চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে টেস্টে দর্শক স্বল্পতা নিয়ে একটু আফসোস ছিল। গতকাল সব আফসোস ঘুচে গেল। দুপুর গড়াতে না গড়াতেই মানুষের ঢল। খেলা শুরু হতেই একেবারে কানায় কানায় পূর্ণ স্টেডিয়াম। ফ্লাড লাইটের আলোয়, কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে এই হাজার হাজার মানুষের গর্জনই পারে যুদ্ধ করতে আসা যোদ্ধাদের বুক কাঁপিয়ে দিতে।
এই গর্জনরত মানুষের সঙ্গে সুর মেলালেন ক্রিকেটাররাও; বলা ভালো মূলত সাকিব আল হাসান। সাকিব, ক্রিকেট দল আর হাজারো মানুষের এই গর্জনে জিম্বাবুয়ে থেকে আসা যোদ্ধাদের শুধু বুক কেঁপে গেল না; পেছাতে পেছাতে খাদেই পড়ে গেল তারা। টেস্ট সিরিজের মতো ওয়ানডে সিরিজও বাংলাদেশ শুরু করলো অসামান্য এক জয় দিয়ে।
পাঁচ ম্যাচ সিরিজের প্রথম ম্যাচে গতকাল সাকিব আল হাসানের সেঞ্চুরি ও ৪১ রানে ৪ উইকেটে ভর করে জিম্বাবুয়েকে ৮৭ রানে হারালো বাংলাদেশ। ফলে ১-০ ব্যবধানে লিড নিয়েই শুরুটা হল ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজার।
সিরিজের এই প্রথম ম্যাচটি ছিল যথারীতি সাকিবময়। তারই ১০১ রানে ভর করে বাংলাদেশ ৫০ ওভারে তুললো ২৮১ রান। আবার জিম্বাবুয়েকে ৪২.১ ওভারে ১৯৪ রানে গুঁড়িয়ে দেয়ার পথে বিশ্বের ১২তম ক্রিকেটার হিসেবে সেঞ্চুরির পাশাপাশি ৪ উইকেটও তুলে নিলেন।
সাকিবের শুরুটা ব্যাটিং থেকেই। উইকেটে এসেছিলেন দলের আরেকটি বিপর্যয়ের সময়।
পানায়াঙ্গারা ও চাতারার তোপে ১১.৪ ওভারে বাংলাদেশ মাত্র ৩১ রান তুলতে হারিয়ে ফেলেছে ৩ উইকেট। তামিম, এনামুল ও মাহমুদউল্লাহ না পারলেন রানের চাকা ঘোরাতে, না পারলেন উইকেট রক্ষা করতে। সাকিব এসে মুমিনুল হককে নিয়ে প্রথম বাধটা দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। দু’জনে চতুর্থ উইকেটে ৩৯ রান যোগ করলেন। এরপর মুমিনুল অযথা এক স্কুপ প্যাডেল করতে গিয়ে ৩১ রান করে ফিরে গেলেন। আর সেখান থেকেই কাব্যিক এক প্রতিরোধ ও প্রতিআক্রমণ শুরু করলেন সাকিব ও মুশফিক।
সাকিব-মুশফিক পঞ্চম উইকেটে ১৪৮ রান। বলাই বাহুল্য এই উইকেট জুটিতে এটাই বাংলাদেশের এখন সর্বোচ্চ রান। এই রেকর্ড করার পথে তারা টপকে গেলেন ২০০৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে রকিবুলের সঙ্গে এই সাকিবেরই করা ১১৯ রানের জুটি। মজার ব্যাপার হল পঞ্চম উইকেটে বাংলাদেশের সেরা পাঁচটি জুটির চারটিতেই অংশীদার এই সাকিব।
শুরু থেকে আক্রমণাত্মক মেজাজে খেলতে থাকা সাকিব ৫৭ বলে পৌঁছে গেলেন ফিফটিতে। ফিফটির পর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠলেন সাকিব। দ্বিতীয় ফিফটিতে পৌঁছাতে সময় নিলেন আর মাত্র ৩৮ বল। তাও একেবারে ৯৮ রানে এসে একটু থমকে না গেলে আরও কম বলে হতে পারতো ব্যাপারটা। শেষ পর্যন্ত ৯৫ বলে পৌঁছে গেলেন নিজের ষষ্ঠ সেঞ্চুরিতে।
