প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে ৩৮৯ রোহিঙ্গা ভোটারের তালিকা ইসিতে

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০১৪, ২০:১১
 
 
রোহিঙ্গারা নানা কৌশলে বাংলাদেশে ভোটার হয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করছেন। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে গত সপ্তাহে এ ধরনের ৩৮৯ জন রোহিঙ্গা ভোটারের একটি তালিকা নির্বাচন কমিশনে (ইসি) পাঠানো হয়েছে। ওই তালিকা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। ওই তালিকা সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা ভোটার রয়েছে  কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার। বান্দরবান জেলার ভোটার তালিকাও রোহিঙ্গামুক্ত নয়। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে ইসিকে জানানো হয়েছে— স্থানীয় কিছু লোকের সহায়তায় এ সব বিদেশি নাগরিক ভোটার হয়েছেন।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের ওই চিঠির আলোকে ব্যবস্থা নিতে আমরা সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলায় এ বিষয়ে গঠিত বিশেষ কমিটির কাছে নির্দেশনা পাঠাতে যাচ্ছি।
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান— গত সোমবার কমিশন সচিবালয় থেকে প্রধানমন্ত্রী দপ্তরের ওই  চিঠি ও তালিকা তাদের কাছে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
এ দিকে, কয়েক মাস আগে চট্টগ্রামে ভোটার তালিকার হালনাগাদ কার্যক্রম পরিদর্শন শেষে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক কমিশনকে জানান— রোহিঙ্গারা এবার মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের জেলার চিহ্নিত ১৪টি উপজেলার বাইরে বসতি গেড়ে ভোটার হওয়ার কৌশল অবলম্বন করেছে। সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কর্মকর্তারাও তখন  জানিয়েছিলেন— রোহিঙ্গা ভোটার এড়াতে চট্টগ্রামের চিহ্নিত ১৪টি উপজেলায় বিশেষ ব্যবস্থায় সতর্কতার সাথে ভোটার হালনাগাদ কার্যক্রম চালানো  হলেও এর বাইরের উপজেলাগুলোতে তারা সহজেই ভোটার হতে পারছেন। সে কারণে ভোটার তালিকায় রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকানো যাচ্ছে না। বিশেষ করে চট্টগ্রামের অচিহ্নিত পাঁচটি উপজেলায় এ সমস্যা রয়েছে।   
চট্টগ্রামের জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা খোরশেদ আলম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ওই সময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের বরাতে নির্বাচন কমিশনকে বলা হয়— চট্টগ্রামের ৫টি উপজেলার বেশ কিছু ইউনিয়নে ও পৌরসভায় রোহিঙ্গারা বসবাস করছে। এগুলো হচ্ছে— সাতকানিয়া উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের মধ্যে-বাজালিয়া, কেউচিয়া, ছদাহা, ঢেমশা ও সাতকানিয়া পৌরসভা; লোহাগড়া উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে চুনতি, বড়হাতিয়া, চরম্বা, পুটিবিলা ও কলাউজান; চন্দনাইশ উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে কাঞ্চনাবাদ, হাসিমপুর, দোহাজারি, ধোপাছড়ি ও চন্দনাইশ পৌরসভা; পুটিয়া উপজেলার ২২টি ইউনিয়নের মধ্যে হাইদগাঁও, কেলিশহর, কচুয়াই ও পুটিয়া পৌরসভা; রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের মধ্যে পদুয়া, চন্দ্রঘোনা ও পোমরা। এ সব এলাকায় নতুন করে এসে রোহিঙ্গারা বসতি স্থাপন করেছে। চলমান হালনাগাদে সহজেই ভোটার হতে পারছেন। কিন্তু নতুন এ সব এলাকায় বিশেষ ফরম ও বিশেষ কমিটি না থাকায় রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকানো যাচ্ছে না।
ওই চিঠি এবং নির্বাচন কমিশনার  মোহাম্মদ আবদুল মোবারকের পর্যবেক্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত বিশেষ এলাকার আওতা আরো বাড়িয়ে সে সব এলাকায় বিশেষ ফরম ও বিশেষ কমিটি গঠনের উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। 
উল্লেখ্য, ২০১২ সালে ভোটার তালিকা হালনাগাদেও রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অনুপ্রবেশ ঠেকাতে পারেনি নির্বাচন কমিশন। কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় কাজে লাগেনি বিশেষ তথ্য ফরম ব্যবহারের কৌশল। ২০০৮ সালের যে সব রোহিঙ্গা পরিচয় গোপন করে ভোটার হয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়েছিল, সেই পরিচয়পত্র দেখিয়েই সে সময় তাদের সন্তানরা ভোটার হয়ে যায়। ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রের একটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা থেকে নির্বাচন কমিশনকে জানানো হয়— বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভোটার তালিকায় বাংলাদেশে অবস্থানরত বিশাল  রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একটি উল্ল্যেখযোগ্য অংশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। স্থানীয় কিছু সুবিধাবাদী মহলের হীন স্বার্থে এবং প্রশাসনের কিছু অসত্ কর্মকর্তা/কর্মচারী অর্থের বিনিময়ে তাদের ভোটার করেছে। এদের দ্রুত ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়ার কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে রাষ্ট্রের জন্য বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তার আগে ছবিসহ ভোটার তালিকা  হালনাগাদ করার সময় ২০০৯ সালের ২ আগস্ট সশস্ত্রবাহিনী বিভাগ নির্বাচন কমিশনকে জানায়— বান্দরবন জেলার সদর, নাইক্ষাংছড়ি, আলীকদম ও লামা উপজলায়, কক্সবাজারের সদর, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলায় এবং রাংগামাটির কাপ্তাই ও বিলাইছড়ি উপজেলার ভোটার তালিকায় অনেক রোহিঙ্গাকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন তাদের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এ তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে। কমিটিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানদের সদস্য করা হয়। ওই কমিটির মাধ্যমে হালনাগাদ ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তদের তথ্য বিশেষ ফরমের মাধ্যমে নতুন করে যাচাই শুরু হয়। এ সব ভোটারদের বাবা, মা,  দাদা এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের ঠিকানাসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয় এবং ওই ৩ জেলার ১২টি উপজেলার তালিকা থেকে রোহিঙ্গা ও ভুয়া সন্দেহে মোট ৪৮  হাজার ৬৭৩ ভোটারের নাম বাদ দেয়া হয়। নির্বাচন কমিশন আগে চিহ্নিত পার্বত্য তিন জেলার জেলা ১৩টি উপজেলার সাথে কক্সবাজারের কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলাকেও অন্তর্ভুক্ত করে ভোটার হালনাগাদের সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে।