে সহকারী অধ্যাপক পদে ২৪ ও ২৫তম ব্যাচের শিক্ষক-কর্মকর্তারা পদোন্নতি না পেলেও পেয়েছেন ২৬তম ব্যাচে যোগদানকারী কর্মকর্তারা।
আব্দুর রাজ্জাক মীর বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারে ১৯৮৫ সালে ৭ম ব্যাচে যোগদান করেছেন। তিনি ২০০১ সালে সহকারী অধ্যাপক ও ২০০৬ সালে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। কিন্তু এখনো অধ্যাপক হতে পারেননি ইসলামের ইতিহাসের এই শিক্ষক। অথচ একই বিষয়ের যারা ২০০৯ সালে সহযোগী অধ্যাপক হয়েছিলেন তারাও চলতি মাসে পদোন্নতি পেয়েছেন। আর অন্যান্য বিষয়ের ১৬তম ব্যাচের শিক্ষকরাও চলতি মাসে পদোন্নতি পেয়ে অধ্যাপক হয়েছেন। ৮ম ব্যাচে চাকরিতে যোগদান করেছেন অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক আবদুর রহমান। অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাননি তিনিও। এ রকম সহকারী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পর্যন্ত তিনটি পদে এক হাজারের বেশি শিক্ষক জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন এবং বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। কোন কোন কলেজে সহযোগী অধ্যাপকরা উপাধ্যক্ষ পদে আবার কোন কোন কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে তারা দায়িত্ব পালন করছেন। সেসব কলেজে তাদের আগে চাকরিতে যোগদানকারীরা কনিষ্ঠদের অধীনেই কাজ করছেন। নিয়মানুয়ায়ী ওই কনিষ্ঠ শিক্ষকই জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন তৈরি করছেন। এদিকে বিপুল সংখ্যক শিক্ষক পদোন্নতি না পেলেও কয়েকজন আবার তদবিরের মাধ্যমে দ্রুত পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়ে বোর্ডের চেয়ারম্যান-রেজিস্ট্রারের মত পদে বসার চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা কলেজের এক শিক্ষক বলেন, কনিষ্ঠ শিক্ষকের অধীনে কাজ করতে গিয়ে সব সময়ই অস্বস্তিতে থাকতে হয়। দুই পক্ষের জন্যই বিষয়টি বিব্রতকর। আবার জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের ঘটনায় শিক্ষকদের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শ্রেণীকক্ষে এবং শিক্ষা প্রশাসনে। এ অবস্থায় জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন পরিহার ও পদোন্নতি প্রদান জরুরি হয়ে পড়ছে বলে মন্তব্য করেন শিক্ষকরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিসিএস ক্যাডারে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সাধারণত ব্যাচ পদ্ধতি অনুসরণ করা হলেও শিক্ষা ক্যাডারে তা তেমন অনুসরণ করা হয় না। অনেক বছর ধরে এ ক্যাডারে ব্যাচের পরিবর্তে বিষয়ভিত্তিক পদোন্নতি দেয়া হয়। আর এ কারণেই পদোন্নতি জট এবং জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া যেসব কলেজ আত্তীকরণের মাধ্যমে সরকারি হয়েছে সেসব কলেজের শিক্ষকরা প্রমার্জনের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। অথচ যারা বিসিএস দিয়ে শিক্ষক হয়েছেন তারা এখনো কাঙ্খিত পদোন্নতি পাননি। এতেও দুই ধরনের শিক্ষকদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব চলছে।
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির মহাসচিব আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার বলেন, বিষয়ভিত্তিক পদোন্নতি হওয়ায় অনেক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক পদোন্নতি বঞ্চিত কিংবা বিলম্বিত পদোন্নতি পান। সরকারের নিয়ম ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতি আর সাম্প্রতিক রীতি দাঁড়িয়েছে বিষয়ভিত্তিক পদোন্নতি। এটি দূর করতে হবে। এটি সম্ভব না হলে সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। এ জন্য সরকারের অতিরিক্ত অর্থও খরচ করতে হবে না। এই দাবিতে আমরা অনেক আন্দোলন করেছি। তবে সাম্প্রতিক পদোন্নতির বিজ্ঞপ্তির ফলে জট কিছুটা কমেছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সার্ভিস রি-অর্গানাইজেশন অ্যান্ড কন্ডিশনস অ্যাক্ট, ১৯৭৫-এর ক্ষমতাবলে সরকার বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস রি-অর্গানাইজেশন অর্ডার ১৯৮০ জারির মাধ্যমে ক্যাডার সার্ভিস সৃষ্টি করেছে। ১৯৮৬ সালে ক্যাডার সার্ভিসগুলো আবার সংশোধন করা হয়। বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী বিসিএস সাধারণ শিক্ষা একটি একক ক্যাডার। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস নিয়োগ বিধি ১৯৮১ অনুসারে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক অন্যান্য ক্যাডারের মতো শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকরা নিয়োগ ও পদায়িত হয়ে থাকেন। সরকার ১৯৭৫ সালে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পদোন্নতির নীতিমালায় কলেজ শিক্ষকদের সহকারী অধ্যাপক পদ পর্যন্ত বিষয়ভিত্তিক পদোন্নতি প্রথা বন্ধ করে বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এমনকি প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের অনেক মামলায় পদ না থাকলে প্রয়োজনে সুপারনিউমারারি পদ সৃজনপূর্বক পদোন্নতি দেয়ার আদেশ দেয়া হয়েছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন বলেন, জ্যেষ্ঠদের আগে কনিষ্ঠদের পদোন্নতি দুঃখজনক। কিন্তু বিষয় এবং বিভাগের চাহিদা না থাকায় পরিস্থিতির কাঙ্খিত উন্নতি হচ্ছে না। এই সমস্যা নিরসনে চেষ্টা করে যাচ্ছি। গত এক মাসে সহকারী থেকে অধ্যাপক পদে প্রায় দুই হাজার শিক্ষক পদোন্নতি পেয়েছেন। এতে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। নতুন কিছু পদ সৃষ্টিরও প্রক্রিয়া চলছে। তাহলে সমস্যার অনেকটা সমাধান হবে।