আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক বিশাল যুব সমাবেশে বলেছেন, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট দেশের জন্য বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই জোটেই রয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যাকারী, নারী ধর্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলে সেভেন মার্ডারের সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা। তারা দেশের শান্তি, উন্নতি ও কল্যাণ চায় না। অকারণে মিথ্যা বলা ও নিজেরা ঘটনা ঘটিয়ে অন্যের ওপর দোষ দেয়াই তাদের চরিত্র। তবে তাদের কোন হুমকি-ধামকিতে কাজ হবে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। দেশের এই অগ্রগতি কেউই রুখতে পারবে না। তিনি বলেন, দেশে যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছি তা নস্যাত্ করার জন্য অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচন বানচাল করতেও অনেক চক্রান্ত হয়েছে। তবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিগুলো সক্রিয় ছিল বলে কোন ষড়যন্ত্রই কষ্টার্জিত গণতন্ত্রকে ধ্বংস করতে পারেনি, ইনশাল্লাহ ভবিষ্যতেও পারবে না। যুবলীগসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল শক্তিকে যে কোন আত্মত্যাগে প্রস্তুত থাকার জন্য আহ্বান জানান তিনি।
যুবলীগের ৪২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর পুনর্মিলনী উপলক্ষে আয়োজন করা হয় এ যুব সমাবেশের। সমাবেশ জনসমুদ্রে রূপ নেয়। ঢাকা মহানগর ছাড়াও আশপাশের জেলা থেকে সংগঠনের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী সমাবেশে অংশ নেন।
শেখ হাসিনা বলেন, গ্যাস বিক্রি করতে সম্মত হইনি বলে ২০০১ সালের নির্বাচনে আমরা ক্ষমতায় আসতে পারিনি। তখন আলবদর প্রধান (মতিউর রহমান নিজামী) হয়ে যায় এদেশের মন্ত্রী। জিয়া যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়েছিলেন, পরে তার স্ত্রী খালেদাও তাদের মন্ত্রী করেন। ২০০৮ সালে নির্বাচনের পূর্বে আমরা দেশবাসীর কাছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার ওয়াদা করেছিলাম। আমরা ক্ষমতায় এসে এ বিচার শুরু করি। বিচারের রায়ও কার্যকর করেছি। একে একে যুদ্ধাপরাধের সব রায় কার্যকর করা হবে। এ বিচার করতে গিয়ে অনেক আন্তর্জাতিক চাপ সহ্য করতে হচ্ছে; কিন্তু আমরা কারোর কাছে মাথানত করি না, করবো না। কারণ আমরা বীরের জাতি, যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছি। একাত্তরের শহীদদের স্বজনরা এ বিচার চায়। স্বজনহারানো পরিবারের মানবাধিকার রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব, কোনো খুনী-অপরাধীদের নয়। লাখো শহীদের রক্তেভেজা বাংলাদেশের মাটিতে একাত্তরের গণহত্যাকারী, নারী ধর্ষণকারীদের ঠাঁই হবে না। বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্কের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, এদের জনসভাগুলোতে রাজাকারদের মুক্তি দাবির প্ল্যাকার্ড থাকে। উনি (খালেদা জিয়া) কী স্বাধীনতার পক্ষে? তাহলে উনার জনসভায় যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির দাবি উঠে কীভাবে। উনি কী চান তা তখন স্পষ্ট হয়ে যায়। তিনি বলেন, এখন আদালতে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে তারা প্রমাণিত হচ্ছে, এখন কী জবাব দেবেন খালেদা জিয়া? জাতির কাছে এ বিষয়ে তাকে জবাব দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিয়াউর রহমান ও তার স্ত্রী খালেদা জিয়া খুন আর ষড়যন্ত্র ছাড়া দেশকে কিছুই দিতে পারেনি। এই যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে খালেদা জিয়া আন্দোলনের নামে দেশের জনগণের বিরুদ্ধে তার সন্ত্রাসী বাহিনী লেলিয়ে দিয়েছিলেন। নির্মম-নিষ্ঠুর কায়দায় সাধারণ মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছেন, ইসলামের নামে রাজনীতি করে মসজিদে আগুন ও শত শত কোরআন শরিফ পুড়িয়েছেন। এটাই তাদের আসল চরিত্র। এসব হত্যাকান্ডের জবাব একদিন খালেদা জিয়াকেও দিতে হবে। যুব সম্প্রদায়ের উন্নয়নে বর্তমান সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, যুবকদের কল্যাণে সরকার ঋণ সুবিধা দিচ্ছে, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিটি থানায় ন্যাশনাল সার্ভিস ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট করা হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার শুধু দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণই করেনি; বাংলাদেশ এখন দেশের বাইরে খাদ্য রফতানিও করছে। সবজি, মাছসহ বিভিন্ন কৃষিজ দ্রব্য রফতানি