দল ও জোট নেতাদের ওপর ভরসা নেই খালেদা জিয়ার

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০১৪, ১০:০২

সরকারবিরোধী আন্দোলনে যাওয়ার জন্য নিজ দল ও জোট নেতাদের ওপরই ভরসা রাখতে পারছেন না বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ভবিষ্যতে কর্মসূচি ঘোষণা করা হলেও দলীয় নেতারা রাজপথে সক্রিয় থাকবেন এরকম আস্থা পাচ্ছেন না তিনি। চলতি মাসেই দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি, ভাইস-চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা পরিষদ ও ঢাকা মহানগর বিএনপি নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি তার এই অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন। ভরসাসংকট কাটাতে নিজ দলের পর আজ শনিবার তিনি বসছেন ২০ দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন জেলায় জোটের জনসভা, দলের ঢাকা মহানগরীসহ অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনগুলোকে গুছানো এবং শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষে আসছে জানুয়ারিতে বর্তমান সরকারবিরোধী আন্দোলনে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে খালেদা জিয়ার। কিন্তু কর্মসূচি ঘোষণা করা হলেও সেগুলো সফলে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা সক্রিয় ভূমিকা রাখবেন-এখনও এমন বিশ্বাস ফিরে পাননি তিনি। পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে, বিশেষ করে ২৯ ডিসেম্বরের ‘রোড টু ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচি শতভাগ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ায় দলীয় নেতাদের বিষয়ে আস্থা সংকটে পড়েছেন তিনি। বর্তমান সরকারের গত প্রায় ১১ মাসেও দু’একটি হরতালসহ দলের ছোটখাট কর্মসূচিতেও নেতারা রাজপথে না নামায় প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন তিনি।
গত ১৩ নভেম্বর দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকে বলেছেন, ‘আপনারা শুধু আমাকে বলেন-কর্মসূচি দিন, কর্মসূচি দিন। কিন্তু কর্মসূচি দিয়ে কী হবে! আপনারা তো কেউ রাস্তায় নামেন না। জানি এবারও কেউ নামবেন না। আপনারা না নামলেও আমি একাই এবার রাস্তায় নামবো।’ এরপর ১৬ নভেম্বর ঢাকা মহানগর নেতাদের সঙ্গে বৈঠকেও খালেদা জিয়া নিজের অসন্তোষের কথা জানান দিয়ে বলেছেন, ‘আপনারা তো সবাই গা বাঁচিয়ে চলেন, মামলা-হামলার ভয়ে কেউ রাস্তায় নামেন না। হরতাল দিয়ে ঘরে বসে থাকেন। আগের কমিটি ভালো কাজ করেনি বলে নতুন কমিটি করলাম। কিন্তু কী লাভ হলো। এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ কমিটি পর্যন্ত করতে পারেননি। আপনাদের দিয়ে কী হবে!’ জানা গেছে, দলের ভাইস-চেয়ারম্যান ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের প্রতিও প্রায় অভিন্ন ভাষায়  ক্ষোভ ঝেড়েছেন দলীয় প্রধান।
খালেদা জিয়ার এই অসন্তোষের বিষয়ে ঢাকা মহানগর বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক আবদুল আউয়াল মিন্টু ইত্তেফাককে বলেন, ‘পত্রপত্রিকায় যেভাবে বলা হচ্ছে, বিষয়টি পুরোপুরি ঠিক নয়। কিন্তু একথা তো ঠিক আমরা নির্ধারিত সময়ে মহানগরের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারিনি। আমরা চেষ্টা করছি। সামনের আন্দোলনের জন্য মহানগরকে প্রস্তুত করতে নানা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।’
বিএনপি চেয়ারপারসনের ক্ষোভের পর কিছুটা নড়েচড়ে উঠেছেন দলটির নেতারা। এর ইঙ্গিত মেলে দলের শীর্ষ কয়েক নেতার গত কয়েকদিনের বক্তব্যে। ১৮ নভেম্বর এক অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘এ সরকারকে বিদায় করতে হলে আন্দোলনের বিকল্প নেই। যদিও সরকার প্রতিবাদের সকল পথ আটকে রেখেছে, তবুও এবার আর হামলা-মামলা দিয়ে আন্দোলন স্তব্ধ করা যাবে না। আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আমাদের সামনে আন্দোলন ছাড়া গত্যন্তর নেই।’
১৯ নভেম্বর এক অনুষ্ঠানে ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মির্জা আব্বাসও বলেছেন, ‘সামনে আন্দোলন আসছে। আমাদের নেতা-কর্মীরা এবার গুলি বুকে নিতে প্রস্তুত। দেখব সরকারের কাছে কত গুলি আছে।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘স্থায়ী কমিটির বৈঠকে চেয়ারপারসন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি আমাদের বলেছেন, এবার আর ঢিমেতালে চলার উপায় নেই। যখনই কর্মসূচি দেবো, সবাইকে রাজপথে নামতে হবে। দরকার হলে আমিও নামবো। যারা নামবেন না, তারা এখনই পদ-পদবি ছেড়ে দিন। যারা রাস্তায় নামবে তাদেরকে জায়গা করে দিন। আমি আর কোনো অজুহাত শুনতে চাই না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ‘বিএনপির বক্তব্য ও কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে সম্ভবত দলটির নেতা-কর্মী-সমর্থকরাও যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না। যেমনটি পাচ্ছেন না দেশের মানুষ। তাছাড়া পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি যে ধরনের আন্দোলন করেছে, যতদূর জানি বা শুনেছি-সে ব্যাপারেও দলটির ভেতরেই মতপার্থক্য রয়েছে। সুতরাং দলের অভ্যন্তরে আস্থাসংকট কাটাতে হলে আগে এই বিষয়গুলো ভেবে দেখতে হবে।’
এদিকে, দলীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে খালেদা জিয়ার এসব বক্তব্যকে বিএনপির ‘দুর্বলতা’ হিসেবে দেখছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ গত ১৬ নভেম্বর জাতীয় সংসদে বলেছেন, ‘খালেদা জিয়া প্রয়োজনে একাই আন্দোলন করবেন বলছেন। এতে প্রমাণ হলো-তিনি একা হয়ে গেছেন, তার সঙ্গে কেউ নেই। দলের নেতারাও তার সঙ্গে নেই।’
দলীয় নেতাদের প্রতি ভরসাসংকটের কথা জানানোর পর খালেদা জিয়া আজ রাত সাড়ে ৮টায় বৈঠকে বসছেন ২০ দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে। এর আগে ৩০ সেপ্টেম্বর জোটের সর্বশেষ বৈঠকেও খালেদা জিয়া জোটের কার্যক্রমে একরকম হতাশা ব্যক্ত করেন। জোটের একাধিক শরিক দলের নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৩০ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে খালেদা জিয়া তাদের বলেছেন, ‘শুধু বৈঠক করলে হবে না। আপনাদেরও আরও সক্রিয় হতে হবে। আপনাদের মধ্যে কেউ কেউ সরকারের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন। সেই খবর আমার কাছে আছে।’ জানা গেছে, আজকের বৈঠকের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়া কার্যত: জোট নেতাদেরও সতর্ক করে সামনের আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার অনুরোধ জানাবেন।