সাগর পথে মানব পাচার থামছে না

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০১৪, ১১:২১

চোখে না দেখলে বিশ্বাস হয় না, এইভাবে মৃত্যু হাতে নিয়ে, মানুষ পালিয়ে ভাগ্য ফেরাতে যাচ্ছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উত্তাল সাগরে ট্রলারে করে পাড়ি জমাচ্ছে মালয়েশিয়ার পথে। বাংলাদেশিদের পাশাপাশি মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলিমরাও পাড়ি জমাচ্ছে এই অনিশ্চিত মৃত্যুপথযাত্রায়। গত ছয় বছরে টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্তসহ অন্যান্য কয়েকটি পথে তিন লক্ষাধিক মানুষ মালয়েশিয়ায় অবৈধ পথে পাড়ি জমিয়েছে। এ ব্যাপারে স্থানীয় থানায় মামলার পাহাড় জমেছে। কিন্তু শাস্তি না হওয়ায় মানবপাচারকারীরা দিন দিন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে তারা এই অবৈধ পাচার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। উপকূল দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এই মানবপাচার থামানো যাচ্ছে না কোনভাবেই।
স্থানীয় ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক গড়ে উঠা একশ্রেণির মানবপাচারকারী দালাল চক্রের হাত ধরে সোনার হরিণ ধরার নেশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন পাচার হচ্ছে মানুষ। বেসরকারি এনজিও সংস্থা ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্য মতে, গত ছয় বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানের তিন লক্ষাধিক মানুষ মালয়েশিয়ায় পাচার হয়েছে। মানব পাচারকারীদের জন্য টেকনাফ আর উখিয়া প্রধান রুট হিসাবে ব্যবহূত হচ্ছে। হেলপ কক্সবাজার-এর নির্বাহী পরিচালক ও মানবপাচার প্রতিরোধ কমিটির আহবায়ক এম এ কাশেম বলেন, উখিয়া থানায় এক জরিপে দেখা গেছে, ঐ এলাকা থেকেই গত দুই বছরে ৫০ হাজার মানুষ পাচার হয়েছে মালয়েশিয়ায়।
বাংলাদেশি নাগরিক এবং মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের মালয়েশিয়া পাচারের জন্য মানবপাচারকারীরা এ উপকূলকে ট্রানজিট হিসাবে ব্যবহার করে আসছে। আর পাচারকারী চক্রের সাথে কক্সবাজার জেলার কয়েক শত দালাল জড়িত রয়েছে। এর মধ্যে টেকনাফ উপজেলা থেকে শতাধিক ব্যক্তিকে পাচারকারী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে জানা গেছে। এদের মধ্যে ৩১ জনকে গডফাদার হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মানব পাচারকারী চক্রের প্রধানদের অনেকেই মিয়ানমারের নাগরিক। এরা কক্সবাজার, টেকনাফ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় অবস্থান করে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে মানবপাচার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এদের সাথে যুক্ত হয় স্থানীয় দালাল। এরা বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের অশিক্ষিত, অর্ধ শিক্ষিত, সহজ-সরল মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে সাগর পথে মালয়েশিয়া পাচার করে চলেছে। বাংলাদেশি নাগরিকদের সাথে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদেরও পাচার করা হয় এ রুট ব্যবহার করে।
অনেক ক্ষেত্রে মানব পাচারের শিকার এসব মানুষকে থাইল্যান্ড নিয়ে আটকে নির্যাতন চালানো হয়। পরে তাদের পরিবারের কাছ থেকে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা দাবি করা হয়। যারা নির্ধারিত সময়ে টাকা দিতে ব্যর্থ হয় তাদের ওপর চলে অমানবিক নির্যাতন। এ চক্রের খপ্পরে পড়ে অনেক বাবা-মায়ের কোল খালি হয়। এ ব্যাপারে শুধু উখিয়া থানাতেই ১৫৫ জন দালালের বিরুদ্ধে ৩১টি মামলা করা হয়েছে। ঐসব মামলায় ভিকটিম হিসাবে উদ্ধার করা ৩ শতাধিক লোকজনকে তাদের আত্মীয়-স্বজনের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে বলে পুলিশ জানালেও সন্তানহারা পরিবারের আহাজারি থামেনি।
