ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বর্ধমান জেলার খাগড়াগড়ে সাম্প্রতিক বিস্ফোরণের ঘটনায় গ্রেফতারকৃত জেএমবির সেকেন্ড ইন কমান্ড সাজিদ ওরফে মাসুদ রানা ওরফে মাসুমের পরিবারের প্রায় সকলেই কোন না কোন ভাবে জঙ্গি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। এছাড়া সে নারায়ণগঞ্জসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ জেলাগুলোতে বোমা বিশেষজ্ঞ বাহিনী গড়ে তুলেছিল বলে একাধিক গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে সাজিদের ভাই মনাকে বন্দর থানা পুলিশ গতকাল শুক্রবার দ্বিতীয় দফায় দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তবে সে এখনো পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোন তথ্য দেয়নি। মনাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গঠিত বিশেষ টিম সূত্রে জানা গেছে, সাজিদসহ মনার পাঁচ ভাই ও পাঁচ বোন জেএমবির কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত। বর্ধমানে বোমা বিস্ফোরণে দুইজন নিহত হওয়ার পর গ্রেফতারের আগে সাজিদ একাধিকবার টেলিফোনে মনার সাথে কথা বলেছে। এ ব্যাপারে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিশ্চিত হয়েছে।
অন্যদিকে সাজিদের অন্যতম সহযোগী জেএমবি সদস্য জাফর আহাম্মেদকে (২৮) গত বুধবার রাতে বন্দর থানা পুলিশ গ্রেফতার করে। এ সময় জাফর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে চিকিত্সার জন্য নারায়ণগঞ্জ ৩শ’ শয্যার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পুলিশ তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। বৃহস্পতিবার আদা-লতের মাধ্যমে তাকে দুই দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বন্দর থানার ওসি নজরুল ইসলাম।
একাধিক গোয়েন্দা সূত্রের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, ভারতে গ্রেফতারকৃত সাজিদের একাধিক সহচর নারায়ণগঞ্জ শহর, বন্দর, ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, আড়াইহাজার ও সোনারগাঁয়ে রয়েছে। গ্রেফতারের পর সাজিদ নিজেকে শেখ রহমতউল্লাহ ওরফে সাজিদ পরিচয় দিলেও নারায়ণগঞ্জের বন্দরের ফরাজীকান্দা এলাকায় তার পরিচিত লোকজন জানান, সাজিদের প্রকৃত নাম মাসুদ রানা ওরফে মাসুম। পুলিশ সুপার খন্দকার মহিদউদ্দিন জানান, সাজিদের পরিবারের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করে কিছু না বললেও পরিবারের সঙ্গে যে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল এ সম্পর্কে কিছুটা নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে পুরো ঘটনা উদঘাটনে সময় লাগবে।
জানা গেছে, সাজিদের মালয়েশিয়া প্রবাসী ভাই রহমতউল্লাহ জেএমবির সাথে সংশ্লিষ্ট। এছাড়া তার এক ভাগ্নে জুম্মন বর্তমানে আফগানিস্তানে জঙ্গি তত্পরতায় জড়িত। সাজিদ বড় ভাই রহমতউল্লাহকে বাঁচানোর জন্যই মূলত নিজের নাম রহমতউল্লাহ বলে। জিজ্ঞাসাবাদে মনা স্বীকার করেছে, সাজিদ তার ভাই তবে তার নাম সাজিদ নয়। সাজিদের প্রকৃত নাম মাসুদ রানা ওরফে মাসুম। তবে মনা পুলিশের কাছে মুখ খুলছে না। সে বলছে, দীর্ঘদিন যাবত্ মাসুমের সাথে তাদের যোগাযোগ নেই। তবে এলাকাবাসী জানান, সাজিদ ওরফে মাসুম এলাকায় না আসলেও তার অন্য ভাইয়েরা প্রায়ই বাড়িতে আসত। মাঝে মধ্যেই বাড়িতে অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা থাকত। সাজিদ তেমন কোন ব্যবসা-বাণিজ্য না করলেও তার মতাদর্শে বিশ্বাসীদের সে নিয়মিত মাসোয়ারা দিত বলে জানা গেছে। এছাড়া সাজিদের সাথে নারায়ণগঞ্জের একাধিক পেশার লোকজনের গোপন যোগাযোগ ছিল বলেও সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। জেলার কতিপয় শিল্পপতির দেয়া আর্থিক সহায়তা জেএমবির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ব্যয় হতো। জামায়াতের কট্টরপন্থি কয়েকজন নেতা স্থানীয় কিছু নামধারী সংবাদকর্মীকে ব্যবহার করে প্রশাসনের গতিবিধি এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক তথ্য সংগ্রহ করে তা জামায়াতের মাধ্যমে জেএমবির কাছে পাচার করত। এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় জামায়াতের একাধিক পৃষ্ঠপোষকের বিরুদ্ধে মামলা হলেও রহস্যজনক কারণে সে মামলার তদন্ত আটকে আছে। প্রশাসন এ ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করে নি।
প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে হত্যার পরিকল্পনাকারী জেএমবি নেতা সাজিদকে গত শনিবার ভারতের দমদম এলাকা থেকে গ্রেফতার করে ভারতীয় পুলিশ। এর আগে ২০০৭ সালে পিস্তল, বোমা তৈরির সরঞ্জাম ও জিহাদি বইসহ সে চট্টগ্রাম পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছিল। ওই মামলায় জামিন নিয়ে সে পলাতক থাকে। সাজিদ জেলার বন্দর থানার ফরাজীকান্দা এলাকার আজিজুল হক মিয়ার ছেলে। তবে ভাই মনা গ্রেফতার হওয়ার পর তাদের বাড়ির সকলে গা ঢাকা দিয়েছে।