মুলতবি ছাড়া অব্যাহতভাবে সাক্ষ্য, জেরা ও যুক্তি-তর্কের ওপর শুনানি গ্রহণ এবং নির্ধারিত সময়ে রায় প্রদানের মাধ্যমে মামলা জট নিরসন করা সম্ভব। বিচারক স্বল্পতা থাকার পরেও ময়মনসিংহ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে এই বিষয়গুলো অনুসরণ করে গত তিন বছরে প্রায় ৫৭ হাজার মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এসব মামলা ২০ থেকে ৩০ বছর বা এর অধিক সময় পর্যন্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আদালতে পড়ে ছিলো। এভাবে উল্লেখযোগ্য হারে পুরাতন মামলা নিষ্পত্তির বিষয়টিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে আইন কমিশন।
ময়মনসিংহ জেলা আদালতের এই বিশাল সংখ্যক মামলা জট নিরসনের বিষয়টি জানতে পেরে ময়মনসিংহ জেলা আদালত পরিদর্শনের মাধ্যমে অনুসন্ধান করে আইন কমিশন। গত সেপ্টেম্বর মাসে কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক এবং দুই সদস্য বিচারপতি এটিএম ফজলে কবির ও অধ্যাপক এম শাহ আলম সরেজমিন ঐ জেলা আদালত পরিদর্শনে যান এবং বিচারক ও আইনজীবীদের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। পাশাপাশি আদালতের নকলখানা ও মহাফেজখানা পরিদর্শন করেন। পরে তারা ঢাকায় এসে একটি পর্যালোচনা প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। আইন কমিশনের ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিশন মনে করে, ময়মনসিংহ জেলা ও দায়রা জজ নুরুল হুদার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, জাজশিপের অন্য সকল বিচারকগণ ও আইনজীবীদের সহযোগিতা, দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিধি ও আদেশসমূহের যথাযথ অনুসরণের ফলে এই মামলা জট নিরসন সম্ভব হয়েছে। অধঃস্তন আদালতে অত্যন্ত অল্প সংখ্যক বিচারক থাকা সত্ত্বেও এই পদ্ধতি অনুসরণ করে সম্পূর্ণ না হলেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মামলা নিষ্পত্তি করে মামলার জট সহনীয় পর্যায়ে আনা সম্ভব। তাই সামগ্রিক বিবেচনায় ময়মনসিংহ আদালতের মামলা ব্যবস্থাপনার চলমান প্রক্রিয়া উত্সাহব্যঞ্জক এবং সকল জেলার ক্ষেত্রে অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে।
গত তিন বছরে ময়মনসিংহ আদালতে বিভিন্ন প্রকার (ফৌজদারি ও দেওয়ানি) সর্বমোট ৫৬ হাজার ৮২৫টি মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে। ময়মনসিংহ জেলা ও দায়রা জজ নুরুল হুদা তার ২৩ জন সহকর্মীকে নিয়ে মামলা জটের পেছনের কারণসমূহ চিহ্নিত করে তা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেন। যেখানে মামলা জট বছরের পর বছর বেড়েই চলছে সেখানে একটি জেলা জাজশিপে বিগত তিন বছরে এত অধিক সংখ্যক মামলা নিষ্পত্তির খবর ইতিবাচক বলে মনে করে কমিশন।
ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্য যে কোন জেলার মত ময়মনসিংহ জেলাতেও বহু অনিষ্পত্তিকৃত মামলার জট প্রকট আকার ধারণ করেছিল। এমনকি ১৯৬৮ সালের ৪৭ বছরের পুরানো একটি মামলাসহ ২০/৩০ বছরের পুরানো বহু সংখ্যক মামলা বিচারাধীন ছিল। এমতাবস্থায়, জেলা জজ ২০০৫ সালের পূর্বের সকল মামলা জরুরি ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করার লক্ষ্যে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। পদক্ষেপসমূহের মধ্যে প্রথমত, জেলা ও দায়রা জজ ২০০৫ সাল পর্যন্ত ময়মনসিংহ জেলার সকল আদালতসমূহে বিচারাধীন সকল দেওয়ানি মামলা তালিকাভুক্ত করেন। তালিকাভুক্তির পর প্রথমেই ৪৭ বছরের পুরানো মামলাসহ ৩৬৩টি অতি পুরানো মামলা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এই পদক্ষেপ নিতে জেলা জজ ময়মনসিংহ জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্যদের