ফুল-ফল, শাক-সবজি মাটিতে চাষ হবে—এটাই স্বাভাবিক, সনাতন ও প্রচলিত পদ্ধতি। কিন্তু বর্তমানে দেশে যে হারে আবাদি জমি কমছে তাতে অনেকের পক্ষে চাইলেই জমিতে চাষাবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ শহর অঞ্চলে পছন্দমতো জমি নিয়ে শাক-সবজি, ফল-মূল আবাদ প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। এমনই কঠিন বাস্তবতায় মানুষ যাতে মাটি ছাড়াই বাড়ির আঙিনা, ছাদ, বারান্দা বা খোলা জায়গায় তাদের পছন্দের ফসল, ফুল ও সবজির আবাদ করতে পারে সেই সুযোগ করে দিয়েছেন আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীরা। অনেকটা পানি নির্ভর বিকল্প এই ফসল উত্পাদন পদ্ধতি জনপ্রিয়তাও পাচ্ছে দিন দিন। মাটিবিহীন চাষ কৌশলে উত্পাদন হচ্ছে টমেটো, লেটুস, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শসা, ক্ষীরা, ক্যাপসিকাম, স্ট্রবেরি, অ্যানথরিয়াম, গাঁদা, গোলাপ, অর্কিড, চন্দ্রমল্লিকাসহ নানা ফসল। মাটিবিহীন এই চাষ পদ্ধতিকে বলা হয় হাইড্রোপনিকস এবং একোয়াপনিকস।
যেখানে স্বাভাবিক চাষের জমি কম বা জমি একেবারেই নেই, সেখানে পলি টানেল, টব, বালতি, জগ, বোতল, পাতিল, প্লাস্টিকের ট্রে, নেট হাউসে অনায়াসে এসব পদ্ধতিতে সবজি, ফল ও ফুল উত্পাদন করা যাচ্ছে। কৃষক থেকে শৌখিন চাষী সবার কাছে জনপ্রিয় হচ্ছে এসব পদ্ধতি। এই চাষাবাদে কোনো কীটনাশক বা আগাছানাশক প্রয়োজন পড়ে না। অনায়াসে গড়ে তোলা যাচ্ছে অরগানিক ফসলের সম্ভার।
হাইড্রোপনিকস পদ্ধতি
বাংলাদেশে হাইড্রোপনিকস পদ্ধতির উদ্ভাবক বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)। ইনস্টিটিউটের উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ কে এম সেলিম রেজা মল্লিক ১৯৯৭ সালে জাপানে হাইড্রোপনিকস প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণ নেন। দেশে গবেষণা শুরু করেন ২০০৬ সালে। এ পদ্ধতিতে ২০০৭ সালে তিনি টমেটো, ক্যাপসিকাম, লেটুস ও স্ট্রবেরি এই চারটি ফসল চাষে সফল হন। ২০০৮ সালে ক্ষীরা, শসা, গাঁদা ফুল ও বেগুন এবং ২০০৯ সালে বামন শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি, চন্দ্রমল্লিকা চাষে সফলতা পান।
বিজ্ঞানী এ কে এম সেলিম রেজা মল্লিক জানান, লাভজনক ফসলের ক্ষেত্রে হাইড্রোপনিকস পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে মাটির পরিবর্তে পানিতে গাছের প্রয়োজনীয় খাবার সরবরাহ করে ফসল উত্পাদন করা হয়।
একোয়াপনিকস
একোয়াপনিকস হচ্ছে হাইড্রোপনিকস ও একোয়াকালচারের সমন্বয়ে মাছ ও সবজির সমন্বিত চাষ ব্যবস্থা। এই পদ্ধতিতে দুইটি প্রযুক্তিকে সমন্বয়ের মাধ্যমে মাটি ছাড়া সামান্য পানি ব্যবহার করে প্রচুর তাজা শাক সবজি ও মাছ পাওয়া যায়। এতে খুব বেশি জায়গার প্রয়োজন হয় না। তাছাড়া শাক-সবজি উত্পাদনের জন্য কোন প্রকার সারও দরকার নেই। এই পদ্ধতি খরা ও উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলের জন্য খুব উপযোগী। কারণ এতে প্রায় ৯৭ শতাংশ পানি কম লাগে। মাছের ট্যাঙ্কের অ্যামোনিয়া সমৃদ্ধ পানি গাছের শিকড়ে অবস্থিত ডি-নাইট্রিফাইং ব্যাকটেরিয়া ভেঙ্গে গাছের খাদ্য উপযোগী নাইট্রেটে পরিণত করে পানিকে দূষণ মুক্ত করে পুনরায় মাছের ট্যাঙ্কে ব্যবহার উপযোগী করে তোলে।
