গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সরব প্রতিষ্ঠা এখন জরুরি

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০১৪, ১১:০০

এসময়ে দেশে উন্নয়নের চাকা সচল রয়েছে। জিডিপির অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। রেমিটেন্স বাড়ছে। বিদ্যুত্ ব্যবস্থায় লক্ষণীয় অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। কৃষি, শিক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে সরকার আন্তরিকতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তবুও সামাজিক-রাজনৈতিক জীবনে মানুষ খুব স্বস্তিতে আছে তা বলা যাবে না। দেশে খুন খারাবি আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সমপ্রতি পুলিশের দেয়া পরিসংখ্যানেই বলা হচ্ছে দৈনিক গড়ে প্রায় ১২টি খুনের ঘটনা ঘটছে। নারী ধর্ষণ ও লাঞ্ছনার ঘটনা বাড়ছে। এসব সূত্রে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রশাসনে, রাজনীতির অঙ্গনে ঘুষ দুর্নীতির প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার যন্ত্র চাইলেও যেন এসব সামাল দিতে পারছে না। আমাদের মনে হয় সব কিছুর পরও প্রায়োগিক ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অনুপস্থিতি নিয়ন্ত্রণের লাগাম হাতছাড়া করে দিচ্ছে।
এদেশের মানুষ সরকার ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক আচরণের প্রায়োগিক ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের পরিপূর্ণ প্রকাশ আশা করে। সাধারণ মানুষ চায় এদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মভূমিকায় গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ও আচরণ স্পষ্ট হোক। অমন পরিবেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে সঞ্চারিত হোক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি।
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্র আটকে আছে এদেশের রাজনৈতিক মঞ্চে ও বক্তৃতায়। রাজনৈতিক দলগুলো এত বেশি দলীয় গণ্ডিতে নিজেদের বন্দি করে ফেলেছে যে তা থেকে তাদের মুক্তি ঘটছে না। ফলে গণমানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে। এভাবে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পাওয়ায় সাধারণ মানুষ নায়ক হয়ে উঠতে পারছে না। ফলে গণমানুষের অধিকারের প্রশ্ন ক্রমে গুরুত্বহীন হয়ে যাচ্ছে।
স্বাধীনতার পর আশা করা গিয়েছিল গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি আমাদের রাজনীতিতে শক্ত ভিত্তি পেয়ে যাবে। মুক্ত পরিবেশে দেশাত্মবোধে তাড়িত এদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরিতে মেধা ও শক্তি প্রয়োগ করবেন। কিন্তু অঙ্কুরেই এই সম্ভাবনা তিরোহিত হতে থাকে। দলীয় কারণে রক্ষণশীল চিন্তা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। এর সাথে যুক্ত হয় মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তির ষড়যন্ত্র। রাজনৈতিক উত্থান পতন গণতন্ত্র বিকাশের পথকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে থাকে। এদেশের রাজনীতিতে পোড়খাওয়া রাজনীতিকদের শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি। দেশাত্মবোধে উজ্জীবিত রাজনীতিকদের বদলে সুবিধাবাদী রাজনীতিক এবং বণিক আমলাদের হাতে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ চলে আসতে থাকে। আমাদের দেশের রাজনীতি অনেকাংশে রাজনীতিচর্চাহীন মানুষদের হাতে চলে আসায় সুবিধাবাদ প্রচণ্ড রূপ নিচ্ছে এবং এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গণতন্ত্র।
গণতন্ত্র শক্তিশালী না হলে স্বাভাবিকভাবেই  জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে উঠবে না। ফলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথ সংকীর্ণ হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। এ অবস্থায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব কারণেই সম্ভবত রাজনীতির ময়দান ছাড়াও নৈরাজ্যিক অবস্থা লক্ষ্য করা যাচ্ছে নাগরিক সমাজের সর্বত্র। অবক্ষয় ঘটছে নৈতিকতার। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সচেতন নাগরিক সমাজের অনেকে বিভ্রান্তি এড়াতে পারছেন না। আমাদের শক্তিশালী গণমাধ্যম যেখানে মানুষকে ঐতিহ্য সচেতন করে সুন্দর ভবিষ্যত্ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারে সেখানে মিডিয়া অনেক ক্ষেত্রেই যেন লক্ষ্য স্থির করতে পারছে না। আমাদের ধারণা এর মুখ্য কারণ হচ্ছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যবোধ বিচ্ছিন্ন থাকা।
