কলকাতার রাস্তায় অচেনা এক গাড়িওয়ালা

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০১৪, ১৫:৩২

পরিচালকের প্রথম চলচ্চিত্র হিসাবে ছবিটি কান চলচ্চিত্র উত্সবে পাঠানোর একটা সাহস করে ফেললাম, দেশে ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফারের তেমন কোন সুযোগ না থাকায় প্রবাসী একজনের সহায়তায় ফি জমা দিয়ে ফর্ম পূরণ করে পাঠানোর প্রস্তুতি নিলেও শেষ সময়ে কোন লজিসটিক্স এক্সপ্রস সার্ভিস ফিল্মের ডিভিডি বিদেশে প্রেরণে রাজী হয়নি। পৃথিবীর এখন বেশীরভাগ ফেস্টিভ্যালেই এন্ট্রি ফি জমা দিতে হয়, অথচ বাংলাদেশে আজও চালু হয়নি পেপ্যাল সার্ভিস। এসব প্রতিবন্ধকতার ভেতর দিয়েই কিছু কিছু উত্সবে ‘গাড়িওয়ালা’ পাঠাতে থাকি। প্রথম সুখবরটি আসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ থেকে। সেখানে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে সারা পৃথিবী থেকে বেছে নেয়া ১১টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে ‘গাড়িওয়ালা’ মনোনীত হয়, যা অনুষ্ঠিত হয় গত ১৯ থেকে ২৪ অক্টোবর। ছবিটির ‘ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার’ হয় সেখানেই। সেখানে সশরীরে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার, ফিল্মমেকিং নেশন না হলেও ওরা ফেস্টিভ্যালগুলোতে প্রচুর অর্থ খরচ করে বিশাল আয়োজন করে, পুরো শারজাহ শহর ছিল সাজানো, শুধু এই উত্সবকে কেন্দ্র করে। ইংরেজি সাবটাইটেলের পাশাপাশি উত্সব-কর্তৃপক্ষ আরবীতেও সাবটাইটেল এর ব্যবস্থা করেছিলেন ‘গাড়িওয়ালা’ প্রদর্শনে, যেখানে আরবের দর্শকই ছিল বেশি।
২০তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে বাংলাদেশ থেকে ‘গাড়িওয়ালা’ নির্বাচিত হয় প্রদর্শনের জন্য। উত্সবটি এ যাবতকাল পর্যন্ত নন-কমপিটিটিভ থাকলেও এ বছরই প্রথম শুধুমাত্র নারী-নির্মাতাদের জন্য একটি প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা রেখেছে (যদিও এর আগে নেটপ্যাক পুরষ্কার, যা একটি সংস্থা থেকে দেয়া হয়, তা জয়ী হয়ে বাংলাদেশের অনেক মিডিয়াতে হেডলাইন করা হয়েছে এইভাবে যে,‘কলকাতা উত্সবের শ্রেষ্ঠ ছবির পুরষ্কার পেল বাংলাদেশের .... ’ , যা চরম মিথ্যাচারিতা )। ‘গাড়িওয়ালা’ চিলড্রেন স্ক্রিনিং ক্যাটাগরিতে জমা দেয়া হয়েছিল।
উত্সবে শুধু একজন চিত্রপরিচালক হিসেবেই নয়, আমাকে বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগ দিতে চিঠি পাঠিয়েছিলেন উত্সব পরিচালক, আর ভিসা-প্রসেসিং দ্রুত করার নির্দেশ দিয়ে ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনারকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্যসচিব। সারা পৃথিবী থেকে মোট ৪০ জন বিদেশি নাগরিককে অফিসিয়ালি আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, হারাধনের সাতটি ছেলের মত বাংলাদেশ থেকে ছিলাম একমাত্র আমি। গত ৯ নভেম্বর রাতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর সাথে সাথেই উত্সব-প্রতিনিধিদের সাদর সম্ভাষণে পৌঁছে যাই হোটেল হিন্দুস্তান ইন্টারন্যাশনালে।