এটাও বলার অপেক্ষা রাখে না যে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সেঞ্চুরি সংখ্যাও এই সাকিবের, ৬টি। সাকিব আসলে এর আগে থেকেই ৫ সেঞ্চুরি নিয়ে তালিকার শীর্ষে ছিলেন। তবে এই সেঞ্চুরিটা এলো একটু বড় বিরতি দিয়েই। ২০০৭ সাল থেকে ২০১০ সাল অবধি সেঞ্চুরি ছিল ৫টি। সেই সাকিবই গত চার বছরে কোনো ওয়ানডে সেঞ্চুরি করতে পারেননি। সেঞ্চুরির পর একটু বৈচিত্র্যময় উদযাপন করেই বুঝিয়ে দিলেন সেঞ্চুরিটা তার জন্য কতোটা অপেক্ষার ব্যাপার ছিল।
তবে শেষ পর্যন্ত সেঞ্চুরির পরপরই আউট হয়ে গেছেন ৯৯ বলে ১০টি চারে সাজানো ১০১ রান করে। ততক্ষণে বাংলাদেশ পেয়ে গেছে শক্ত এক ভিত। সাকিব সেঞ্চুরি করার একটু আগেই ফিফটিতে পৌছে গেলেন মুশফিক। বেশ কিছু জীবন পেয়ে করা এই ফিফটি শেষ পর্যন্ত ৬৫ রানে গিয়ে থামে।
সাকিব-মুশফিকের পর বাংলাদেশকে বড় পুঁজিতে পৌঁছানোর দায়িত্বটা নেন অভিষিক্ত সাব্বির রহমান রুম্মন। সাব্বির যখন উইকেটে আসেন তখন বাংলাদেশের সংগ্রহ ৪৩.২ ওভারে ৫ উইকেটে ২১৮। এই সময়েও রানের চাকা ঘোরাচ্ছিলেন মুশফিক। মুশফিক যখন আউট হয়ে গেলেন, তখন খেলার বাকি আর ২.৪ ওভার; রান ২৪৬। এই বাকিটা সময়ই পাগল বানিয়ে ফেললেন সাব্বির। শেষ ওভারে তিন বলে ১৬ রানসহ মোট ২৫ বলে খেললেন ৪২ রানের দানবীয় এক ইনিংস; যাতে ৩টি চার ও ৩টি ছক্কা।
এই রানটাকেও জিম্বাবুয়ের ব্যাটিংয়ের শুরুতে যথেষ্ঠ বলে মনে হচ্ছিল না। আবার সেই মনে করানোর কাজটা করতে হাজির সাকিব। সিকান্দার রাজা ও মাসাকাদজা যখন কোনো বোলারকেই স্থিতিশীল হতে দিচ্ছিলেন না; তখনই আক্রমণে এসে অসাধারণ এক ফ্লাইটে বোকা বানিয়ে স্ট্যাম্পিংয়ের শিকার করে ফেরালেন সিকান্দারকে। এক বল পরেই তুলে নিলেন সিবান্দার উইকেট।
এরপর মাহমুদউল্লাহ এসে মাসাকাদজা ও চাকাভার উইকেট তুলে নিলেন। আর সিরিজে প্রথমবারের মতো ফিফটির দেখা পাওয়া টেলরকে মুশফিকের অসাধারণ এক ক্যাচে পরিণত করে জিম্বাবুয়ের মেরুদণ্ডটা গুড়িয়ে দিলেন অধিনায়ক মাশরাফি স্বয়ং।
এক ওভার পর আবার আঘাত হানলেন মাশরাফি। এবার প্রতিপক্ষ অধিনায়ক চিগুম্বুরাকে তুলে নিলেন তিনি। তারপর উইকেট শিকারের এই মিছিলে যোগ দিলেন আরাফাত সানিও; তিনি ফেরালেন পানায়াঙ্গারাকে। কিন্তু গল্প এখানেই শেষ হলে চলবে কেন? সাকিবের গল্প যে তখনও বাকি।
তৃতীয় স্পেলে বল করতে এসে প্রথমে সলোমন মায়ার, এরপর নিয়ুম্বুকে নিয়ে চতুর্থ উইকেট শিকার সম্পন্ন করলেন। মাঠ জুড়ে তখন টেনশন– সাকিব পঞ্চম উইকেট পাবেন তো!
