দুই বছর আগে আজকের এই দিনে সাভারের তাজরীন ফ্যাশনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহত হন ১১২ জন শ্রমিক। গুরুতর আহত হন দুই শতাধিক। অথচ এখনো পর্যন্ত এঘটনায় প্রকৃত অর্থে কে দায়ী তা চিহ্নিত করা যায়নি। এদিকে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠান সলিডারিটি সেন্টারের হিসাবে তাজরীনে অগ্নিকাণ্ডের পর দেশের বিভিন্ন গার্মেন্টসে ছোট-বড় ৬২টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে ২৭ জন নিহত ও আহত হয়েছেন ৮শ’ জন। বলা চলে, দেশের গার্মেন্টস কারখানাগুলো এখনো ঝুঁকিমুক্ত হয়নি।
এই দুই বছরে নিহতদের পরিবার কিছু ক্ষতিপূরণ পেলেও আহত শ্রমিকদের ভাগ্যে যন্ত্রণা আর কষ্ট ছাড়া তেমন কিছুই জোটেনি। দু’মুঠো আহার যোগানোই এখন তাদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি চিকিত্সা পর্যন্ত করতে পারছেন না আহত শ্রমিকরা।
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের জরিনা আক্তার কাজ করতেন তাজরীন ফ্যাশনের পঞ্চম তলায়। আগুন লাগার পর তিন তলার জানালা ভেঙ্গে অনেকের মত তিনিও লাফিয়ে পড়েন নিচে। মেরুদণ্ডের হাড় আর ডান পা ভেঙ্গে যায় তার। ১৪ মাস চিকিত্সাধীন সময়ে প্রতি মাসে চার হাজার টাকা করে পেতেন। কিছুটা সুস্থ হয়ে বাসায় ফেরার পর পেয়েছেন ১ লাখ টাকা। এর বাইরে আর কোন টাকা পাননি। জরিনা বলেন, ডাক্তার নিষেধ করেছে ভারী কাজ না করতে। ডান পা এখনো ঠিক হয়নি। গার্মেন্টসের কাজ করতে পারব না। ওই শক্তিও নেই। নিজের চিকিত্সা আর থাকার জন্য সব টাকা খরচ করেছি। কেউ সাহায্যও করে না। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বলেন, স্বামীও এখন আর খোঁজ নেয় না।
জরিনার মত এমন কষ্ট মেনে নিশ্চিন্তপুর এলাকায় আরো অন্তত শ’খানেক তাজরীনের শ্রমিক বসবাস করছেন। আলেয়া নামে এক শ্রমিক ৫ তলা থেকে লাফ দিয়ে পার্শ্ববর্তী টিনের চালে পড়ে ঘাড় আর মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পান। কোমরের হাড় ভাঙ্গে। তিনিও দুই মেয়ে নিয়ে সাভারের নিশ্চিন্তপুর এলাকায় থাকেন। বলেন, কোন কিছু মনে রাখতে পারি না। চিত্কার-চেঁচামেচি, অন্ধকার ভালো লাগে না। মাথা ব্যথা করে। ১ লাখ টাকা পেয়েছি। কিন্তু নিজের বাসায় আসার পর এতদিনে সব টাকা খরচ হয়ে গেছে। সমপ্রতি ডাক্তারের কাছে গেলে নতুন করে মাথার সিটি-স্ক্যান করার জন্য বলেছে। টাকার অভাবে তাও পারছি না। এছাড়া শাহানাজ, মুক্তা বানু, আলীমুরসহ অনেক আহত শ্রমিক এখনো নিশ্চিন্তপুর এলাকায় রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এর বাইরে যাদের গ্রামে থাকার সুযোগ ছিল তারা গ্রামে চলে গেছে।
নিহতদের পরিবার ক্ষতিপূরণের একটা অঙ্ক পেলেও আহতদের ক্ষতিপূরণকে অপর্যাপ্ত বলে মনে করছেন শ্রমিক নেতারা। শ্রমিক অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, তাজরীনের আহত শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ফলোআপ চিকিত্সা হচ্ছে না। এ বিষয়ে কেউ দায়িত্বও নিচ্ছে না। অথচ সেই তুলনায় রানা প্লাজার শ্রমিকরা ভালো ক্ষতিপূরণ পেতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আহত ও নিহতদের ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে একটা সাধারণ মানদণ্ড থাকা দরকার। তাজরীনের আহত শ্রমিকরাও যাতে অন্তত রানা প্লাজার শ্রমিকদের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ পায়, সে দাবি আমরা তুলবো।