এদিকে টেকনাফ থানায় মানব পাচারের ঘটনায় বিদেশি নাগরিকসহ ২৫০ জন দালালের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এর মধ্যে শতাধিক দালালকে আটক করা হয়। এসব ঘটনায় মানব পাচার আইনে ৫১টি মামলা করা হয়েছে। এর পরও বন্ধ হয়নি মানব পাচারের মত নিষ্ঠুর বাণিজ্য বরং দিন দিন বিভিন্ন পাচারের শিকার হচ্ছে বিভিন্ন জেলার লোকজন। এদের পাচারের কাজেও জড়িয়ে পড়ছে একটি স্থানীয় চক্র।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৮ সাল থেকে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় মানবপাচার শুরু হয়। কম টাকায় মালয়েশিয়া যাওয়ার সুযোগ পেয়ে সারা দেশ থেকে বিভিন্ন পেশার লোকজন দালালের মাধ্যমে উখিয়ার উপকূলে এসে ট্রলারযোগে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। এদের মধ্যে অনেকে মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের হাতে আটক হলেও অধিকাংশই পাচার হয়ে যাচ্ছে মালয়েশিয়ায়।
দালালরা অপ্রতিরোধ্য, রমরমা ব্যবসা
মানবপাচারকে কেন্দ্র করে টেকনাফে গড়ে উঠেছে কয়েকটি চক্র। এরা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা নিরীহ লোকদের নিজেদের জিম্মায় নিয়ে তাদের থেকে জনপ্রতি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা নিয়ে মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়া দালালদের হাতে তুলে দেয়। এসব দালাল পরে ট্রলার নিয়ন্ত্রণকারী দালালদের হাতে তুলে দেয়। রাজনৈতিক আশ্রয়ে এসব সিন্ডিকেট অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়েছে। অনেক সময় মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রের শিকার হচ্ছেন মালয়েশিয়া যেতে না চাওয়া লোকজনও। এক্ষেত্রে টেকনাফে কাজের সন্ধানে আসা ব্যক্তিদের জোরপূর্বক অপহরণ করে দালালদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। দালালরা তাদের নির্যাতন চালিয়ে জোরপূর্বক তুলে দেয় মালয়েশিয়াগামী ট্রলারে। পরে থাইল্যান্ড পৌঁছার পর পরিবারকে মুক্তিপণ দিয়ে উদ্ধার করতে হয়।
উখিয়া প্রতিনিধি জানান, মানবপাচারের রুট হিসাবে পরিচিত উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের বাদামতলী ঘাট, রেজুরমোহনা, ইনানী, চেপটখালী, মনখালী, মাদারবনিয়া, চোয়াংখালীসহ একাধিক ঘাট সংলগ্ন এলাকায় মানব পাচারকারীদের আস্তানায় যাত্রীদের  জড়ো করা হয়। পরে সুযোগ বুঝে রাতের আঁধারে ছোট ডিঙ্গি নৌকা দিয়ে গভীর সাগরে অপেক্ষমাণ ট্রলারে মাথাপিছু ১০ হাজার টাকা আদায় করে তুলে দেয়া হয়। মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের বন্দিশালায় আটকিয়ে যাত্রীদের দিয়ে স্ব স্ব পরিবারের কাছে মুঠোফোনের মাধ্যমে আদায় করা হয় দেড় থেকে ২ লাখেরও বেশি টাকা। যারা দালালদের চাহিদামত টাকা দিতে ব্যর্থ হয় তাদের মালয়েশিয়া পুলিশের নিকট সোপর্দ করে দেয়া হয় বলে মালয়েশিয়া থেকে ফিরে আসা মরিচ্যা গ্রামের নূরুল আবছার (১৮), সোনাইছড়ি গ্রামের কবির আহমদসহ (২২) একাধিক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন। তারা জানান, অভাবগ্রস্ত পরিবারের সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা মালয়েশিয়ায় যাত্রা করেছিলেন।
মালয়েশিয়ার একটি ব্যাংকে কর্মরত উখিয়ার দরগাহবিল গ্রামের মৃত আব্দুল মজিদ ফকিরের ছেলে কামাল হোসেন (২২) ফোনে জানান, বাংলাদেশ থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেকেই মালয়েশিয়া পৌঁছাতে পারলেও এদের বেশিরভাগই চাকরি পায়না। এরা একদিন কাজ করে পুলিশের ভয়ে সপ্তাহের অন্যান্য দিন বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপন করে দিন কাটায়।