 ১০ নভেম্বর সকালে আমার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল আমার সহধর্মিনী পশ্চিমবঙ্গের কথাসাহিত্যিক কাবেরী রায়চৌধুরী। বিকালের দিকে কিছু ভলান্টিয়ার এসে আমাদের একটি গাড়িতে করে নিয়ে যান নেতাজী ইনডোর স্টেডিয়ামের দিকে। দু’টো স্টেজ করা হয়েছিল পাশাপাশি। একটি মূল উদ্বোধনের মঞ্চ, আরেকটি সাংস্কৃতিক পরিবেশনা মঞ্চ। পরমব্রত ও জুন মালিয়ার উপস্থাপনায় শুরু হয় অনুষ্ঠান। শুরুতেই সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ছিল আমার জীবনে দেখা শ্রেষ্ঠ পরিবেশনার একটি। এত বড় ওস্তাদ-শিল্পীদের পরিবেশনা এত কাছ থেকে দেখবো তা ভাবিনি ওস্তাদ রশিদ আলি খান, বিক্রম ঘোষ পণ্ডিত তেজেন্দ্র নারায়ণ, ঊষা উত্থুপ।  বিশ্বচলচ্চিত্রের প্রতি ট্রিবিউট করে তাদের একেকটি পরিবেশনা সবাইকে স্তম্ভিত করে দেয়। সবশেষে একটা যুগলবন্দীতে অংশগ্রহণ করে প্রায় সকল দর্শক, সেটা মনোমুগ্ধকর। উদ্বোধনী মঞ্চে যোগ দেন অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান, জয়া বচ্চন, অভিষেক বচ্চন, ঐশ্বরিয়া রাই, তনুজা, মৌসুমী চ্যাটার্জি, তনুজা, ইরফান খান, অমল পালেকর,
সুপ্রিয়া দেবী, সন্ধ্যা রায়, রঞ্জিত মল্লিক, প্রসেনজিত্, মুনমুন সেন, গৌতম ঘোষ, সুজিত সরকারসহ অনেকে। ছিলেন প্রধান অতিথি অস্ট্রেলিয়ার চলচ্চিত্রনির্মাতা পল কক্স। ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। আনন্দঘণ সেই আয়োজনে প্রধান আকর্ষণ ছিল বলিউডের অভিনেতাদের বাংলায় ভাষণ দেওয়ার প্রচেষ্টা। আনুষ্ঠানিক তো বটেই, অনানুষ্ঠানিকভাবেও মঞ্চের উপরেই শাহরুখ এর শিষ্টাচার বা জুনিয়র শিল্পীদের সিনিয়র শিল্পীদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা ছিল দেখার মত। টালিউডের বর্তমানের জনপ্রিয় নায়ক ও নায়িকাদের জায়গা হয়েছিল শুধুমাত্র অতিথিদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেবার। রাইমা সেন ছিলেন প্রদীপ জ্বালানোর ‘থালিগার’। অনুষ্ঠানশেষে সবাইকে গ্রুপ ছবি তোলার আমন্ত্রণ জানানো হয়, তেমন একটি সেলফি নিয়ে বাংলাদেশের মিডিয়াগুলোতে গূরত্বের সঙ্গে সংবাদ প্রকাশ করা হয়, এমনকি বাংলাদেশ থেকে নির্বাচিত একমাত্র পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটিকে উল্লেখ না করেও (বাংলাদেশ থেকে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রও প্রদর্শন করা হয়েছে বলে জেনেছি পরে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে, যদিও ফেস্টিভ্যালের কোন শিডিউল, ব্রোশিওর, বুলেটিন এ এর কোন উল্লেখ ছিল না, শুধু দেড় শতাধিক শর্ট ও ডকুমেন্টরী ফিল্ম দেখানো হবে, এটা উল্লেখ করা ছিল)। এরপরেই শুরু হয় উদ্বোধনী ছবি ‘ইতালো বারোক্কো’। ওইদিন উদ্বোধন শেষে আমাদের আমন্ত্রণ ছিল অতিথিদের সম্মানে একটি ডিনার পার্টির ।
(আগামীকাল সমাপ্য)