ভারতের জঙ্গি দমনে ঢাকার অবদানকে গুরুত্ব দিতে হবে

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০১৪, ০৯:৪৮

বাংলাদেশ এবং ভারত সম্পর্ক ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রবাহে খুবই ঘনিষ্ঠ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলনে ভারতের বিশাল ভূমিকা ছিলো। তেমনি ভারতের জঙ্গি ও সন্ত্রাস দমন এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে বাংলাদেশের অবদানও কম নয়।  দুই দেশের মধ্যেকার এই ঐতিহাসিক সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে হলে ঝুলে থাকা অমীমাংসিত ইস্যুগুলো নিষ্পত্তি করতে হবে। আস্থা ও আ্ত্তবিশ্বাস তৈরির সাথে সাথে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে। গতকাল শুক্রবার ঢাকায় প্রথমবারের মতো ভারত-বাংলাদেশ হাই কমিশনার সম্মেলনে এ কথা বলা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘ভারত-বাংলাদেশ হাই কমিশনার সম্মেলন’ শীর্ষক দু’দিনব্যাপী সম্মেলনের প্রথম দিনে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও পৃথক তিনটি অধিবেশনে বক্তারা এই মনোভাব তুলে ধরেন।
ভারত বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের   সহযোগিতায় সম্মেলনের আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ। এতে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের এবং ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক ১৩ জন হাই কমিশনার ও ৩ জন ডেপুটি হাই কমিশনার অংশগ্রহণ করেন। আজ শনিবার অংশগ্রহণকারীদের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ সংবলিত ‘ঢাকা ঘোষণা’ করা হবে।
সম্মেলনে সাবেক ও বর্তমান কূটনীতিকরা বলেন, ভারত একটি বড় অর্থনীতির দেশ হিসেবে বেড়ে উঠছে। বাংলাদেশও অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতিতে দারুণ সাফল্য দেখিয়েছে। পারষ্পরিক স্বার্থ রক্ষা ও সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা গেলে উভয় দেশ সমানভাবে লাভবান হবে। সম্প্রতি জলসীমা নিয়ে দুই দেশের বিরোধ মিটেছে। কিন্তু এই বিশাল জলসীমার সম্পদের সঠিক ব্যবহারের জন্য সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে হবে।
তারা বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক অনেক চড়াই-উত্ড়াই পেরিয়ে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে পৌছেছে। এখন  ভারতের পক্ষ থেকে তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি সই, স্থল সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন, ছিটমহল বিনিময় সংক্রান্ত ইস্যুগুলো দ্রুত নিষ্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধ এবং ভারতের বিরুদ্ধে তত্পর বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া জঙ্গী ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কেননা অমীমাংসিত ইস্যুগুলো দুই দেশের জনগণের মধ্যে অনাস্থা ও সন্দেহ তৈরি করছে। যার ফলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অনেক ইতিবাচক দিকগুলো জনগণের কাছে গুরুত্ব হারাচ্ছে।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় পররাষ্ট্র মন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সবসময়ই ওঠানামা করেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এটা এমন একটা পর্যায়ে পৌছেছে যে, এখন তা শুধু উপরেই উঠতে পারে। বিজেপি সরকারে আসার পরও ভারতের সঙ্গে সেই সম্পর্ক বজায় রয়েছে। দু’দেশের সম্পর্ক সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিবেশী দেশের মধ্যে অমীমাংসিত ইস্যু থাকে, বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যেও রয়েছে। এগুলো অমীমাংসাযোগ্য নয়।
সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, সন্ত্রাস, গোঁড়ামী ও দারিদ্রের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ও ভারত এক সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছে। দুই প্রতিবেশী দেশ ও এ অঞ্চলের নানা অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানে প্রাক্তন হাই কমিশনাররা গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা দিতে পারেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সম্মেলনের প্রকল্প সমন্বয়ক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ এবং বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক আশেকা ইরশাদ বক্তব্য রাখেন। এরপর পর্যায়ক্রমে ‘অতীতের পাঠ’,‘সাম্প্রতিক সময়ের চ্যালেঞ্জ ও বাধা’ এবং ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ও এর ভবিষ্যত্’ শিরোনামে তিনটি পৃথক পর্বে আলোচনার আয়োজন করা হয়।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ভারতের সাবেক হাই কমিশনার আইএস চাধা বলেন, ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের তিনটি দিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হচ্ছে- রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং জাতীয় ঐকমত্য। সম্পর্ক উন্নয়নে এগুলোর অভাব অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। একাত্তর পরবর্তী উভয় দেশের মধ্যে যে পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল, তার গতিধারা রক্ষায় ব্যর্থতার দায় উভয় দেশেরই। তবে বর্তমানে সম্পর্ক অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো। এই সম্পর্ক উন্নয়নে ভারতের দায়িত্ব বেশি। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি সই ও স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভারতের এগিয়ে আসা দরকার।