টেকনাফ প্রতিনিধি জানান, এরা প্রথমে ওত্  পেতে থাকে টেকনাফ নতুন বাস টার্মিনাল, পুরাতন বাস স্টেশন ও লেঙ্গুর বিল সড়ক, সাবরাং ডেইল পাড়া, নয়াপাড়া বাজারসহ বিভিন্ন এলাকার মোড়ে মোড়ে। তবে টেকনাফ আসা বিভিন্ন যানবাহন পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গেই সিএনজি, মোটর সাইকেল ও মাইক্রোবাসে করে মালয়েশিয়াগামীদের নিজেদের জিম্মায় নিয়ে নেয়।
আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে মানব পাচারকারীরা প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছে। চিহ্নিত পাচারকারী হয়ে কীভাবে এরা এলাকায় ঘোরাফেরা করে বেড়াচ্ছে এ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হয়েছিল টেকনাফ মডেল থানার ওসি মোক্তার হোসেনের কাছে । তিনি জানান, মানব পাচার রোধে এলাকায় পুলিশের জোরদার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। যার কারণে আগের তুলনায় পাচার অনেকটা কমে গেছে।
বিজিবির ৪২ ব্যাটলিয়ান অধিনায়ক লেঃ কর্নেল মোঃ আবু জার আল জাহিদ জানান, মানব পাচার প্রতিরোধে সীমান্ত পয়েন্ট ও চেকপোস্টে  বিজিবি তত্পর রয়েছে। ইতিমধ্যে পাচার রোধে সাবরাং উপকূলের খুরের মুখ নামক স্থানে অস্থায়ী বিজিবি ক্যামপ স্থাপন করা হয়েছে। তাছাড়া মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান অব্যাহত রাখা হয়। এ বছরে শতাধিক দালালকে গ্রেফতার করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
দেশে ফিরে দুই যুবকের করুণ বর্ণনা
সাগর পথে মালয়েশিয়া যেতে ব্যর্থ হয়ে থাইল্যান্ডের কারাগার থেকে গত ১০ নভেম্বর দেশে ফিরে আসে উখিয়া উপজেলার থাইংখালী গৌজঘোনা গ্রামের জয়নাল আবেদীনের ছেলে নুরুল আবছার (১৮) ও থাইংখালী ঘোনার পাড়া গ্রামের মৃত মকবুল আহমদের ছেলে ছৈয়দ আলম (৩০)। নিজেদের করুণ অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তারা। তারা জানান, থাইংখালী গ্রামের মানবপাচারকারী সুমন ও আমান উল্লাহকে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে দিয়ে গত ৮ জানুয়ারি টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপের নয়াপাড়া ঘাট দিয়ে ট্রলার যোগে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন তারা। ট্রলারে তাদের মতো আরো ৩ শতাধিক যাত্রী ছিলো। সাগরে ১৩ দিন অনাহারে অর্ধাহারে থাকার পর তাদের থাইল্যান্ডের জঙ্গলে অবস্থিত দালালদের আস্তানায় আটকিয়ে রাখা হয়। সেখানে তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে মুঠোফোনের মাধ্যমে পরিবারের কাছ থেকে আরো ২ লাখ টাকা করে আদায় করে আস্তানা থেকে ছেড়ে দেয়া হয়। এসময় তারা থাইল্যান্ডের জঙ্গল দিয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হলে পথিমধ্যে থাইল্যান্ড পুলিশের হাতে তারা আটক হয়। ট্রলারের অন্য যাত্রীরাও আটক হয় থাইল্যান্ডের পুলিশের হাতে। নুরুল আবছার আরো জানান, তাদের থাইল্যান্ডের শঙ্কলা নামক কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ৬দিন আটকিয়ে রাখার পর থাইল্যান্ডের অপর একটি পাঙ্গা নামের কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই কারাগারে তাদের ৯ মাস আটকিয়ে রাখার পর বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে গত ১০ নভেম্বর তারা ২ জনসহ বগুড়া, চকরিয়া, কক্সবাজারের লিংকরোড, উখিয়ার কোটবাজারের আরো ৪৮ জন যাত্রী দেশে ফিরে আসে। তারা জানান, থাইল্যান্ডের কারাগারে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সহস্রাধিক বাংলাদেশি কারাভোগ করছে।