করা হচ্ছে। কারো কাছে ভিক্ষা চাইতে হবে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিয়াউর রহমান কখনোই স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন না। ‘৭৫ সালের ১৫ আগস্ট খুনী খন্দকার মুশতাক ও জিয়াউর রহমানরা শুধু বঙ্গবন্ধুকেই সপরিবারে হত্যা করেনি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল। মুশতাক ছিল খুনী ও বেঈমান, আর তার দোসর ছিল জিয়া। মুশতাকের দোসর না হলে জিয়াউর রহমানকে কেন তিনি সেনাবাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব দিলেন। আর কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পেছনেও পরিকল্পনাকারী ছিলেন তারা। কারণ জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর খুনীদের প্লেনে করে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছিল মুশতাক-জিয়ারা। আর যিনি খুনীদের প্লেনে করে বিদেশে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই শমসের মবিন চৌধুরী এখনো বিএনপির নেতা।
সংগঠন ও দলের দুর্নাম হয় এমন কোনো কাজ করা থেকে বিরত থাকার জন্য যুবলীগের প্রতিটি নেতাকর্মীকে নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমন কোন কাজ কেউ করবে না যাতে যুবলীগের দুর্নাম হয়। বাংলাদেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে যুবলীগের অনেক আত্মত্যাগ রয়েছে। আগামীতেও দেশ ও জাতির কল্যাণে যুবলীগের প্রতিটি নেতাকর্মীকে যেকোনো আত্মত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। একই সঙ্গে তিনি কারোর কাছে ধর্ণা না দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে সংগঠনকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলার জন্যও যুবলীগ নেতাকর্মীদের প্রতি নির্দেশ দেন। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের আর কারোর কাছে ভিক্ষা চাইতে হবে না। ইচ্ছা থাকলে দেশের উন্নয়ন যে করা যায়, আমরা তা প্রমাণ করেছি। বাংলাদেশকে আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলবো। আর এই সোনার বাংলা বিনির্মাণে যুবকদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বিকাল ৩টা ২০ মিনিটে সমাবেশ স্থলে পৌঁছে প্রথমে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। একই সঙ্গে যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন। এ সময় জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। ‘যুবজাগরণের ডাক’ শিরোনামে আয়োজিত এ যুব সমাবেশের সময় ২টা ঘোষিত থাকলেও বেলা ১১টার পর থেকে সারাদেশের যুবলীগ নেতা-কর্মীরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আসতে থাকে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিশাল প্যান্ডেল ছাড়াও রঙ-বেরঙের বিভিন্ন প্ল্যাকার্ডে অপরূপ শোভা পায় ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান।
শত শত গাড়ি একযোগে শাহবাগের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানমুখী হওয়ায় নগরবাসীকে একটু ভোগান্তির মুখেও পড়তে হয়। তবে যুবলীগের এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সম্মেলনে ব্যতিক্রমী উপস্থাপনা ছিল উল্লেখ করার মত। বাংলা ও ইংরেজিতে উপস্থাপনার পাশাপাশি ‘রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার পরিবর্তনের ডাক’, ‘রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম’, ‘ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা’ শীর্ষক তিনটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এছাড়া উপস্থিত যুবলীগ নেতাকর্মীদের শপথ বাক্য পাঠ করান যুবলীগ চেয়ারম্যান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি শেখ হাসিনাকে ফুলের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন এবং তার হাতে ৪২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ক্রেস্ট ও প্রকাশনা তুলে দেন যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ। অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশনের পাশাপাশি ‘জেগে উঠলো দেশ, ঘুরে দাঁড়ালো প্রজন্ম’ শীর্ষক নৃত্য ও নারীর আত্মরক্ষা কৌশল ‘তাইকান্দো’ প্রদর্শন করেন যুবলীগের নারী কর্মীরা।
যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর সভাপতিত্বে সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক এমপি, নেপালের ক্ষমতাসীন যুব কংগ্রেসের সভাপতি মহেন্দ যাদব, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ। অনুষ্ঠানে মহাজোট সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মন্ত্রী, নেতা, সংসদ সদস্য ও বিভিন্ন দূতাবাসের কূটনৈতিকবৃন্দও উপস্থিত ছিলেন।
