বিমানে সোনা পাচার সিন্ডিকেট শনাক্ত

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০১৪, ০০:২৪

অবশেষে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে সক্রিয় সংঘবদ্ধ সোনা চোরাচালান সিন্ডিকেটের সন্ধান পেয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। এই সিন্ডিকেটে জড়িত অভিযোগে জাতীয় পাতাকাবাহী বিমানের চিফ ক্যাপ্টেন আবু মোহাম্মদ আসলাম শহীদসহ ৫ জনকে আটক করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মঙ্গলবার গভীর রাত থেকে গতকাল বুধবার ভোর পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। আটক অপর চার জন হলেন: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) এমদাদ হোসেন, ম্যানেজার (শিডিউল) তোজাম্মেল হোসেন, উত্তরার ফারহান মানি এক্সচেঞ্জের মালিক হারুন অর রশিদ এবং বিমানের ঠিকাদার মাহমুদুল হক পলাশ। ডিবি’র সিনিয়র সহকারী কমিশনার মিনহাজুর ইসলাম গতকালই আটককৃতদের আদালতে পাঠিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম এরফান উল্লাহ আটক ৫ জনের ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।  প্রসঙ্গত, গত ১৫ নভেম্বর ‘বিমানে সক্রিয় সংঘবদ্ধ চোরাচালান সিন্ডিকেট’ শিরোনামে দৈনিক ইত্তেফাকে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, আটককৃতরা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সোনা চোরাচালানের নিয়ন্ত্রক।  সোনা কিভাবে আসবে, কোথায় কে রিসিভ করবে এবং বিমান বন্দর থেকে কিভাবে বের হবে এসব তারাই ঠিক করে দিতেন। প্রায় দুই বছর ধরে শাহজালাল এবং চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় প্রতিদিনই সোনা চালান ধরা পড়লেও এই প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কাউকে গ্রেফতার করা হলো। শাহজালাল বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং ও কেবিন ক্রু’র দায়িত্বে থাকা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কারো সহযোগিতা ছাড়া এভাবে নিয়মিত সোনা চোরাচালান যে সম্ভব নয় এ সন্দেহ আগে থেকেই ছিল। কখনো যাত্রীদের ব্যাগে বা শরীরে লুকানো অবস্থায়, আবার কখনো উড়োজাহাজের টয়লেট বা আসনের নিচে পরিত্যক্ত অবস্থায় বিভিন্ন পরিমাণ সোনার বার পাওয়া গেছে। গত এক দশকে শাহজালাল বিমানবন্দরে বিমানের ১৫ জন কেবিন ক্রু চোরাচালানকৃত  সোনাসহ আটক হয়েছেন। গত ২৬ এপ্রিল দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজে ১০৬ কেজি সোনা পান বিমানবন্দরের শুল্ক কর্মকর্তারা। সর্বশেষ গত ১২ নভেম্বর একই বিমানবন্দরে দুই কেজির বেশি সোনাসহ আটক হন বিমানের স্টুয়ার্ড মাজহারুল আফসার রাসেল। ওইদিন দুবাই থেকে ঢাকাগামী বিমানের বিজি ০৪৬ নম্বর ফ্লাইটে তিনি স্টুয়ার্ডের দায়িত্ব পালন করেন।
রাজধানীর মিন্টো রোডে মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম কার্যালয়ে গতকাল এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ডিবি’র যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, কেবিন ক্রু মাজহারুল আফসারকে তিন দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই মঙ্গলবার রাতে অভিযান চালানো হয়। আটকরা কোনো না-কোনোভাবে সোনা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, মূলত দুবাই প্রবাসী বাংলাদেশী শফিউল আলম দুবাই থেকে চোরাচালানের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করেন। আর পলাশ এ কাজের সমন্বয় করতেন। অর্থ আদান-প্রদানের বিষয়টি দেখতেন হারুন অর রশিদ। বিদেশ থেকে আনা চালান নির্বিঘ্নে কাস্টমস পার করতে বিমানের ক্যাপ্টেন থেকে শুরু করে অন্যান্য পর্যায়ে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া হতো। তিনি আরো বলেন, শফিউল দুবাই থেকে সোনা কিনে বিমান কর্মকর্তাদের যোগসাজশে তা বাংলাদেশে পাঠাত। দুবাইয়ে সোনা কেনায় বিধি-নিষেধ নেই। এ কারণে সেখান থেকে সোনা চোরাইপথে বাংলাদেশে পাচার করা হয়। বাংলাদেশ রুট হিসেবে ব্যবহূত হয় এবং  সোনার মূল গন্তব্য থাকে আশেপাশের দেশগুলো।
মনিরুল ইসলাম বলেন, ঠিকাদার পলাশ বেশ প্রভাবশালী। তাকে আমরা ভোরে গ্রেফতার করি। এখনো তার সাথে কথা বলার সুযোগ হয়নি। আমাদের কাছে কিছু তথ্য আছে, আমরা সেগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখব। তিনি বলেন, বিমানবালা থেকে শুরু করে বিমানের বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজনের নাম এসেছে তাদের তদন্তে। পলাশের স্ত্রী বিমানের একজন জুনিয়র পার্সার। এই চক্রের সঙ্গে আরো কয়েকজন কেবিন ক্রু জড়িত রয়েছে বলে তথ্য আছে পুলিশের হাতে। তবে যাচাই-বাছাই করে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েই তাদের বিষয়ে পুলিশ ব্যবস্থা নিতে চায়।
বিমানবন্দর কাস্টমসের কেউ এতে জড়িত কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, এই চক্রের সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, বিমানবন্দরের শুল্ক বিভাগ কিংবা পুলিশ বাহিনীর যে-ই থাকুক, তদন্তে প্রমাণ মিললে তাকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে।

জানা গেছে, বিমানের ঠিকাদার মাহমুদুল হক পলাশের অবাধ বিচরণ ছিল বিমানবন্দর টার্মিনাল থেকে শুরু করে বোর্ডিং ব্রিজ পর্যন্ত। বিমানের পরিচালনা পর্ষদের একজন সদস্যের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সখ্যতা ছিল। পলাশের স্ত্রীকেও নজরদারির মধ্যে রেখেছে গোয়েন্দা পুলিশ।