সাত খুন তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০১৪, ২০:০৬
 
হাইকোর্ট উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে যেন কোন প্রশ্নের উদ্রেক না হয়।
আদালত বলেছে, ‘আমরা পত্রপত্রিকায় দেখেছি র‌্যাব নারায়ণগঞ্জ ইউনিটের সকল সদস্যই ঘটনার পর চাকরিতে কর্মরত ছিলেন। তাদের সবার নাম, ঠিকানা, পদবি ছিলো। তাদেরকে গ্রেফতারে কি সমস্যা ছিলো? এদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা তো জটিল কাজ নয়। কিন্তু তা না করে একেক সময় একেক জনকে কোর্টে হাজির করে জবানবন্দি নেয়া হচ্ছে। কাউকে একদিন, কাউকে সাতদিন পর, কাউকে দশদিন পর জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এগুলো করা হচ্ছে কি তাদের কে জড়ানোর জন্য; নাকি বিশেষ মহলকে রক্ষা করতে?’
মঙ্গলবার বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের ডিভিশন বেঞ্চে সরকারি তদন্ত কমিটিসহ তিনটি সংস্থার অগ্রগতি তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর আদালত এ উদ্বেগ প্রকাশ করে। তখন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোমতাজউদ্দিন ফকির বলেন, তাদের (তদন্তকারী সংস্থা) একাগ্রতা ও আন্তরিকতার অভাব নেই।
আদালত বলে, এ ঘটনার অনুসন্ধান কাজ থেকে সিআইডিকে বাদ দিয়েছে আপিল বিভাগ। আপিল বিভাগের ওই আদেশপ্রাপ্তি সাপেক্ষে আগামী ১০ ডিসেম্বর এসব অগগ্রতি প্রতিবেদনের ওপর পরবর্তী আদেশ দেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনা তদন্তে গত ৫ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে দেয় হাইকোর্ট। ডিবির পাশাপাশি সিআইডিকেও তদন্তের দায়িত্ব দেয় উচ্চ আদালত। র্যাবকে বিভাগীয় তদন্ত করতে বলা হয়। কিন্তু দুটি সরকারি তদন্ত সংস্থা একসঙ্গে তদন্ত করলে জটিলতা দেখা দিতে পারে এই মর্মে সিআইডিকে তদন্ত কাজ থেকে বাদ দেওয়ার জন্য আবেদন জানালে গত ১১ নভেম্বর আপিল বিভাগ সিআইডিকে অনুসন্ধান কাজ থেকে অব্যাহতি দেয়।
এদিকে হাইকোর্টের আদেশে গত সপ্তাহে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করে সরকারি তদন্ত কমিটি, র্যাব ও আইজিপি। এসব সংস্থার দাখিলকৃত প্রতিবেদন গতকাল হাইকোর্টে উপস্থাপন করেন মোমতাজ উদ্দিন ফকির।
আইজিপির প্রতিবেদন তুলে ধরে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, খুনের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থদের যথাযথ নিরাপত্তা দিতে আদালতের নির্দেশ ছিলো। সেটি প্রতিপালন করা হয়েছে। এ পর্যায়ে আদালত বলে, আইজিপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ক্ষতিগ্রস্থরা হুমকির মুখে রয়েছে। এটি তো বললেন না।
র্যাবের প্রতিবেদন তুলে ধরে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, র্যাব এ পর্যন্ত ৮৭ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এসব জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করতে তাদের এক সপ্তাহ সময় প্রয়োজন।
সরকারি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন উপস্থাপন করে মোমতাজউদ্দিন ফকির বলেন, এই তদন্ত কমিটি র্যাব-১১-এর তিন কর্মকর্তা, নূর হোসেনের দেহরক্ষী, নারায়ণগঞ্জ সিটি মেয়র সেলিনা হায়াত আইভি ও সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ ৩৭৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছে। এদের মধ্যে র্যাবের কেউ কেউ কারাবন্দি রয়েছেন। যাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে, তাদের সাক্ষ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে। এ থেকে ঘটনার সার্বিক বিষয়ে মোটামুটি ধারণা লাভ করা সম্ভব হয়েছে। আরো কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী গ্রেফতার হয়নি। ভারতে আটক নূর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন রয়েছে। সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে তার সাক্ষ্য নেয়া হবে। গৃহীত সাক্ষ্য ও বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনার জন্য চার সপ্তাহ সময় দরকার।
অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বিভিন্ন সরকারি সংস্থা তদন্ত সম্পন্ন করতে ভিন্ন ভিন্ন সময় উল্লেখ করে আদালতে আবেদন জানিয়েছেন। এ পর্যায়ে আদালত বলেন, সিআইডিকে এ ঘটনার অনুসন্ধান কাজ থেকে অব্যাহতি চেয়ে আপনারা (রাষ্ট্রপক্ষ) আপিল বিভাগে গিয়েছেন। আপিল বিভাগ সিআইডিকে বাদ দিয়েছে। আদালত বলে, আপিল বিভাগ ‘কমপ্লিট জাস্টিস’ করে। আমরা আইনের মধ্যে থেকে আদেশ দেই।
এ সময় অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আপনারা ‘এন্ড অব জাস্টিস’ করেন। আদালত বলে, আপিল বিভাগ বলেছে সিআইডি অনুসন্ধান করতে পারবে না। তবে বাকি কমিটিগুলোর তদন্ত চলবে। তার মানে নিয়মিত তদন্তের পাশাপাশি অন্য অনুসন্ধানও চলবে এবং সেসব তদন্তের সাক্ষ্যমূল্য আছে। এ পর্যায়ে আদালত বলে, সিআইডি এ পর্যন্ত যতটুকু তদন্ত করেছে এবং এতে যেসব তথ্য উঠে এসেছে তার কি হবে? সেসব কি বাদ যাবে?
তখন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সাক্ষ্য আইন অনুসারে সেগুলো বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। এরপর আদালত আগামী ১০ ডিসেম্বর এ বিষয়ে পরবর্তী আদেশের জন্য দিন ধার্য রাখেন।