ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহারের কারণে অস্তিত্ব হারাচ্ছে পদ্মা নদী। গত কয়েক দশকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অস্বাভাবিক নিচে নেমে গেছে। এর প্রভাবে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে মত্স্য, কৃষি, সেচ ও পরিবেশ। পদ্মার অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত পাড়ের বাসিন্দারা বাধ্য হচ্ছেন জীবিকা বদলে অন্য পেশায় যেতে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৬৮-১৯৬৯ সালে ভারত একতরফাভাবে ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণ করলেও নানা কারণে এটি চালু করতে সময় লেগে যায় প্রায় ছয় বছর। ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় ফারাক্কা ব্যারেজ। আর ফারাক্কা ব্যারেজ চালুর পর থেকেই পাল্টাতে থাকে পদ্মার স্বাভাবিক গতিপথ। ধীরে ধীরে মরতে থাকে পদ্মা। গত ৩৯ বছরে বিস্তৃত পদ্মা এখন ধুধু বালুচরের মাঝে ক্ষীণ পানির ধারার মতো কোনরকমে বেঁচে আছে। বছরের বেশিরভাগ সময়ই পদ্মা ও তার শাখা নদীগুলোতে পানি থাকে না।
পদ্মার ভয়াল রূপ বদলে মৃত পদ্মায় রূপান্তরিত হওয়ার পর থেকে বদলে যেতে থাকে মানুষের জীবন জীবিকা। পদ্মা নদীতে মাছ ধরে যেসব মানুষের জীবিকা নির্ভর করতো তাদের বেশিরভাগই এখন অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। আর যারা পদ্মাকে আঁঁকড়ে ধরে বেঁচে আছে তাদের অবস্থাও শোচনীয়। মত্স্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, প্রায় ৩০ বছর আগে রাজশাহীতে মত্স্যজীবীর সংখ্যা ছিল ৩৫ হাজার। বর্তমানে এ সংখ্যা কমে ৩ হাজারে নেমেছে। রাজশাহীতে যেসব চর আছে সেগুলোতে এক সময় শুধু জেলেরা বাস করলেও এখন জেলেদের সংখ্যা কমে ক্ষেত্রবিশেষে শূন্যের কোঠায় এসে দাঁড়িয়েছে। গোদাগাড়ীর পিরিজপুর এলাকায় অনেকেই পেশা পরিবর্তন করে পদ্মার তীরে জেগে ওঠা চরে চাষাবাদ করছে। অনেকে আবার অন্য পেশা বেছে নিয়েছে। চর আষাঢ়িয়াদহ ইউনিয়নের পূর্ব কানাপাড়া গ্রামের মাইনুল ইসলাম (৪২) বলেন, এক সময় ভরা পদ্মায় মাছ ধরাই ছিল আমার প্রধান পেশা। এখন নৌকার শ্যালো ইঞ্জিন দিয়ে মাঠে গভীর নলকূপ বসিয়ে কৃষকদের জমিতে পানি সরবরাহ করে কোনরকমে বেঁচে আছি।
নিচে নেমে গেছে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর
ফারাক্কা বাঁধের কারণে পদ্মা শুকিয়ে যাওয়ায় পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে নিচে নেমে গেছে। আর যার প্রভাব পড়েছে এ অঞ্চলের কৃষিতেও। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. গোলাম সাব্বির সাত্তার তাপু বলেন, ভূ-উপরিস্থ পানি সংরক্ষণ কমে যাওয়ায় এবং গভীর নলকূপের সাহায্যে নির্বিচারে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন এবং বৃষ্টিপাত একেবারেই কমে যাওয়ায় বরেন্দানে গড়ে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ১১৫ ফুট নিচে অবস্থান করছে। পানির স্তর যদি আর ৫ থেকে ১০ ফুট নিচে নেমে যায় তাহলে এ অঞ্চলের বেশিরভাগ গভীর নলকূপ অকেজো হয়ে পড়বে।