জেএমবির সামরিক শাখার প্রধান, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া আসামি আতাউর রহমান সানির সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন বর্ধমান বিস্ফোরণ ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গে গ্রেফতার হওয়া শেখ রহমত উল্লাহ ওরফে মাসুদ ওরফে সাজিদ। নিজ এলাকা নারায়ণগঞ্জের ফরাজিকান্দার মানুষের কাছে তিনি পরিচিত মাসুদ হিসেবে। ২০০৫ সালে ১৭ আগস্ট দেশজুড়ে চালানো সিরিজ বোমা হামলায় সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন তিনি। এর আগে ১৯৯৭ সালে বোমা তৈরির সরঞ্জামসহ চট্টগ্রামে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিলেন। তখন খুব বেশিদিন তাকে জেলে থাকতে হয়নি। ২০০৭ সালে বগুড়ায় ডেটোনেটর ও বিপুল পরিমাণ বোমা বানানোর সরঞ্জামসহ ফের গ্রেফতার হন। এ সংক্রান্ত মামলায় পাঁচ বছর জেল খাটার পর ২০১২ সালের শেষ দিকে জামিনে ছাড়া পান। এসব তথ্য র্যাব-পুলিশ ও ফরাজিকান্দা এলাকার বাসিন্দাদের। সাজিদ ওরফে মাসুদের বাড়ির অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর শুধু বন্দর নয় সমগ্র নারায়ণগঞ্জে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
এ দিকে গত সোমবার রাতে র্যাব ফরাজিকান্দা এলাকা থেকে সাজিদের বড় ভাই ওয়েল্ডিং মিস্ত্রী মোনায়েম ওরফে মনোয়ার হোসেন ওরফে মনাকে গ্রেফতার করেছে। র্যাব সদর দফতরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
গত ২ অক্টোবর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান শহরের তিন কিলোমিটার দূরে খাগড়াগড়ে একটি দোতলা ভবনে বোমা বিস্ফোরণে দুইজন নিহত হয়। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের দাবি নিহত শাকিল আহমেদ ও সুবাহান মণ্ডল জেএমবির সদস্য। ভবনটিতে বোমা বানাতে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটে।
পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে দুই নারীকে গ্রেফতার করে। ভারতের গোয়েন্দাদের দাবি, এরা জেএমবির সঙ্গে যুক্ত এবং বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাড়ি জমিয়েছিল। বিস্ফোরণের পর তদন্ত করে ভারতীয় গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয় এ ঘটনার হোতা জঙ্গি সাজিদ।
চল্লিশ বছর বয়সী বাংলাদেশি নাগরিক সাজিদকে ধরতে ভারতীয় জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনআইএ) ১০ লাখ রুপি পুরস্কার ঘোষণা করে। পরে গত ৮ নভেম্বর কলকাতার দমদম বিমানবন্দর সংলগ্ন যশোর রোড থেকে গ্রেফতার হন সাজিদ। গত রবিবার তাকে পশ্চিমবঙ্গের আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে সে দেশের গোয়েন্দারা। আগামী ২০ নভেম্বর তাকে আবার আদালতে হাজির করার কথা। বাংলাদেশের দুই নেত্রীকে হত্যার ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে ভারতীয় গোয়েন্দারা যাদের নাম বলেছিল সাজিদ তাদের একজন।
কে এই সাজিদ
