বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে ১০ লাখেরও বেশি নারী নতুন করে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। উন্নত দেশে প্রতি আট জনের মধ্যে একজন এ ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারেন। বাংলাদেশে এর সংখ্যা প্রতি দশজনে একজন।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ব্যতিক্রম কিছু উপসর্গ ছাড়া স্তন ক্যান্সার এখন আর কোন জীবনঘাতি রোগ নয়। স্তন ক্যান্সার নির্ণয় ও এর সঠিক চিকিৎসা রয়েছে বাংলাদেশে। এ চিকিৎসা ব্যবস্থা শুধু শহরেই নয়, ছড়িয়ে পড়েছে বিভাগীয় শহরসহ জেলা শহরেও। সচেতন হলে এ রোগ সম্পর্কে দুশ্চিন্তার কারণ নেই।
সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের নারীদের জন্য ৪৫ বছর বয়সটি স্তন ক্যান্সারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
নিজের সম্পর্কে উদাসীনতা, অজ্ঞতা, লজ্জা, সংকোচ, স্তন সম্পর্কে সঠিক তথ্যের ঘাটতি, সামাজিক অবস্থান ও নারী বৈষম্যের কারণে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি ক্রমশ: বাড়ছে। ফলে নিজের অজান্তে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া হাজার হাজার নারী প্রাণ হারাচ্ছেন।
গোপনাঙ্গকে চিকিৎসকের সামনে মেলে ধরতে সংকোচবোধ করা এবং সচেতনতার অভাবে নীরব ঘাতক স্তন ক্যান্সারের বীজ শরীরে বহন করে বেড়ান অনেক নারী। সে কারণে দেশে ঠিক স্তন ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা কতো তার সঠিক পরিসংখ্যান জানা যায় না।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের পর্যালোচনায় দেখা যায়, পরিবারের কারও স্তন ক্যান্সার থাকলে তাকে সতর্ক থাকতে হবে। এছাড়া যেসব মা তার শিশুকে বুকের দুধ পান করান না, বা যাদের সন্তান হয়নি, কিংবা মেনোপজের পর দীর্ঘদিন ধরে হরমোনের চিকিৎসা নিয়েছেন, তাদের স্তন ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। প্রাথমিক পর্যায়ে স্তন ক্যান্সার শনাক্ত করা গেলে তার প্রতিরোধ করা সম্ভব। এক্ষেত্রে সেলফ এক্সজামিনেশন বা নিজের মতো করে পরীক্ষা উল্লেখযোগ্য। মাসিক শেষ হবার কয়েকদিনের মধ্যে স্তন পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দু’হাত কোমরে রেখে দুইদিকের স্তনের আকার একরকম কিনা দেখতে হবে। স্তনের নিপল এক লাইনে আছে কিনা, স্তনের কোনো অংশের রং পরিবর্তন হচ্ছে কিনা, ডান হাত দিয়ে বাম স্তন বা বাঁ-হাত দিয়ে ডান স্তন ধরে শক্ত লাগছে কিনা দেখতে হবে। যদি শক্ত কিছু বিশেষ করে ছোট দানা বা সীমের বিচির মতো মনে হয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। এই পরীক্ষার সঙ্গে তিন বছর পর মেমোগ্রাফি করতে হবে।
চিকিৎসকদের মতে, স্তন ক্যান্সার হয়েছে কিনা এমন লক্ষণ নির্ণয় করলে ‘স্ক্রিনিং মেমোগ্রাম’ সহজ পদ্ধতির পরীক্ষা। স্তনের একটি বিশেষ ধরনের এক্সরে এটি। ফিল্ম স্ক্রিন ও ডিজিটাল মেমোগ্রাম -এ দু’ধরনের মেমোগ্রাম দ্রুত এবং প্রাথমিক পর্যায়ে স্তনের ক্যান্সার নির্ণয়ে কার্যকর। হাত দিয়ে স্তনে অনুভব করা যায় না-এমন প্রাথমিক পর্যায়ের ক্যান্সারও মেমোগ্রামের মাধ্যমে নির্ণয় করা সম্ভব।
৫০ থেকে ৫৯ বছর বয়সী নারীর প্রতি দু’বছর অন্তর একবার মেমোগ্রাম করা প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে স্তন ক্যান্সার পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।
কবি কাজী রোজী জানান, স্তন ক্যান্সার শনাক্ত করতে বা নিজে পরীক্ষা করার অভ্যাস তৈরি করাতে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। সংকোচ কাটিয়ে ঘরে আয়নার সামনে নিজের স্তনকে দেখতে হবে। স্তনের আকার ও রং পরিবর্তন বা নিপল থেকে রস বের হচ্ছে কিনা অথবা স্তনের কোনো জায়গায় চাকা বা দানা হয়েছে কিনা, তা নিজেকে জানার চেষ্টা করতে হবে।
তিনি নিজের স্তন ক্যান্সার শনাক্ত করার অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে বলেন, স্তনে সীমের দানার মতো পিণ্ড অনুভূত হওয়ায় দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই। পরবর্তীতে পরিবারের লোকজনের সাহস আর সাহচর্যে ভীতি কাটিয়ে উঠেছি। ক্যান্সার এমনই এক রোগ যা নিরাময়যোগ্য নয়। নিরাময় হয়েছে মনে করলে তা আবার শরীরের অন্যস্থানে দেখা দেয়।
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলেন, অন্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে কিশোরী মেয়েদের জীবনযাপন পদ্ধতি ও খাদ্যাভাসের কারণে স্তন ক্যান্সার হবার আশঙ্কা রয়েছে। মেয়েদেরকে সবুজ শাক-সবজি ও ফলমূল খেতে হবে। এছাড়া সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব।
তিনি জানান, স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ ও সচেতনতা বাড়াতে ২০১৩ সাল থেকে বছরে অক্টোবর মাসটি বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে প্রচারণা চালানো হয়।
ক্যান্সার সোসাইটির মহাসচিব অধ্যাপক শেখ গোলাম মুস্তফা জানান, স্তন ক্যান্সার নীরব ঘাতকের মতো। সচেতনতার অভাবে অনেকে এটি পরীক্ষা করান না। স্তন ক্যান্সার পরীক্ষায় নারীদের সচেতন হতে হবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক ডা. সাবেরা খাতুন বলেন, শহুরে নারীর মধ্যে স্তনপরীক্ষা করার প্রবণতা তৈরি হলেও গ্রামাঞ্চলের নারীরা এ বিষয়ে সচেতন নয়। এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে।
সম্প্রতি স্তন ক্যান্সার সচেতনতা দিবস উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, রাজধানীর মিরপুর দারুস সালামে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তায় ১ একর ৭৫ শতাংশ জমি ৯৯ বছরের জন্য লিজ নেয়া হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির উদ্যোগে ২৫০-শয্যাবিশিষ্ট ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে। ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী এবং তাদের সঙ্গে আত্মীয়-স্বজনও এখানে এসে থাকতে পারবেন। খবর বাসস
