সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. একেএম শফিউল ইসলাম (৫০) হত্যার প্রতিবাদ বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ক্যাম্পাস। প্রকাশ্যে এই নৃশংস হত্যার প্রতিবাদে রাবি শিক্ষক সমিতির ডাকে রবিবার ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। সোম-মঙ্গলবারও এ কর্মসূচি পালন কররার ঘোষণা দিয়েছে শিক্ষক সমিতি। পাশাপাশি ১৫ দিনের দিনের মধ্যে আসামিদের ধরতে ও হত্যা রহস্য উন্মোচনের আল্টিমেটাম দিয়েছে শিক্ষক সমিতি। বিভিন্ন সংগঠন ক্যাম্পাসে শোক ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে।
এদিকে শিক্ষক শফিউল হত্যার ঘটনায় কলেজ অধ্যক্ষসহ ছয়জনকে পুলিশ আটক করেছে। অন্যদিকে রবিবার নিজ গ্রাম হিয়াতপুরে জানাযা শেষে পারিবারিক গোরস্থানে অধ্যাপক শফিউল ইসলামের মরদেহ দাফন করা হয়েছে।
এরআগে শনিবার রাত ৯টায় রাবি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে নিহতের প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
এছাড়া চাঞ্চল্যকর এই শিক্ষক হত্যার দায়িত্ব স্বীকার করেছে ‘আনসার আল ইসলাম বাংলাদেশ-২’ নামের একটি কথিত সংগঠন।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকের একটি পেইজে অধ্যাপক শফিউল ইসলাম হত্যার দায়িত্ব স্বীকার করা হয়। হত্যার প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পর শনিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে খোলা ওই পেইজে দায়িত্ব স্বীকারের আগে ও পরে কোনো পোস্ট নেই। ওই পেজে দাবি করা হয়েছে, ‘তাদের মুজাহিদিনরা রাবি শিক্ষক শফিউল ইসলামকে হত্যা করেছে। ক্লাসে ছাত্রীদের বোরকা পরা নিষিদ্ধ করার অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছে।’
তবে দায়িত্বশীল কোনো সূত্র থেকে সুনির্দ্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। কোথা থেকে ওই পেজটি খোলা হয়েছে, তা উদ্ধার করতে পারলে ড. শফিউলের হত্যাকারীদের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
সোম-মঙ্গলবারও শিক্ষকদের ক্লাস বর্জনের ঘোষণা, উত্তাল ক্যাম্পাস
সহকর্মীর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আরো দুই দিন সোমবার ও আগামী মঙ্গলবার ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। পাশাপাশি আসামিদের ধরতে ও হত্যা রহস্য উন্মোচনে ১৫ দিনের সময় বেঁধে দিয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি। এ সময়ের মধ্যে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত না করতে পারলে আরো কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে জানিয়েছেন তারা।
এছাড়া এক সপ্তাহ পর্যন্ত কালোব্যাচ ধারণ এবং আগামী ১৯ নভেম্বর নগরীর সাহেব বাজার জিরোপয়েন্টে মানব বন্ধন করবে শিক্ষক সমিতি।
রবিবার সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরী ভবনস্থ লাউঞ্জে অনুষ্ঠিত সমিতির কার্যকরী পরিষদের জরুরী সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
এতে সভাপতিত্ব করেন সমিতির সভাপতি প্রফেসর কামরুল হাসান মজুমদার। সভা শেষে রাত পৌণে ৯টায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক প্রণব কুমার পাণ্ডে উপস্থিত সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
এদিকে শফিউল হত্যার প্রতিবাদে রবিবার ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি পালন করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। কর্মসূচী চলাকালে শিক্ষক সমিতির ক্যাম্পাসে শোক ও প্রতিবাদ র্যালি করেছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোট ও প্রগতিশীল ছাত্রজোটের উদ্যোগে পৃথকভাবে এসব কর্মসূচি পালন করা হয়।
বেলা সাড়ে ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের সামনে থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির উদ্যোগে শোক র্যালি বের হয়। র্যালিটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে মিলিত হয়।
সমিতির সভাপতি অধ্যাপক কামরুল হাসান মজুমদারের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক প্রণব কুমার পা্লের সঞ্চালনায় প্রতিবাদ সমাবেশে ছাত্রউপদেষ্টা অধ্যাপক ছাদেকুল আরেফিন মাতিন, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ওয়ারদাতুল আকমাম, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের প্রশাসক অধ্যাপক সফিকুন্নবী সামাদী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাশেম, অধ্যাপক জাহিদুল হাসান, বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত শিক্ষকদের সাদা দলের আহবায়ক অধ্যাপক শামসুল আলম সরকার ও অধ্যাপক আফসার উজ জামান খান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
এদিকে অধ্যাপক শফিউল হত্যার প্রতিবাদে বেলা ১২টার দিকে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ছাত্রজোট। বিক্ষোভ মিছিলটি ক্যাম্পাসের টুকিটাকি চত্বর থেকে শুরু হয়ে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সমাবেশে মিলিত হয়। সমাবেশে রাবি শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সহ-সভাপতি খাদিমুল বাশার, বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর সহ-সভাপতি মিঠুন রায়, ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন সুজন, ছাত্র ফেডারেশনের অর্থ সম্পাদক তমাশ্রী দাস, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী রুবেল পারভেজ বক্তব্য দেন। বক্তারা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অধ্যাপক শফিউলের হত্যাকারী সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
কলেজ অধ্যক্ষসহ আটক ১৫
অধ্যাপক একেএম শফিউল ইসলামের হত্যাকা্লের ঘটনায় জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রিত বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন নগরীর বিনোদপুরের ‘ইসলামিয়া কলেজ’র অধ্যক্ষ হুমায়ুন আহম্মেদসহ ১৫ জনকে পুলিশ আটক করেছে।
রবিবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের চারজনকে আটক করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
এ ব্যাপারে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মজিদ বলেন, হত্যাকান্ডের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চারজনকে আটক করা হয়েছে।
আটককৃতদের গোয়েন্দা অফিসে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।
নগরীর মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর হোসেন বলেন, শিক্ষক শফিউল ইসলাম হত্যায় দু’জন অংশ নেয় বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। শনিবার রাতেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী জনৈক হাসিব ও দিপু নামের দুইব্যক্তিকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
রাজশাহী বিশ্বিবিদ্যালয়ে স্বাধীনতার পর ১৯৮২ সাল থেকে বিগত ৩২ বছরে ৩১টি খুনরে ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে তিনজন শিক্ষক, ২৮ জন শিক্ষার্থী ও একজন বহিরাগত।
শনিবার বিকেল ৩টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন নগরীর চৌদ্দপাই এলাকায় অধ্যাপক ড. একেএম শফিউল ইসলাম লিলনকে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে গুরুতর জখম করে ফেলে রেখে যায়। মুমূর্ষু অবস্থায় স্থানীয় এলাকাবাসী এসে তাকে উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিত্সক মৃত ঘোষণা করেন।
এমপি বাদশার শোক ও উদ্বেগ
অধ্যাপক একেএম শফিউল ইসলামের হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী সদর আসনের সাংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা। তিনি ঘটনার সাথে জড়িত অপরাধীদের শিগগিরি চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ প্রশাসনের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।