এদেশের রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের সময় এবং বক্তৃতার মঞ্চে জনগণের শক্তির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন। আবার নিজেদের সুদিনে বিস্মৃত হন জনগণের ক্ষমতার কথা। এই বিস্মৃতি দলগুলোর দলীয় লাভ কতটা এনে দেয় জানি না তবে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের ইতিহাস বর্তমানের মত বিবর্ণ ছিল না কখনো।
মধ্যযুগের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে চৌদ্দ ও পনের শতকে সুলতানরা জনগণের শক্তিকে অস্ত্র শক্তির চেয়ে বড় মনে করতেন। চৌদ্দ শতকের মাঝামাঝি দিল্লির সুলতানদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করে স্বাধীন সুলতানি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাংলায় নিয়োজিত গভর্নররা। দিল্লির আক্রমণ থেকে নিজ স্বাধীনতা রক্ষায় তাঁরা বাংলার হিন্দু এবং নবদীক্ষিত মুসলমান প্রজা সাধারণের সমর্থনকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাই প্রজার মনোরঞ্জনের দিকে তাদের দৃষ্টি ছিল। একারণে সে যুগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সুশাসন। আর এর ফল হিসেবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক সমৃদ্ধি ঘটে। সুলতানদের রাজ দায়িত্ব পালনে জনকল্যাণ মুখ্য হওয়ায় বিচার ব্যবস্থাকে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করার দরকার হয়নি। নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার ব্যবস্থাকে আলাদা করতে কিছুমাত্র দ্বিধান্বিত হননি সুলতানরা। কাজী তার আদালতে সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকতে পেরেছিলেন। যে কারণে সোনারগাঁওয়ে পনের শতকের শুরুতে কাজীর বিচারের গৌরবময় কাহিনীর জন্ম হতে পেরেছিল। সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ এবং কাজী সিরাজউদ্দিন ইতিহাসকে উজ্জ্বল করেছিলেন। কিন্তু এ যুগে আমরা দায়িত্বশীলরা ইতিহাস-ঐতিহ্য বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রজন্মকে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখাতে পারছি না।
ঐতিহ্য বিচ্ছিন্ন থাকছি বলেই বোধকরি আমাদের মধ্যে একদিকে মননশীল রাজনীতির বিকাশ ঘটতে পারছে না। অন্যদিকে আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারছি না সামাজিক দায়বদ্ধতা। এক ধরনের অশিক্ষা আর সুবিধাবাদ আমাদের রাজনীতিকে গ্রাস করছে বলে তার বিরূপ প্রভাব অন্য সকল অঞ্চলকে সংক্রমিত করছে। দলীয় রাজনীতি সংশ্লিষ্ট বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, ছাত্র ও স্থানীয় নেতাকর্মী কেউ মুক্তচিন্তার জগতে বাস করতে পারছি না বলে এসব বদ্ধবুদ্ধির কুপ্রভাব সামাজিক নৈতিকতার জায়গাটিকে ভেঙে খণ্ড-বিখণ্ড করে দিচ্ছে। মানুষের দেশাত্মবোধ ও দেশপ্রেমের জায়গাটি ক্রমে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এতে গণমানুষের মধ্যে বাড়ছে বিভ্রান্তি। সামাজিক নিরাপত্তার জায়গাটি হুমকির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।
খ্রিষ্টপূর্ব পাঁচ শতকে এথেন্সে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল অভিজাততন্ত্রের হাত থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্তি দিতে। সলোন, পিসিস্ট্রেটস, পেরিক্লিস প্রমুখ রাজনীতিক ধাপে ধাপে গণমানুষের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করেছিলেন। এরপরই এথেন্সের সার্বিক অগ্রগতি ঘটে। পূর্ণ বিকাশ ঘটে হেলেনীয় সংস্কৃতির। পাশাপাশি নগররাষ্ট্র স্পার্টা সামরিকতন্ত্রের বেড়াজালে বন্দি হয়ে পড়ে। তাই আটকে যায় অগ্রগতির সকল দরোজা। গণতন্ত্রের এই শক্তিকে যে সকল দেশ এবং দেশ পরিচালকরা অনুভব করেছেন—গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ঐকান্তিক হয়েছেন সেসব দেশের অগ্রগতির চাকা থেমে যায়নি।
রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসা যাওয়া করা দলগুলোর অমন ঝগড়ায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে আমাদের দেশের রাজনীতি। দলীয় মুখপাত্রগণ দলীয় সভায় বা জনসভায় যা বলেন তা না হয় আমরা গত্বাধা বুলি হিসেবে মার্জনা করি বা কৌতুক অনুভব করি। কিন্তু মান্যবররা যখন মিডিয়ার সামনে চোখ বন্ধ করে উন্নয়নের ফিরিস্তি দেন অথবা একটি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আড়মোড়া না ভাঙতেই বা জনবিক্ষোভ সৃষ্টি হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি না হতেই সরকার পতনের আন্দোলনের ডাক দেন তখন বোঝা যায় সাধারণ মানুষের বোধবুদ্ধি বা চিন্তাকে তারা কতটা অবমূল্যায়ন করেন।
