বিমানে একটি সংঘবদ্ধ চোরাচালান সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন যাবত্ সক্রিয়। জাতীয় পতাকাবাহী এই প্রতিষ্ঠানের এক শ্রেণীর কেবিন ক্রু এই সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত। দীর্ঘদিন যাবত্ তাদের সোনা চোরাচালানের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। জানা গেছে, গত এক দশকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্তত ১৫ জন কেবিন ক্রু চোরাচালানকৃত স্বর্ণসহ আটক হয়েছেন। আবার অনেকে মদ, বিয়ার, সিগারেট এবং বিভিন্ন নিষিদ্ধ পণ্যসহ আটক হন। শুধু ঢাকা নয় লন্ডনের হিথ্রো বিমান বন্দরেও বিমানের এক জুনিয়র পার্সার সম্প্রতি বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ সিগারেটসহ ব্রিটিশ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন।
সর্বশেষ গত বুধবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুই কেজির বেশি সোনাসহ আটক হয়েছেন বিমানের স্টুয়ার্ড মাজহারুল আফসার রাসেল। ওইদিন দুবাই থেকে ঢাকাগামী বিমানের বিজি ০৪৬ নম্বর ফ্লাইটে তিনি স্টুয়ার্ডের দায়িত্ব পালন করেন। ফ্লাইটটি ঢাকায় অবতরণের পর তিনি উড়োজাহাজ থেকে নেমে গ্রীন চ্যানেল অতিক্রম করছিলেন। এ সময় তার গতিবিধি সন্দেহজনক হওয়ায় শুল্ক গোয়েন্দারা তাকে আটক করেন। পরে তার শরীর তল্লাশি করে উরুর সঙ্গে স্কচটেপ দিয়ে প্যাঁচানো দুই কেজি দশ তোলা ওজনের সোনার বার পাওয়া যায়। এছাড়া তার হ্যান্ড লাগেজ থেকে ৬টি আই প্যাড উদ্ধার করা হয়। শুল্ক গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ তাকে বিমান বন্দর থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। এরপর বিমান কর্তৃপক্ষ তাকে চাকরি থেকে সাসপেন্ড করে।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন এয়ারলাইন্সকে ব্যবহার করে চোরাকারবারিদের সংঘবদ্ধ এই চক্রে জড়িয়ে পড়েছেন বিমানের ক্রুরা। ইতিমধ্যে অভিযুক্ত কয়েকজন ক্রু’র বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে। আবার অনেকের বিরুদ্ধে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তবে যারাই এসব চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ দেখানো হবে বলে জানিয়েছে বিমান কর্তৃপক্ষ।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চোরাচালানিদের কাছে সবচেয়ে দামি রুট হচ্ছে দুবাই, জেদ্দা, রিয়াদ, দাম্মাম ও কুয়েত। মধ্যপ্রাচ্যের এসব রুটে বিমান নিজস্ব উড়োজাহাজ দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করে। বিমানের সিডিউলিং, অপারেশন ও ট্রেনিং শাখার কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাও এই চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। তারা মোটা অংকের টাকা নিয়ে সংশ্লিষ্ট ফ্লাইটে কেবিন ক্রুদের ডিউটি দিচ্ছে। কেবিন ক্রুরা মূলত চোরাই পণ্যের বাহক হিসেবে ব্যবহূত হয়ে থাকেন। কেবিন ক্রুদের অধিকাংশই বিমানে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত। জানা গেছে, চোরাই সিন্ডিকেটের কাছে ক্রু বিক্রির জন্যই মূলত সংশ্লিষ্ট বিভাগ ক্রু সিডিউলিং অটোমেশন করছে না। কাজটি তারা এখনও ম্যানুয়েলি করছেন। অথচ এ কাজের জন্য ২০ কোটি টাকায় অত্যাধুনিক মেশিন কেনা হয়েছে। এটা চালু হলে সিন্ডিকেট ভেঙে যাবে এ আশংকায় অটোমেশন চালু হচ্ছে না।
বিমানের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশগামী নির্দিষ্ট ফ্লাইটে মোটা অর্থের বিনিময়ে ওইসব ক্রুর ডিউটি দেয়া হয়। যারা চোরাচালানিদের হয়ে কাজ করে। শাহজালাল বিমান বন্দরে ক্রুদের ব্যাগ সেভাবে তল্লাশি না করায় তারা নিরাপদে কাজটি করতে পারছেন। ফ্লাইট সিডিউল বিভাগের একজন কর্মী জানান, ফ্লাইট ক্রু’র নির্দেশনা ছাড়া এয়ারক্রাফটে কোনোভাবেই চোরাই পণ্য তোলা সম্ভব নয়। বিমানের পাইলট, কেবিন ক্রু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পৃক্ততা ছাড়া তাদের উড়োজাহাজে স্বর্ণ চোরাচালান কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে অনেকেই মনে করেন।
অভিযোগ রয়েছে, বিমানের সিডিউলিং বিভাগে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর বসে ফ্লাইট বেচাকেনার হাট। একই বিভাগের একজন পাইলটের কক্ষে বসে এই কেনাবেচার টাকা ভাগবাটোয়ারা হয়। চোরাচালান সিন্ডিকেটের পক্ষে এক ব্যক্তি এই ফ্লাইট কেনাবেচার কাজ করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু তিনি বিমানের কোনো কর্মকর্তা নন, তবু অধিকাংশ পরিচালকের কক্ষে তার অবাধ যাতায়াত। মূলত তার পছন্দ অনুযায়ীই ওইসব ফ্লাইটের জন্য ক্রু নিয়োগ দেয়া হয়। রুট এবং চোরাই পণ্যের চালানের ওপর ভিত্তি করে সে ক্রু’র চাহিদা দিয়ে থাকে। তার চাহিদার ভিত্তিতেই ডিউটি দেয়া হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত ক্রু’রা চোরাচালানের পণ্য পাশের দেশে পাচার করছে। তবে বিমানে এ ধরনের ক্রুর সংখ্যা হাতেগোনা। এদের বেশির ভাগই চুক্তিভিত্তিক অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত। কিছু আছেন, যারা নানা অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে চাকরিচ্যুত হয়েও আদালতের রায় নিয়ে বহাল তবিয়তে আছেন। এরা সংখ্যায় কম হলেও খুবই শক্তিশালী। এই সিন্ডিকেটের কারণেই ১০ বছর ধরে আটকে আছে বিমানের স্থায়ী পদে কর্মরত ১০২ জন জুনিয়র পার্সারের (কেবিন ক্রু) পদোন্নতি। বিমানের প্রায় সবগুলো শাখার নানা পর্যায়ে চেষ্টা- তদবিরের পরও এই ১০২ জন জুনিয়র পার্সারের নাম এফসিপি লিস্টে (ফাইনাল ক্রু পজিশন) দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
