মাসুদ যেভাবে হলেন জঙ্গি সাজিদ

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০১৪, ১০:০৪

ভারতে গ্রেফতার জঙ্গি সাজিদের জন্ম নারায়ণগঞ্জ বন্দর উপজেলার ফরাজীকান্দা গ্রামের দরিদ্র পরিবারে। তার উত্থান চলচ্চিত্রের কাহিনীর মতো। তার পিতামাতার রাখা নাম মাসুদ মিয়া ওরফে মাসুদ (৩৫)। জঙ্গি সংগঠনে ঢুকে তার নাম হয় সাজিদ। জঙ্গি সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীদের আসল নামের বাইরে একাধিক ছদ্মনাম দেয়া হয়। গ্রেফতার এড়ানোর টেকনিক হিসাবে তারা এ কাজ করে থাকেন।
সাজিদের নামে গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ায় ও টুঙ্গীপাড়া থানায় ২০০৫ সালে অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে দুইটি মামলা হয়েছে। গোয়েন্দাসূত্রে জানা গেছে, এর আগে ২০০২ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ব্র্যাক অফিসে হামলা ও লুটপাটে সাজিদ জড়িত ছিল। সাজিদ ওই সময় গোয়েন্দাদের হাতে ধরা পড়ে। এরপর ২০০৫ সালে গোপালগঞ্জ ব্র্যাক অফিসে ডাকাতি করতে গিয়ে তিনি ধরা পড়েন। ২০১২ সালে ঢাকার মিরপুর দারুস সালাম এলাকা থেকে সাজিদকে র্যাব গ্রেফতার করে। গোয়েন্দা ও র্যাবের কাছে সাজিদ জানায়, দরিদ্র পরিবার থেকে কিভাবে জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে এবং জিহাদের নামে জীবন উত্সর্গ করার ঘোষণা দেয়। জানিয়ে দেয় কোথায়, কিভাবে এবং কাদেরকে হত্যা করা হবে। জঙ্গিদের অর্থের উত্স সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য দেয় সাজিদ। তারা জামিনে বের হয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে। অপর একটি গ্রুপ জামিনে বের হয়ে ভারত চলে যায়। সাজিদ (মাসুদ) জানায় যে, বন্দর উপজেলার ফরাজীকান্দা গ্রামে দিনমজুর মরহুম সিদ্দিকুর রহমানের পুত্র সে। তারা ৫ ভাই ও ৪ বোন। ফরাজীকান্দার একটি মসজিদ থেকে কোরআন পড়া শিখে। এরপর স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে। পরে মাসুদ যাত্রাবাড়ী মোহাম্মদিয়া আরাবিয়া কওমী মাদ্রাসায় চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হয়। পাশাপাশি আর্থিক সংকটে পড়ে সে দোকানে কাজ করে। এ মাদ্রাসাটি জামায়াতের আহলে হাদিস সংগঠন কর্তৃক পরিচালিত। এ সূত্র থেকে মাসুদ পর্যায়ক্রমে জঙ্গি নেতাদের সংস্পর্শে চলে যায়। ঐসব জঙ্গি সংগঠনের নেতারা তাকে এমনভাবে মগজ ধোলাই করে যে ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপে জড়িতদের হত্যা করলে  জান্নাত পাওয়া যাবে। জঙ্গিদের জিহাদী গ্রুপে সাজিদ অংশগ্রহণ করে। শুধু বহির্বিশ্বে নয়, বাংলাদেশে এনজিওগুলো মা-বোনদের বেপর্দা শেখায়, সুদ, ঘুষ খাওয়া, মুসলমানদের খ্রীস্টান বানানোসহ অনৈসলামিক কার্যকলাপ করছে বলে তার মগজ ধোলাই করে। তাদের উত্খাত করা জিহাদের অংশ বলে সাজিদ জানায়। ২০০ বছর পূর্বে ইংরেজরা এদেশে ব্যবসা করার কথা বলে এদেশ দখল করে। বহু মুসলমানকে নানা লোভ দেখিয়ে খ্রীষ্টান বানিয়েছিল।
এদেশে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে দেশের একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতা, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রী জড়িত। কতিপয় শিল্পপতিও অর্থ যোগান দিচ্ছে। এছাড়া আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীতে জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা রয়েছে। একশ্রেণির আইনজীবী জঙ্গিদের কার্যক্রমে জড়িত। যার কারণে সহজে পেয়ে যায় তারা জামিন। এমন তথ্য বের হয়ে আসছে। বর্তমান সরকারকে আন্দোলন করে সরানো যাবে না। জঙ্গিদের ব্যবহার করে দেশে বড় ধরনের নাশকতা করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এ পরিকল্পনায় জঙ্গি পৃষ্ঠপোষক ও অর্থ যোগানদাতা শিল্পপতিরাও জড়িত। এমন তথ্য দুই দেশের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের রয়েছে। ঐ পরিকল্পনার অংশ হচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. এ কে এম শফিউল ইসলাম বলে গোয়েন্দা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত।