এই পদ্ধতির উদ্ভাবক বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একোয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ সালাম জানান, এই পদ্ধতিতে ফেলে দেওয়া পানির বোতল রি-সাইকেল করা যায়। বাঁশ বা কাঠ দিয়ে মাচা বানিয়ে আনুভূমিকভাবে জমির ব্যবহার কমিয়ে উলম্বভাবে অল্প জায়গায় অধিক ফসল পাওয়া যায়। প্রতিটি বাড়িতে এই পদ্ধতির সাহয্যে ফসল ও মাছ উত্পাদন করে বাজার নির্ভরতা কমানো সম্ভব।
হাইড্রোপনিকস পদ্ধতিতে চাষাবাদ
হাইড্রোপনিকস পদ্ধতিতে সাধারণত দুই উপায়ে চাষাবাদ করা যায়। একটি হচ্ছে সঞ্চালন পদ্ধতি, অন্যটি সঞ্চালনবিহীন পদ্ধতি। সঞ্চালন পদ্ধতিতে গাছের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য উপাদানগুলো যথাযথ মাত্রায় মিশ্রিত করে একটি ট্যাংকে নেয়া হয় এবং পাম্পের সাহায্যে পাইপের মাধ্যমে ট্রেতে পুষ্টি দ্রবণ সঞ্চালন করে ফসল উত্পাদন করা হয়। অপরদিকে, সঞ্চালনবিহীন পদ্ধতিতে একটি ট্রেতে গাছের প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদানগুলো পরিমিত মাত্রায় সরবরাহ করে সরাসরি ফসল চাষ করা হয়। এ পদ্ধতিতে খাদ্য উপাদান সরবরাহের জন্য কোনো পাম্প বা পানি সঞ্চালনের প্রয়োজন হয় না।
এই পদ্ধতিতে চারা রোপণের পর দ্রবণের পিএইচ (অম্ল) মাত্রা ৫.৮ থেকে ৬.৫ এর মধ্যে এবং ইসি (ক্ষার) মাত্রা ১.৫ থেকে ১.৯ এর মধ্যে রাখা দরকার। গাছের বৃদ্ধির পর্যায়ে ওপর থেকে সুতা বা শক্ত রশি ঝুলিয়ে গাছ সোজা ও খাড়া রাখতে হয় এবং পরিচর্যা সাধারণ গাছের মতোই করতে হবে।
হাইড্রোপনিকস পদ্ধতির জন্য রাসায়নিক দ্রব্যের পরিমাণ ও তৈরির প্রক্রিয়া একটু ভিন্ন রকম। প্রতি এক হাজার লিটার পানির জন্য পটাসিয়াম হাইড্রোজেন ফসফেট ২৭০ গ্রাম, পটাসিয়াম নাইট্রেট ৫৮০ গ্রাম, ক্যালসিয়াম নাইট্রেট ১ হাজার গ্রাম, ম্যাগানেসিয়াম সালফেট ৫১০ গ্রাম, ইডিটিএ আয়রণ ৮০ গ্রাম, ম্যাঙ্গানিজ সালফেট ৬.১০ গ্রাম, বরিক এসিড ১.৮০ গ্রাম, কপার সালফেট ০.৪০ গ্রাম, অ্যামনিয়াম মলিবটেড ০.৩৮ গ্রাম, জিংক সালফেট ০.৪৪ গ্রাম হারে পানিতে মিশিয়ে খাদ্য দ্রবণ তৈরি করতে হবে।
একোয়াপনিকস পদ্ধতিতে চাষাবাদ