সহায়তা কামনা করেন ময়মনসিংহ জেলা ও দায়রা জজ নুরুল হুদা। তিনি আইনজীবীদের বোঝাতে সক্ষম হন, অতি পুরাতন এতগুলো অনিষ্পত্তিকৃত মামলা আইনজীবী বা বিচারক কারোই সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করে না। বরং ঐ মামলাগুলো নিষ্পত্তি হলে জনসাধারণ উপকৃত হবে এবং উভয়পক্ষেরই সম্মান বৃদ্ধি পাবে। তিনি সহকর্মী বিচারকগণকেও এই বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হন। অতঃপর বিভিন্ন বিচারকগণ ও আইনজীবীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ২০০৫ সাল পর্যন্ত প্রায় সকল মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, জেলা জজের প্রচেষ্টায় ময়মনসিংহ জেলা আদালতের মহাফেজখানার আধুনিকীকরণ করা হয়েছে। মহাফেজখানার সকল রেজিস্ট্রার, ক্যাটালগ, সি.এস. খতিয়ান বই, ইনডেক্সসহ সুন্দর করে বাধাই অবস্থায় র্যাকে পরিপাটিভাবে সাজানো রয়েছে। যার ফলে মহাফেজখানা হতে কোন নথি তলব দেয়া হলে সংশ্লিষ্ট আদালতে তাত্ক্ষণিকভাবে তলবকৃত নথি বা রেজিস্ট্রার পাঠানো সম্ভব হয়। এছাড়া প্রায়ই দেখা যায় আদালতের রায় ও আদেশের সার্টিফায়েড কপি পেতে মামলার পক্ষগণের নাভিশ্বাস উঠে যায়। এর পেছনে নকলকারীর অপ্রতুলতা, টাইপ মেশিন/কম্পিউটারের অপ্রতুলতা ও দুর্নীতির কারণ হতে পারে। কিন্তু এই জেলা জজ আদালতে রায় বা আদেশের সার্টিফায়েড কপি প্রস্তুত হওয়া মাত্র নোটিস বোর্ডে তা জানিয়ে দেয়া হচ্ছে। এর ফলে কোন নকল কখন প্রস্তুত হচ্ছে এবং না হলে কেন প্রস্তুত হচ্ছে না সংশ্লিষ্ট নকলখানার ভারপ্রাপ্ত বিচারক সঙ্গে সঙ্গে অবহিত হচ্ছেন। বিষয়টি তিনি অবহিত হওয়ার পর এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ায় নকল প্রদানের দীর্ঘসূত্রতা দূর হয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে ময়মনসিংহ জেলা জাজশিপের একটি বিরাট সাফল্য।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মামলা দায়ের করার পর প্রথম সমস্যা হলো মামলার সমন/নোটিস বিবাদিগণের প্রতি যথারীতি জারি করা। আপাত দৃষ্টিতে এটি সহজ মনে হলেও কার্যক্ষেত্রে এটি মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করে এবং মামলার সাধারণ কার্যক্রম পরিচালনায় বিশেষ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট জাজশিপে সমন জারির ব্যাপারে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ প্রদান, উদ্বুদ্ধ ও মনোযোগী করে এইরূপ জারি হালনাগাদ করা সম্ভব হয়েছে। এটি সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য একটি বড় কৃতিত্ব।
এছাড়া ময়মনসিংহ জাজশিপের বিভিন্ন নথি পরীক্ষা করে আইন কমিশনের সদস্যরা। পরীক্ষাকালে দেখা যায়, একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক স্থগিতাদেশ থাকায় মামলার কার্যক্রম সুদীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ রয়েছে। ফলশ্রুতিতে ন্যায়বিচার প্রার্থীর অন্তত একপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কমিশন স্থগিত মামলার একটি তালিকা সংগ্রহ করেছে। এতে দেখা যায় যে, উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ থাকায় দেওয়ানি ১৬৩, ফৌজদারি ৪৬টি মামলার বিচার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে কিছু সংখ্যক মামলার ওপর ১৯৬০ সাল থেকে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ রয়েছে।
কমিশন মনে করে, ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই হাইকোর্ট রুল ও স্থগিতাদেশ প্রদান করে। কিন্তু এর ফলে মামলা নিষ্পত্তিতেই যদি বিলম্ব ঘটে তা হলে ন্যায় বিচারই ব্যাহত হয়। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে।
