স্বাধীনতার ৪৩ বছরে এসে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা এবং সংখ্যা নিয়ে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এতে মুক্তিযোদ্ধারা পরিচয় সংকটে পড়েছেন। বারবার মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা ও নির্ভুল তালিকা নির্ধারণ করতে গিয়ে এ সংকট আরো বেড়েছে। বঙ্গবন্ধুর শাসনকালে ১৯৭২ সালে ঘোষিত ‘দি বাংলাদেশ (ফ্রিডম ফাইটারস) ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট অর্ডার’ অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা ১৯৭৫ সালের পর পরিবর্তিত হয়েছে। পরবর্তীতে একেক সময় এক এক ধরনের সংজ্ঞা প্রবর্তন করা হয়েছে। সর্বোপরি এ ব্যাপারে কোন সুনির্দিষ্ট আইন প্রবর্তন না হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে নতুন নতুন বির্তকের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সরকারের জারি করা বিভিন্ন আদেশ-নির্দেশ ও কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) হেলাল মোর্শেদ খান বীর বিক্রম ইত্তেফাককে বলেন, ‘কারা মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে চিহ্নিত হবেন, সেটি ১৯৭২ সালের অর্ডারে স্পষ্ট রয়েছে। এটি নিয়ে বারবার বিতর্ক সৃষ্টি করে মুক্তিযোদ্ধাদের হেয় করা হচ্ছে।’ তার মতে, মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণের কিছু নেই। এটি নির্ধারিত আছে।
মুক্তিযোদ্ধার প্রথম সংজ্ঞা : মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা সম্পর্কে ১৯৭২ সালের অর্ডারে ইংরেজি ভাষায় বলা হয়েছে (যেটি এখনো বহাল) : ‘ফ্রিডম ফাইটারস (এফএফ) মিনস এ্যানি পারসন হু হ্যাড সারভড অ্যাজ মেম্বার অফ এ্যানি ফোর্স অ্যানগেজড ইন দি ওয়্যার অফ লিবারেশন।’ অর্থাত্ মুক্তিযোদ্ধা মানে এমন একজন ব্যক্তি যিনি মুক্তিযুদ্ধে নিয়োজিত যে কোন সংগঠিত দলের (ফোর্স) সদস্য হিসাবে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। কেউ যদি মুক্তিযুদ্ধে নিয়োজিত কোন সংগঠিত দলের সদস্য না হন বা হয়েও যদি সক্রিয় ভূমিকা না রাখেন তিনি মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় পড়বেন না।
গণকর্মচারী মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা: ২০০৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধা গণকর্মচারীদের অবসরের বয়স বাড়ানোর পর ২০১০ সালের ৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তত্কালীন সচিব মোল্লা ওয়াহেদুজ্জামান একটি পরিপত্র জারি করেন। এতে কারা মুক্তিযোদ্ধা গণকর্মচারী হবেন তার চারটি সংজ্ঞা বা মানদণ্ড দেয়া হয়। এগুলো হচ্ছে: যারা চাকরিতে প্রবেশের সময় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন অথবা যাদের নাম মুক্তিবার্তায় প্রকাশিত হয়েছিল অথবা মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে যাদের নাম গেজেটে প্রকাশ হয়েছিল অথবা যাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সই করা সনদ রয়েছে। সেসময় এ চারটির যে কোন একটি শর্তে মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার সুযোগ পান মুক্তিযোদ্ধা গণকর্মচারীরা। যদিও এখন আবার বলা হচ্ছে, চাকরিতে প্রবেশের সময় মুক্তিযোদ্ধার কোটা সুবিধা না নিলে এখন তিনি মুক্তিযোদ্ধার সুবিধা পাবেন না।
মুক্তিযোদ্ধার চলমান সংজ্ঞা: ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে যে সংজ্ঞার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত করছে তা হল: যাদের নাম লালবইতে (মুক্তিযোদ্ধা সংসদে সংরক্ষিত) আছে, যাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিস্বাক্ষরিত সনদ আছে এবং মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টে রক্ষিত ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের তালিকায় যাদের নাম আছে।
নতুন সংজ্ঞা: এদিকে মুক্তিযোদ্ধার নতুন আরেকটি সংজ্ঞা তৈরি করা হয়েছে। অবশ্য এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এখনো অনুমোদন পায়নি। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বে পুনর্গঠিত জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের একটি উপ-কমিটি এ সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছে। এ কমিটির প্রধান সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও প্রতিমন্ত্রী মোতাহার হোসেন। উপ-কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধা তারাই, যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করে ভারতের কোন ট্রেনিং ক্যাম্পে নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন, লাল মুক্তিবার্তায় যাদের নাম আছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিস্বাক্ষরিক সনদ যাদের