ভারতের সাবেক হাই কমিশনার মুচকুন্দ দুবে বলেন, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক বর্তমানে ভালো অবস্থায় রয়েছে। দু’দেশেরই অভিন্ন বিষয় হিসেবে নিরাপত্তা ইস্যু অন্যতম। এছাড়া বাণিজ্যিক বিনিময় ও সহযোগিতার বিষয়ে দু’দেশের সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এসেছে। প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সার্ক এখন পর্যন্ত ভালো ভূমিকা রাখতে পারেনি। এ জন্য ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার বৈরি সম্পর্কের দায় রয়েছে।
বাংলাদেশের সাবেক হাই কমিশনার ফারুক আহমেদ চৌধুরী বলেন, অভিন্ন ইস্যুতে দু’দেশকেই পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে। উভয় দেশেই শক্তিশালী সুশীল সমাজ রয়েছে। দু’দেশের মধ্যকার স্থিতিশীল সম্পর্কের ক্ষেত্রে সুশীল সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
বাংলাদেশের আরেক কূটনীতিক ফারুক সোবহান দুই দেশের পাশাপাশি আঞ্চলিক সংযোগ (কানেকটিভিটি) স্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতামূলক সম্পর্কের ভিত্তিতে কাজ করতে পারি। এই সংযোগ পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার বা আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মধ্যেও  হতে পারে। তিনি বলেন, ভারত-বাংলাদেশে সরকার পর্যায়ের সম্পর্কের পাশাপাশি জনগণ পর্যায়ে যোগাযোগ স্থাপন ও আস্থার সৃষ্টি করতে হবে। পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বর্তমান বিশ্বে জন-কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
১৯৯৫ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ভারতের হাই কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী দেব মুখার্জি বলেন, বাংলাদেশ ভারতের কাছে সাম্প্রতিক সময়ে একটি অনুকূল ও বন্ধুপ্রতিম দেশ হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। বৃহত্তর সম্পর্কের জন্য আমাদের উভয়েরই অসংখ্য ইস্যুর মধ্যে ইতিবাচক দিকে তাকানো উচিত।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাই কমিশনার বীণা সিক্রি বলেন, ভারতে বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেল না দেখানোর বিষয়টা অনেকটা মিথের (পুরাণের গল্প) পর্যায়ে চলে গেছে। এ ব্যাপারে অবশ্যই সরকারিভাবে কোনো বাধা নেই। চ্যানেল সম্প্রচারের বিষয়ে বাংলাদেশের কারো কারো মধ্যে ‘পাকিস্তানি মানসিকতা’ রয়ে গেছে। তিনি বলেন, দোষারোপের খেলা ভুলে গিয়ে দু্ই দেশের পরস্পরকে উন্নয়নের জন্য কাজ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব হেমায়েতউদ্দিন বলেন, বাস্তবতা হচ্ছে ভারতে বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেল তেমন একটা দেখা যায় না। কিন্তু বাংলাদেশে ভারতের সবধরনের চ্যানেলই দেখা যায়। তিনি বলেন, পাকিস্তানি মানসিকতা নয়, বরং বাণিজ্যিক কারণে হিন্দি ছবি এদেশে উন্মুক্তভাবে প্রদর্শন করা হয় না।
১৯৯৫-১৯৯৯ মেয়াদে ভারতে বাংলাদেশের হাই কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব সিএম শফি সামী বলেন, দু’দেশের মধ্যে যেসব চুক্তি হয়েছে সেগুলোর বাস্তবায়নে বেদনাদায়ক ও ধীর অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য বিশেষ করে অভিন্ন নদীর পানির সুষম বণ্টন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ভারতে ডেপুটি হাই কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী সাবেক পররাষ্ট্র সচিব হুমায়ূন কবির বলেন, বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক কূটনৈতিক দিক থেকে পৃথিবীর জন্য দৃষ্টান্ত হতে পারতো। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়ে গেছে। সীমান্তে গোলাগুলির ঘটনা মানুষ ইতিবাচকভাবে নেয় না।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের বর্তমান হাই কমিশনার পঙ্কজ শরণ বলেন, ভারত শুধু সরকারের সাথে নয়, বাংলাদেশের জনগণের সাথে ভারতের জনগণের যোগাযোগকেও গুরুত্ব দেয়। অমীমাংসিত ইস্যু কয়েকটি রয়েছে। তবে এগুলোর মীমাংসায় ভারত আন্তরিকতার সাথে চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ শিগগিরই এর প্রমাণ পাবে।
সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক হাই কমিশনার তৌহিদ হোসেন, ডেপুটি হাই কমিশনার হারুন-উর রশীদ, সাবেক হাই কমিশনার তারিক এ করিম এবং ভারতের সাবেক হাই কমিশনার পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী, রাজিত মিত্তার। এছাড়া সম্মেলনে দুই দেশের কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত ছিলেন।
আজ ঢাকা ঘোষণা
সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী সাবেক ও বর্তমান হাই কমিশনার ও ডেপুটি হাই কমিশনাররা আজ সকালে নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে এক বৈঠকে মিলিত হবেন। দুপুর ১২টায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে তারা নিজেদের পর্যবেক্ষণ এবং সুপারিশ সংবলিত ‘ঢাকা ঘোষণা’ করবেন।