বাড়ির ছাদের ট্যাঙ্কে মাছ ও সবজির সমন্বিত চাষ। বাড়ির ছাদে কিংবা আঙিনায় সমন্বিত এই পদ্ধতিতে মাছ ও সবজি চাষ করতে কোন রাসায়নিক সার বা কীটনাশক প্রয়োজন হয় না। ফলে উত্পাদিত মাছ ও সবজি খুবই স্বাস্থ্যসম্মত। বাসার ছাদের আয়তনের উপর নির্ভর যেকোন আকারের প্লাস্টিক ট্যাঙ্ক অথবা ড্রামের মধ্যে পানি দিয়ে সেখানে তেলাপিয়া, মাগুর, কই, পাঙ্গাসসহ বিভিন্ন দেশীয় জাতের মাছ চাষ করা যায়। সবজি চাষের জন্য একটি কাঠের আলনা বানিয়ে তাতে তিন সারিতে উল্টো করে একটির নিচে আরেকটি এভাবে দুইপাশে কাটা প্লাাস্টিকের বোতল বসিয়ে তাতে নুরি পাথর দিয়ে সবজির চারা লাগাতে হবে।
এবার মাছের ট্যাঙ্কের পানি বালতি করে উপরে তুলে সেখান থেকে সাইফন প্রক্রিয়ায় ফোটা ফোটা করে উপরের ওই চারা লাগানো বোতলে সরবরাহ করতে হবে। এই পানি পর্যায়ক্রমে উপর থেকে নিচে আরও দুটি বোতলের মধ্য দিয়ে গড়িয়ে একটি পাত্রে এসে জমা হয় যা পুনরায় মাছের ট্যাঙ্কে ব্যবহার করা হয়। মাছের ট্যাঙ্কের অ্যামোনিয়া সমৃদ্ধ পানি গাছের শিকড়ে অবস্থিত ডি-নাইট্রিফাইং ব্যাকটেরিয়া ভেঙ্গে গাছের খাদ্য উপযোগী নাইট্রেটে পরিণত করে পানিকে দূষণ মুক্ত করে পুনরায় মাছের ট্যাঙ্কে ব্যবহার উপযোগী করে তোলে। এ পদ্ধতিতে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি শাকসবজি চাষ করা যায়। তবে টমেটো, শসা, করলা, শিম, ব্রকলি, পুদিনা, বেগুন, দেশি লেটুসসহ আমেরিকান লেটুস ফলন বেশ ভাল হয়।
এই পদ্ধতিতে সবজি চাষের জন্য বাড়তি কোন প্রকার সার বা মাটির প্রয়োজন না পড়লেও মাছকে আলাদা খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। বাজার থেকে কিনে মাছকে যাতে খাদ্য দিতে না হয়। সেজন্য আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়ানো কালো সৈনিক নামের একটি পোকার লার্ভা মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এটি মাছের খুব প্রিয় খাবার। এতে রয়েছে প্রোটিন, লিপিড এবং বিভিন্ন প্রকার খনিজ লবণ। যা মাছের দ্রুত বর্ধনে সাহায্য করে। একটি বিশেষ চেম্বারে তরিতরকারির উত্কৃষ্ট এবং মুরগির বিষ্ঠা দিয়ে কম্পোস্ট বানিয়ে ওই পোকাকে বংশবিস্তারের জন্য আকৃষ্ট করে বাসায় বসেই স্বল্প সময়ে এবং বিনা খরচে মাছের জন্য ওই পুষ্টিকর খাদ্য উত্পাদন করা সম্ভব। এতে মাছ ও সবজি উত্পাদন বাবদ কোন খরচ হয় না।
বিকল্প চাষ পদ্ধতির সুবিধা
জানা গেছে, দেশে প্রতিদিন কমছে ২২০ হেক্টর চাষযোগ্য জমি। ফসলের মাঠে শিল্প আর শিল্পের জায়গায় আবাসন। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বসতভিটা তৈরি, অপরিকল্পিত চাষাবাদ, যোগাযোগের জন্য রাস্তা ও শিল্প-কলকারখানা স্থাপনের কারণে দেশে মাথাপিছু চাষযোগ্য জমির পরিমাণ সংকুচিত হচ্ছে। বর্ধিত জনসংখ্যার অব্যাহত খাদ্য চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে তাই শুধু আবাদি জমির ওপর নির্ভর করা যাবে না।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের এমনি অবস্থায় প্রয়োজন অব্যবহূত খালি জায়গা ও পতিত স্থান শস্য চাষের আওতায় আনা। হাইড্রোপনিকস এবং একোয়াপনিকস চাষ পদ্ধতি এক্ষেত্রে সঠিকভাবে আরোপযোগ্য একটি কৌশল।