আছে, যেসব বাংলাদেশি পেশাজীবী বিদেশে অবস্থানকালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিভিন্নভাবে সক্রিয় অবদান রেখেছেন এবং যারা বিশ্বজনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছেন, যারা মুজিবনগর সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিলেন, সেনা, নৌ, বিমান ও আনসার বাহিনীর যে সকল সদস্য মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এমএনএ ও এমপিএ, পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের হাতে নির্যাতিতা বীরাঙ্গনা (নারী মুক্তিযোদ্ধা), স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবাদানকারী ডাক্তার-নার্স, অস্থায়ী সরকারের দাপ্তরিক কাজে নিয়োজিত কর্মচারী এবং মুক্তিযুদ্ধকালে গঠিত সংগ্রাম কমিটির জেলা, মহকুমা ও থানা কমিটির সংগঠকবৃন্দ। এছাড়া কমিটি আরো সিদ্ধান্ত নেয়, মুক্তিযোদ্ধা সনদের জন্য আবেদনকারীর বয়স মুক্তিযুদ্ধের সময় কমপক্ষে ১৫ বছর হতে হবে। তবে যারা চাকরিতে প্রবেশের সময় মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে নিজেদের ঘোষণা দেননি তারা মুক্তিযোদ্ধা বলে গণ্য হবেন না।
অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, ১৯৭২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা ও সংখ্যা নির্ধারণে ভিন্নতা রয়েছে। আবার কোন সংজ্ঞা নির্ধারণেই ৭২ এর নির্দেশ পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়নি। আর এটি না করায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কারা তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কত: এছাড়া মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পর সেক্টর কমান্ডার ও সাবসেক্টর কমান্ডারদের প্রকাশনা থেকে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধে নিয়মিত বাহিনীর সংখ্যা ছিল ২৪ হাজার ৮০০ এবং অনিয়মিত বাহিনীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭ হাজার। অর্থাত্ মোট ১ লাখ ৩১ হাজার ৮০০ জন।
আবার মুক্তিযুদ্ধকালীন সেক্টর বিলুপ্তির পর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রশিক্ষণ ও রেকর্ড সংরক্ষণ প্রতিষ্ঠান ইবিআরসিতে স্থানান্তরিত দলিলে দেখা যায়, মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৭০ হাজার ৮৯৬ জন। এক্ষেত্রে আগের তালিকার বাকি ৬০ হাজার ৯০৪ জনের খোঁজ পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তত্কালীন ডিজি মমিনউল্লাহ পাটোয়ারির নেতৃত্বে জেলা ও উপজেলা কমান্ডারদের নেতৃত্বে গঠিত যাচাই-বাছাই কমিটির মাধ্যমে তৈরি একটি মুক্তিযোদ্ধা তালিকা সংসদ কার্যালয়ে সংরক্ষণ করা হয়। এটিই এখন লালবই নামে পরিচিত। এতে ১ লাখ ৫৪ হাজার মুক্তিযোদ্ধার নাম রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদসূত্র জানায়, ইবিআরসিতে সংরক্ষিত অনেক মুক্তিযোদ্ধার নাম এই তালিকায় নেই। অর্থাত্ এ তালিকাটিও অসম্পূর্ণ।
বিএনপি-জামায়াত আমলের মুক্তিযোদ্ধা : ২০০১ সালে দেশে ক্ষমতায় আসে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। সে সময়ে আগের নীতি বাদ দিয়ে তত্কালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির সুপারিশে মুক্তিযোদ্ধা সংসদকে বাদ রেখে ইউএনও ও ডিসিদের নিয়ে উপজেলা ও জেলা যাচাই-বাছাই কমিটি করা হয়। তাদের সুপারিশের ব্যক্তিরাই মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যান। এভাবে ২০০৩ ও ২০০৪ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করে দুটি গেজেট প্রকাশ করা হয়। এর একটি ছিল বিশেষ গেজেট; যেখানে সামরিক বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল ৩৯ হাজার এবং অপর গেজেটে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ৫৯ হাজার। দুটি মিলে তখন মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৯৮ হাজার জনে। অর্থাত্ জোট সরকারের সময় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বাড়ে ৪৪ হাজার। যা ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভুয়া বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। অবশ্য আওয়ামী লীগও ক্ষমতায় এসে বিএনপির নীতিমালা মেনে ১১ হাজার ৫০০ জনকে মুক্তিযোদ্ধার সনদ দেয়। এর মধ্যেও অনেকের সনদ জাল বলে এখন ধরা পড়ছে।
প্রসঙ্গত, ২০০২ সালে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার জন্য আইন করা হয়। এ আইনে প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান উপদেষ্টা রেখে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ে কাউন্সিল গঠনের বিধান করা হয়। এই কাউন্সিলকেই দেয়া হয় সংজ্ঞা নির্ধারণসহ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা অনুমোদনের চূড়ান্ত ক্ষমতা। এ ধারা এখনও বহাল রয়েছে।