শেষ পর্যন্ত নিয়তি সে মাইলফলক পূর্ণ হতে দিলো না। মাশরাফি ছয় জন ফিল্ডার কাছে এনে সাকিবের শেষ ওভারে চেষ্টা করলেন। শেষ পর্যন্ত অল্পের জন্য সেঞ্চুরি ও ৫ উইকেট না হওয়ার আফসোসটা থেকেই গেল। থাকুক না আফসোস। আফসোস ঘোচানোর জন্য সাকিব তো আছেনই।
স্কোরকার্ড
বাংলাদেশ
রান বল চার ছক্কা
তামিম ব পানিয়াঙ্গারা ৫ ১৫ ১ ০
এনামুল ক চিগুম্বুরা ব চাতারা ১২ ২৯ ০ ১
মমিনুল ব নিয়ুম্বু ৩১ ৪৬ ২ ০
মাহমুদুল্লাহ ক কামুনজজি ব চাতারা ১ ৯ ০ ০
সাকিব ক পানিয়াঙ্গারা ব কামুনজজি ১০১ ৯৯ ১০ ০
মুশফিক ক মায়ার ব পানিয়াঙ্গারা ৬৫ ৭২ ২ ২
সাব্বির অপরাজিত ৪৪ ২৫ ৩ ৩
মাশরাফি ব পানিয়াঙ্গারা ১ ৬ ০ ০
আরাফাত অপরাজিত ১ ১ ০ ০
অতিরিক্ত: (লেবা ১, ওয়া ১৭, নো ২) ২০
মোট: (৫০ ওভারে ৭ উইকেটে) ২৮১
উইকেট পতন: ১-৮ (তামিম), ২-২৬ (এনামুল), ৩-৩১ (মাহমুদুল্লা), ৪-৭০ (মোমিনুল), ৫-২১৮ (সাকিব), ৬-২৪৬ (মুশফিক), ৭-২৬৪ (মাশরাফি)।
বোলিং: পানিয়াঙ্গারা ১০-১-৬৬-৩, চাতারা ১০-১-৪৮-২, চিগুম্বুরা ৮-০-৩৭-০, মিরে ৪-০-২২-০, নিয়ুম্বু ৭-০-৪০-১, মাসাকাদজা ১-০-৮-০, কামুনজজি ৮-০-৪০-১, সিকান্দার ২-০-১৯-০।
জিম্বাবুয়ে
রান বল চার ছক্কা
মাসাকাদজা এলবিডব্লিউ মাহমুদুল্লাহ ৪২ ৪৮ ৭ ০
সিকান্দার স্টাঃ মুশফিক ব সাকিব ১৫ ২২ ১ ০
সিবান্দা ব রুবেল ব সাকিব ০ ২ ০ ০
টেলর ক মুশফিক ব মাশরাফি ৫৪ ৭২ ৪ ১
চাকাভা ব মাহমুদুল্লাহ ৯ ১৭ ০ ০
চিগুম্বুরা ক সাব্বির ব মাশরাফি ১৫ ২৮ ০ ০
মায়ার ব সাকিব ১১ ১৮ ০ ১
পানিয়াঙ্গারা ব আরাফাত সানি ৭ ৯ ১ ০
নিয়ুম্বু ক মাহমুদুল্লা ব সাকিব ৪ ৯ ০ ০
চাতারা ব আরাফাত সানি ১০ ২০ ১ ০
কামুনগোজি অপরাজিত ১২ ৮ ৩ ০
অতিরিক্ত (লেবা ৬, ওয়াইড ৯) ১৫
মোট: ৪২.১ ওভারে অলআউট) ১৯৪
উইকেট পতন: ১-৪৭ (সিকান্দার), ২-৪৭ (সিবান্দা), ৩-৯২ (মাসাকাদজা), ৪-১২৪ (চাকাভা), ৫-১৪৬ (টেলর), ৬-১৫৩ (চিগুম্বুরা), ৭-১৬৮ (মায়ার), ৮-১৭০ (পানিয়াঙ্গারা), ৯-১৮০ (নিয়ুম্বু), ১০-১৯৪ (চাতারা)।
বোলিং: মাশরাফি ৬-১-৩৩-২, আল আমিন ২-০-২১-০, আরাফাত ৯.১-২-২২-২, সাকিব ১০-০-৪১-৪, মোমিনুল ১-০-১১-০, রুবেল ৩-০-১৪-০, মাহমুদুল্লা ১০-০-৪০-২, সাব্বির ১-০-৬-০।
