চলে গেলেন বরেণ্য শিক্ষাবিদ অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তচিন্তা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক। সারাজীবনের সাধনায় জাতিকে বনস্পতির মত ছায়া দিয়েছেন এই জ্ঞানতাপস। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে বিপুল অবদান রেখেছেন। খ্যাতনামা এই শিক্ষাবিদ মঙ্গলবার রাত পৌনে ১২ টার দিকে নগরীর বনানীর নিজ বাড়িতে ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহে....রাজেউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। তিনি স্ত্রী, তিন ছেলে, এক মেয়ে, আত্মীয়-স্বজন এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের বুদ্ধিজীবী মহলসহ সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর মরদেহ নগরীর শমরিতা হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। তার দুই ছেলে বিদেশ থেকে দেশে ফেরার পর মরদেহ দাফন করা হবে। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাঁকে বনানী কবরস্থান অথবা সাভারে দাফন করা হতে পারে। অধ্যাপক সিদ্দিকীর লাশ আজ সকাল ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে রাখা হবে। সেখানে ছাত্র-শিক্ষকগণ তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন। এখানে তার প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া একই দিন সকাল ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য তার মরদেহ রাখা হবে। বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
শোক:অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস, বিরোধী দলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া, চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তারা তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।
রাষ্ট্রপতি তার শোক বাণীতে বলেন, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক জিল্লুর রহমানের মৃত্যুতে জাতি একজন বরেণ্য শিক্ষাবিদকে হারাল। শিক্ষা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান জাতি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী একটি জ্ঞানভিত্তিক ও প্রগতিশীল সমাজ বিনির্মাণে আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। তার মৃত্যুতে দেশের শিক্ষা জগতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হলো তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
শোকবার্তায় মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, জ্ঞানতাপস অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর মত প্রগতিশীল এবং মুক্তচিন্তার মানুষ আমাদের সমাজে বিরল। তার কর্ম, ক্ষুরধার লেখনী ও সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।
সংক্ষিপ্ত জীবনী: অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ১৯২৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৫ সালে যশোর জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে ভর্তি হন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে। পরে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ ও এমএ ডিগ্রি নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন ঢাকা কলেজে। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে আসেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে পর পর দুই মেয়াদে ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত উপাচার্য ছিলেন। ১৯৯০-৯১ সালে দেশের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন খ্যাতনামা এই শিক্ষাবিদ।
সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় সপ্রতিভ বিচরণ ছিল জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর। অনুবাদ করেছেন ইংরেজি সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য অনেক বই। লিখেছেন প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী। পাঠকপ্রিয় হয়েছে তার কবিতাও। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- বাঙালির আত্মপরিচয়, শব্দের সীমানা, কোয়েস্ট ফর আ সিভিল সোসাইটি, দ্য কোয়েস্ট ফর ট্রুথ : সেক্যুলার ফিলোসফি বাই আরজ আলী মাতুব্বর, যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারে ছিলাম ইত্যাদি। এছাড়া বাংলা একাডেমির ইংরেজি থেকে বাংলা অভিধানের সম্পাদক ছিলেন তিনি।
জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ১৯৭৭ সালে আলাওল সাহিত্য পুরস্কার পান। দুই বছর পর ১৯৭৯ সালে পান বাংলা একাডেমি পুরস্কার। ২০১০ সালে এই জ্ঞানতাপসকে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়।