স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার ফরাজিকান্দা-মদনগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা মাসুদ রানা ওরফে মাসুদ ওরফে সাজিদ। পাঁচ ভাই ও চার বোনের মধ্যে সাজিদ সবার ছোট। তার বাবা সিদ্দিক মিয়া ওরফে পচা মিয়া বাওয়া জুট মিলের শ্রমিক ছিলেন। সাজিদের বয়স যখন দেড় বছর তখন পচা মিয়া মারা যান। এর কয়েক বছর পর সাজিদকে ভর্তি করা হয় ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকার একটি মাদ্রাসায়। সেখান থেকে সাজিদ দাখিল পাস করেন। এর পরপরই তিনি যুক্ত হন জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সঙ্গে। অদম্য সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে অল্প সময়েই সাজিদ শীর্ষ জঙ্গি শায়েখ আব্দুর রহমানের ছোট ভাই আতাউর রহমান সানির নজরে পড়েন। তাকে দেয়া হয় জেএমবির মজলিসে সুরার সদস্য পদ। ধীরে ধীরে বোমা প্রস্তুতকারী ও অস্ত্র প্রশিক্ষক হিসেবে জেএমবিতে শক্ত অবস্থান গড়ে তোলেন সাজিদ। এক পর্যায় আতাউর রহমান সানি তাকে তার সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসাবে নিযুক্ত করেন।
এরপর সাজিদ শুরু করেন দেশের প্রতিটি জেলায় ভ্রমণ। পরিদর্শন করেন জেএমবির বোমা প্রস্তুত ও অস্ত্র পরিচালনা ক্যাম্পগুলো। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা বিস্ফোরণ ঘটনায় সাজিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এলাকাবাসী জানায়, বিভিন্ন সময় সাজিদ তার নাম পরিবর্তন করলেও এলাকাবাসী জানায় তার প্রকৃত নাম মাসুদ। সাজিদ ভারতে গ্রেফতার হওয়ার পর বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এ বিষয়ে খোঁজ খবর নিতে শুরু করে।
এরপরই এলাকাবাসী জানতে পারে পশ্চিমবঙ্গে গ্রেফতার হওয়া সাজিদ তাদের এলাকার ছেলে মাসুদ। বর্তমানে মাসুদের বাড়ি অনেকটাই ফাঁকা। সেখানে রয়েছেন তার দুই বোন রোকেয়া ও শেফালী। কোন পুরুষ সদস্য বাড়িতে নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার একাধিক ব্যক্তি জানান, জুম্মন নামে সাজিদের এক ভাগ্নে বর্তমানে আফগানিস্তানে রয়েছে। সেও জঙ্গি তত্পরতার অভিযোগে বন্দর থানায় একবার গ্রেফতার হয়েছিলো। জামিনে ছাড়া পেয়ে জুম্মন আফগানিস্তানে চলে যায়। সাজিদের অপর বড় ভাই কাইয়ুম মিয়া পেশায় একজন বাবুর্চি, মেঝ ভাই বোরহান ওরফে হুমায়ুন মালয়েশিয়া প্রবাসী। তিনি তিন মাসের ছুটিতে দেশে অবস্থান করছেন। তার পরের ভাই মামুন পেশায় একজন শিক্ষক। বন্দর এলাকার হাজী আলম চাঁন উচ্চ বিদ্যালয়ে এক সময়ে শিক্ষকতা করতেন। মামুন নারায়ণগঞ্জ আইইটি সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। অপর ভাই মনা বন্দর এলাকায় একটি ওয়েল্ডিং দোকান দিয়ে মিস্ত্রির কাজ করছেন। কাইয়ুম ও মনা বর্তমানে ফরাজিকান্দা এলাকার পৈত্রিক বাড়িতে বসবাস করেন।
জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার ডা. খন্দকার মহিদউদ্দিন বলেন, তিনি সাজিদের সম্পর্কে কোন তথ্য জানেন না। গণমাধ্যমে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই কাজ করছেন তারা।
সাজিদের ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে র্যাব
গত সোমবার রাতেই ঢাকা থেকে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল সাজিদের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাদের দেয়া তথ্য মতে, ওই রাতেই র্যাবের একটি টিম মাসুদ ওরফে সাজিদের বড় ভাই মনোয়ার হোসেন ওরফে মনাকে গ্রেফতার করে। র্যাবের লিগ্যাল ও মিডিয়া উইংয়ের প্রধান মুফতি মাহমুদ খান জানান, ভাইয়ের জঙ্গি কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে মোনায়েমকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তবে গতকাল পর্যন্ত উল্ল্যেখযোগ্য কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।