গণতন্ত্রী বলে দাবিদার দলগুলোর নেতা নেত্রীগণ আধিপত্যবাদী রাজনীতি থেকে বেরুতে পারলেন না। অহরহ জনগণের নামে জনগণের ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছেন নিজেদের সিদ্ধান্ত। কোনো দলই দলীয় সুবিধাবাদ থেকে বেরিয়ে এসে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারছে না। গণতান্ত্রিক জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা নির্বাচনে তাই মুক্ত মনের ভোটার অনেক ক্ষেত্রে জনদরদী রাজনীতিককে না পেয়ে প্রায়শ মন্দের ভালোকে একান্ত বাধ্য হয়েই ভোট দিয়ে থাকেন। মন্দের ভালো ভালো হতে পারে না। ফলে এদের মধ্যে শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রকাশ লক্ষ্য করা যায় না। দলীয় অন্ধত্ব ও সুবিধাবাদ স্পষ্ট হতে থাকে। নির্বাচন ও দল পরিচালনায় ব্যবসায়ী এবং আমলাদের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। ফলে ভবিষ্যতে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতিভ্রষ্টতা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাড়তে থাকে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক নৈরাজ্যের পথ এভাবে হতে থাকে প্রশস্ত। এর বিরূপ প্রভাব রাষ্ট্রের সর্বত্র প্রতি ফলিত হয়।
এদেশের রাজনীতিকগণ যদি দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে একবার ঘুরে দাঁড়াতে পারতেন, সংকীর্ণ দলীয় সুবিধাবাদ থেকে বেরুতে পারতেন, ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে নিজেদের যুক্ত করতে পারতেন তবে দেশে গণতান্ত্রিক শক্তি জায়গা করে নিতে পারতো। দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতৃত্ব এ মুহূর্তে যদি দলপ্রীতির সাথে সাথে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হতে পারতেন তবে সম্ভব হতো ভবিষ্যতের নীতি নির্ধারণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা।
আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো যদি প্রকৃত রাজনীতিকদের হাতে রাজনীতি ছেড়ে দিতে পারতো এবং সংকীর্ণ সুবিধাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বেরিয়ে এসে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ার পথ তৈরি করতে পারতো তবে গণতন্ত্র পারতো জবাবদিহিতার পথ নির্মাণ করতে। আর এর সূত্র ধরেই আইনের শাসন  প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পথ প্রশস্ত হতো। বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়তো। অসুস্থ ও নীতিহীন রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মিথ্যা মামলা দায়ের করতে হতো না। আবার সেই মামলা খারিজ করার জন্য আদালতের দ্বারস্থ না হয়ে ক্ষমতাসীনরাই বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে মামলা বাতিল করে দিতেন না।
এ সকল আচরণই হচ্ছে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিরোধী। সার্বিক সুস্থতার জন্য তাই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সরব প্রতিষ্ঠা জরুরি। আমরা আশা করবো আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো সবার আগে নিজেদের পরিশুদ্ধ করে রাজনীতিকে প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক করে তুলবেন। রাজনৈতিক অঙ্গন যাতে দুর্নীতিবাজের অভয়ারণ্য হয়ে না পড়ে, রাজনীতিকগণ যাতে কথার ফুলঝুরিতে দেশের মানুষ, অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে মিথ্যার বেসাতি করতে না পারেন, দেশ ও রাজনীতির পরিচালকরা  যাতে দেশের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যচর্চা বিচ্ছিন্ন না হয়ে যান সে ব্যাপারে সতর্ক অবস্থান ও নীতি নির্ধারণ করবেন। রাজনীতি-অন্ধ সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবী সমপ্রদায় যদি ক্ষুদ্র স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে যার যার সমর্থিত দলকে সুপথ দেখাতে পারেন তবেই তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালিত হবে। এদেশের লাঞ্ছিত বিধ্বস্ত মানুষ সে দিনেরই অপেক্ষা করছে।
n লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]