দুর্নীতি ও নাশকতাসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন স্থানীয় সরকারের তিনটি স্তরের জনপ্রতিনিধিরা। নাশকতার মতো ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন সরকার বিরোধী পক্ষের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। তবে দুর্নীতিতে সরকার দলীয় ও বিরোধী উভয়পক্ষের জনপ্রতিনিধিরা রয়েছেন।
জানা যায়, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদ-স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই তিনটি স্তরের ১৯৪ জন নির্বাচিত প্রতিনিধির বিরুদ্ধে নাশকতা অথবা দুর্নীতি কিংবা উভয় ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। ফলে আলাদা আলাদাভাবে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত বা অপসারণ করা হয়েছে। যদিও এদের অধিকাংশই উচ্চ আদালত থেকে আদেশ নিয়ে নিজ নিজ পদে বহাল আছেন।
গত প্রায় ছয় বছরে দেশের ১৪৭ জন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এর মধ্যে ৩৭ জনকে অপসারণ করা হয়। তবে ইউপি সদস্যদের ধরলে এ সংখ্যা আরো বাড়বে। কমিশনার বাদে ১৩ জন পৌর মেয়রকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ৩৪ জন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
তথ্য অনুসন্ধানে দেখা যায়, জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্ত করা, আবার উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্বপদে ফিরে আসা নিয়ে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। যেসব জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে নাশকতার অভিযোগ এনে তাদের বরখাস্ত করা হয়েছে বা হচ্ছে তারা অভিযোগ করেছেন, বিএনপি বা জামায়াতের সমর্থক হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বা হচ্ছে। দুর্নীতির অভিযোগে বরখাস্তদের তালিকায় অবশ্য সরকারি ও বিরোধী দলের সমর্থকরাও রয়েছেন।
‘রাজনৈতিক’ কারণে বরখাস্ত করা হচ্ছে—এই বক্তব্য উপস্থাপন করে অনেকেই উচ্চ আদালতের সহায়তা চেয়ে প্রতিকার পাচ্ছেন। আবার অনেকে মৌলিক অধিকার সুরক্ষার তাগিদ তুলে ধরে হাইকোর্টে সাময়িক প্রতিকার পাচ্ছেন।
স্থানীয় সরকার বিভাগ অবশ্য এসব যুক্তি মানতে নারাজ। এ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, সরকারের আইন কর্মকর্তাদের কাছে থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা তারা পাচ্ছেন না। ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট একজন ঊর্ধতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলছেন, স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) এবং স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ) আইন মন্ত্রণালয় যথাযথ তদন্ত, আত্মপক্ষ শুনানির মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে। এক্ষেত্রে মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার কোন সুযোগ নেই। তার মতে, নির্বাচিত হলেই কি কারো বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অন্যান্য অপরাধের শাস্তি দেয়া যাবে না? তবে কেনো অধিকাংশ মামলার স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে সরকার আপিল করছে না সে বিষয়ে সদুত্তর মেলেনি।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এ প্রসঙ্গে বলছেন, বিএনপি-জামায়াত সমর্থক হওয়ার কারণে অনেককে বরখাস্ত করা হচ্ছে এই অভিযোগ ঠিক হতে পারে; কিন্তু কোন জনপ্রতিনিধির রাষ্ট্রবিরোধী নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার বিষয়টি সমর্থনযোগ্য নয়। বিশিষ্ট এই নাগরিকেরও অভিযোগ অনেকেই নাশকতামূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছেন।
ড. মজুমদার বলেন, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতির বিস্তার হচ্ছে এটাও ঠিক। এটি ঠেকাতে হলে যথাযথ তদারকি থাকতে হবে। দলীয়ভাবে না হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যেহেতু দলীয় প্রভাব থাকে তাই সকলের উচিত ভাল মানুষকে সমর্থন দেয়া।
বর্তমান উপজেলা পরিষদের যেসব চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানকে বরখাস্ত করা হয়েছে তারা হলেন রাজশাহীর চারঘাটের আবু সাইদ চাঁদ, কক্সবাজারের উখিয়ার সারওয়ার জাহান চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান সোলতান মাহমুদ চৌধুরী, গাইবান্দা সদরের চেয়ারম্যান আব্দুল করিম, বগুড়ার নন্দিগ্রামের নুরুল ইসলাম, গাইবান্দার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান মাজেদুর রহমান ও একই উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান আবু সোলায়মান।
যেসব পৌরমেয়রকে বরখাস্ত করা হয়েছে তাদের মধ্যে আছেন হবিগঞ্জের আজমেরিগঞ্জের গোলাম ফারুক, বরগুনার পাথরঘাটার মল্লিক মো. আইয়ুব, টাঙ্গাইল মধুপুরের শহিদুল ইসলাম, ফরিদপুরের নগরকান্দার এমএ জাহিদ, নাটোরের নলডাঙ্গার আব্বাস আলী, রাজশাহীর ভবানীগঞ্জের আব্দুর রাজ্জাক, নাটোরের নলছিটির মজিবর রহমান, সিলেট বিয়ানীবাজারের তফজ্জল হোসেন, চট্টগ্রামের রাউজানের কাজী আব্দুল্লাহ আল হাসান, মেহেরপুরের গাংনীর আহম্মদ আলী, গাইবান্দার সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার নুরুন্নবী প্রামাণিক। এসব মেয়র বা প্রশাসকের কারো কারো বিরুদ্ধে অনাস্থা, ফৌজদারি অপরাধের মামলাও রয়েছে।
গত ২ জানুয়ারি থেকে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত লোকাল গভর্নমেন্ট সাপোর্ট প্রকল্পের অর্থ আত্মসাত্, নানা অনিয়ম ও নাশকতার অভিযোগে ৩৩ জন ইউপি চেয়ারম্যানকে বরখাস্ত, অপসারণ করা হয়। এদের মধ্যে আছেন মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া ইউপির মনসুর আহমেদ খান, সাতক্ষীরা তালার ধানদিয়ার মোজাম্মেল হোসেন, জকিগঞ্জ উপজেলার বারহাল ইউপির মিছবাহ জামান, সুনামগঞ্জ জগন্নাথপুর উপজেলার রানীগঞ্জ ইউপির কাওছাউর উদ্দিন, সাতক্ষীরা সদরের বৈকারীর শহীদ হাসান, চন্দনাইশের হাসিমপুর ইউপির আইয়ুব আলী, টঙ্গিবাড়ীর বানারী ইউপির মো. নুরুজ্জামান, কোটালীপাড়ার কান্দী ইউপির উত্তম কুমার বাড়ৈ, হাজীগঞ্জ উপজেলার গন্ধ্যর্বপুর ইউপির বিল্লাল হুসাইন, পটুয়াখালির মরিচবুনিয়া ইউপির আ. কাদের খান, সিলেটের জালালাবাদ ইউপির জালাল আহমেদ, মহেশখালির কালারমারছড়া ইউপির মীর কাশেম চৌধুরী, ফুরফুরের রামভদ্রপুরের রোকনুজ্জামান, নলছিটির মগড় ইউপির কাজী আমিনুল ইসলাম, বগুড়ার শাখারিয়া ইউপির আবু সুফিয়ান প্রমুখ।