২০০২ সালে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম জঙ্গি সংগঠন উত্থানের সংবাদ পায় পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ। ওই সময় সরকারের শীর্ষ প্রশাসনের কাছে জঙ্গিদের নামসহ সংগঠন সম্পর্কে তথ্য পাঠানো হলেও বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। উল্টো গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের শীর্ষ প্রশাসন জানিয়ে দেয় জঙ্গি মিডিয়ার সৃষ্টি। এ নিয়ে মাথা ঘামানো থেকে বিরত থাকতে গোয়েন্দাদের নির্দেশ দেয়া হয়। যদি ওই সময় জঙ্গিদের ব্যাপারে সরকার সিরিয়াস হতো তাহলে সাজিদের মত দরিদ্র পরিবারের ছেলে জঙ্গি কার্যক্রমে জড়াতে সুযোগ পেতো না বলে জানিয়েছেন শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। অপরদিকে, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট জেএমবিসহ জঙ্গি সংগঠনগুলো সারাদেশে একযোগে সিরিজ বোমা হামলা চালায়। পরবর্তীতে   বিচারকসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ও আদালতসহ নানা স্থাপনায় জঙ্গিরা বোমা হামলা চালায়। এতে কয়েকশত লোকের প্রাণহানি ঘটে। তখন বিএনপিসহ চারদলীয় জোট সরকারের টনক নড়ে। দেশ-বিদেশে তুমুল সমালোচনার ঝড় উঠে। পুলিশ-র্যাব, গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইন—শৃঙ্খলা বাহিনী জঙ্গি দমনে কঠোর অবস্থানে যায়। উক্ত হামলার সঙ্গে জড়িত জঙ্গিরা ভারতের বর্ধমান ও মুর্শিদাবাদসহ বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নেয়। এ ছাড়াও  বাংলাদেশের পেশাদার কিলাররা ভারতের ওই সব এলাকায় আশ্রয় নেয়। ভারতের গোয়েন্দা নজরে ওইসব জঙ্গি ও কিলাররা রয়েছে। মাঝে মাঝে বাংলাদেশি কিলার কিংবা সন্ত্রাসী গ্রেফতার হলেও জঙ্গিরা থাকতেন নিরাপদে। র্যাব ও পুলিশ ওইসব জঙ্গি নেতা-কর্মী ও কিলারদের তালিকা কয়েক দফা ভারতের কাছে দেয়। তার পরেও এ বিষয়টি ভারত আমলে নেয়নি। সমপ্রতি বর্ধমানে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এবং ভারতের বিভিন্ন স্থানে হামলার হুমকি দেয় জঙ্গিরা। এ সব ঘটনার পর ভারতের গোয়েন্দাসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রশাসনের টনক নড়ে। এখন ভারত ও বাংলাদেশ জঙ্গি দমনে একমত হয়েছে।
ভারতীয় গোয়েন্দা দল ঢাকায় আসছে আজ
আজ সোমবার ঢাকায় আসছে ভারতের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনআইএ) একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল। আগামীকালও তারা বাংলাদেশে থাকবে। এনআইএ’র মহাপরিচালক শারদ কুমার দলটির নেতৃত্ব দেবেন। রবিবার ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশন থেকে এ তথ্য জানানো হয়।
হাইকমিশন জানায়, গোয়েন্দা প্রতিনিধি দলটি বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর সঙ্গে বৈঠক করবে। এর আগে সমপ্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলীর কাছে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি হস্তান্তর করেন ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ।
সূত্র জানায়, পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার খাগড়াগড়ে গত ২ অক্টোবর বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে শাকিল আহমেদ ও সুবহান মণ্ডল নামে দুইজন নিহত এবং আব্দুল হাকিম নামে একজন আহত হন। এনআইএর প্রাথমিক তদন্তে বলা হচ্ছে, এ তিনজনই জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ বা জেএমবির সদস্য। এ বিষয়টি খতিয়ে দেখতেই এনআইএ প্রতিনিধি দলের এ ঢাকা মিশন।
এ মিশনে তারা বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রধান, পার্বত্য চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীলদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন। এ ছাড়া বাংলাদেশে জামায়াতুল মুজাহিদীন বা এ ধরনের জঙ্গি সংগঠনগুলোর কার্যক্রম, দেশে-বিদেশে এগুলোর নেটওয়ার্ক এবং এর অর্থায়নসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের কাছে তথ্য চাইবে ভারত।