জঙ্গিদের মূল উত্পাটনে একসঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশ ও ভারত। ভারতের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনআইএ) টিমের সঙ্গে বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া উভয় দেশের কর্মকর্তারা জঙ্গিদের ব্যাপারে নিজ নিজ দেশের পক্ষে তালিকা ও তথ্য আদান প্রদান করেন। সোমবার সকালে এনআইএর চার সদস্যের একটি ঢাকায় পৌঁছে। দুপুরে তারা স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সৌজন্য ও পরিচিতিমূলক বৈঠকে অংশ নেন। এরপর বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। এনআইএর টিমের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনের দুইজন কর্মকর্তাও উপস্থিত ছিলেন।
পরিচিতিমূলক বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোজাম্মেল হক খান বলেন, ‘ভারত ও বাংলাদেশে জঙ্গি তত্পরতা নিয়ে এনআইএ যেসব তথ্য দিয়েছেন তা উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়।’ এনআইএর মহাপরিচালক শারদ কুমারের নেতৃত্বে চার সদস্যের এই প্রতিনিধি দল দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যায়। সংস্থার উপ-মহা পরিদর্শক সজীব ফরিদ সপু ও অনুরাগ তঙ্কাও এ প্রতিনিধি দলে রয়েছেন।
বৈঠক শেষে বেরিয়ে স্বরাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘ভারতের সন্দেহ, ভারত ও বাংলাদেশে দুই দেশেই দুষ্কৃতকারীরা রয়েছে। এদের খুঁজে বের করা দরকার।’
গত ২ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে একটি বাড়িতে বিস্ফোরণে দু’জন নিহত হওয়ার পর তদন্তে নেমে বাংলাদেশের নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সম্পৃক্ততার কথা জানায় এনআইএ। সেই সঙ্গে আন্তঃদেশীয় একটি জঙ্গি নেটওয়ার্কের তথ্য পাওয়ার কথাও জানায় সংস্থাটি। তারা দাবি করে, বাংলাদেশের দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে হত্যারও ছক কষছে জঙ্গিরা। এর পরই বাংলাদেশে তদন্ত চালানোর বিষয়টি মাথায় আনে এনআইএ।
স্বরাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘দুই দেশই মনে করে, আমাদের ভূখণ্ড দুষ্কৃতকারীদের ব্যবহার করতে দেয়া হবে না। আমাদের সঙ্গে স্বল্প সসময়ের বৈঠক হয়েছে। তাদের চার সদস্যের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সার্বিক বিষয়ে আলোচনার জন্য আমাদের ছয় সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে।’ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত এই কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে জানান স্বরাষ্ট্র সচিব।
পরিচিতিমূলক বৈঠকের পর অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত টিমের সঙ্গে বৈঠক করে এনআইএ’র টিম। ওই বৈঠক শেষে ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘তারা কয়েকটি নাম দিয়েছেন। সেগুলো ভারতীয় না বাঙালি তা নিশ্চিত নয়। কারণ একেকজন জঙ্গির ১০০ নামও থাকে। তবে এগুলো এখন যাচাই করা হবে।’ মনিরুল আরও বলেন, ‘জেএমবিসহ অন্য জঙ্গিরা যাতে এপাশে (বাংলাদেশ ) বা ওপাশে (ভারত) মাথাচাড়া দিতে না পারে, আশ্রয় নিতে বা ঘাঁটি গাড়তে না পারে, সেজন্যও আলোচনা হয়েছে।’ বৈঠক সূত্র জানায়, ‘এনআইএ’র টিম অকপটে স্বীকার করেছে, এই ধরনের জঙ্গিদের ব্যাপারে তাদের কোন অভিজ্ঞ নেই। বাংলাদেশে অনেক আগে থেকেই জঙ্গি বিরোধী কাজ করছে। তাই তারা সর্বাত্মক সহযোহিতা চায়।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত পরিচিতি সভায় পুলিশ মহাপরিদর্শক হাছান মাহমুদ খন্দকার, র্যাব মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমান, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালক সামছুল হক, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) প্রধান আকবর হোসেন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহা-পরিচালক আজিজ আহমেদ, পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধান জাবেদ পাটোয়ারি, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান মোখলেসুর রহমান, র্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে. কর্ণেল আবুল কালাম আজাদ, ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
গত ২ অক্টোবর বর্ধমান বিস্ফোরণে শাকিল আহমেদ ও সুবহান মণ্ডল নামের দুজন নিহত এবং আবদুল হাকিম নামের একজন আহত হন। তারা জেএমবির সদস্য বলে প্রাথমিক তদন্তে এনআইএ জানতে পেরেছে। জড়িত সন্দেহে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদ করছে এনআইএ। এদের মধ্যে শেখ রহতুল্লাহ সাজিদসহ কয়েকজন বাংলাদেশিও রয়েছে বলে তাদের দাবি। গত ৮ নভেম্বর সাজিদকে কলকাতায় গ্রেফতারের পর বলা হয়, ৪০ বছর বয়সী এই ব্যক্তি জেএমবির কমান্ডার। তার বাড়ি বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের ফরাজীকান্দায়।
সাজিদ নামে বাংলাদেশে কাউকে সনাক্ত করা না গেলেও মাসুম নামে এক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করেছে র্যাব। ধারণা করা হচ্ছে, এই মাসুমই ভারতে গ্রেফতার সাজিদ। মাসুমের এক ভাইকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, এনআইএর প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুর্শিদাবাদ, মালদহ ও নদীয়া জেলায় ইসলামি রাষ্ট্র গড়ার ছক এঁকেছিল জেএমবি। বিস্ফোরণে জড়িত ১২ জনের মধ্যে চারজন বাংলাদেশের।