ক্ষতিপূরণের হিসাব
তাজরীন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহত ১১২ শ্রমিকের মধ্যে লাশ শনাক্ত না হওয়ায় ৪৯ জন শ্রমিকের ডিএনএ নমুনা রেখে রাজধানীর জুরাইন কবরস্থানে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছিল। পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ দাবি করেছে, সব মিলিয়ে ১০৯ জনের লাশ শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের পরিবারকে ৭ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণের অর্থ দেয়া হয়েছে। এই টাকার বড় অংশই দিয়েছে ক্রেতা প্রতিষ্ঠান লি এন্ড ফাং। এর বাইরে গুরুতর আহতদের চিকিত্সা ছাড়াও ৯০ জনকে ১ লাখ টাকা করে দেয়া হয়েছে। এছাড়া বিজিএমইএ’র উদ্যোগে ৩৫ জন আহত শ্রমিককে একটি সেলাই মেশিন ও ৩০ হাজার করে টাকা দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে নিহতদের ৮৮টি এতিম শিশু সন্তানকে প্রতি মাসে ৪ হাজার টাকা করে দেয়া হচ্ছে। এই অর্থ তাদের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত দেয়া হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষতিপূরণের এই অর্থ অপর্যাপ্ত। বর্তমান আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের পরিমাণ একেবারেই কম। গুরুতর আহত শ্রমিকদের লস অব আর্নিংসের (ভবিষ্যতে সম্ভাব্য আয়ের ক্ষতি) হিসাবে ক্ষতিপূরণ দেয়া দরকার।
বিচার প্রক্রিয়ায় ধীরগতি : আগুন লাগার পর শ্রমিকরা অভিযোগ করেছিল, তারা বের হতে চাইলেও মূল গেইট বন্ধ থাকায় তারা বের হতে পারেননি। ফলে অনেকে পুড়ে মারা গেছেন। ঘটনার দুই বছর পার হলেও শ্রমিকদের এই অভিযোগের বিষয়টির কোন সুরাহা হয়নি। তাজরীনে আগুন কি নিছক দুর্ঘটনা না নাশকতা তাও এখনো পরিষ্কার হয়নি।
কারখানার মালিক দেলোয়ার হোসেনকে গ্রেফতার করে জেলে নেয়া হলেও জামিন পেয়ে তিনি এখন বাইরে রয়েছেন। এক হিসাবে জানা গেছে, ১৯৯০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ছোট বড় অন্তত ১০০টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৮ শতাধিক শ্রমিক নিহত ও কয়েক হাজার শ্রমিক আহত হয়েছেন। কিন্তু কোন ঘটনারই সুষ্ঠু বিচার হয়নি।
সংগঠনটির সভাপতি বাহারানে সুলতান বলেন, এ পর্যন্ত কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের কোন বিচার হয়নি। কেবল তাজরীনের মালিক কিছুদিন জেল খেটেছেন। সুষ্ঠু তদন্ত করে বিচার চেয়েছি। কিন্তু দুই বছর পার হলেও আজো বিচার পাইনি।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর আজ বিক্ষোভ
তাজরীন অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবিতে আজ বিক্ষোভ সমাবেশ করবে বেশ কিছু গার্মেন্টস শ্রমিক সংগঠন। সাভারে তাজরীন ফ্যাশনের সামনে বিক্ষোভ করবে নিহতের পরিবার ও আহত শ্রমিকরা। সেখানে গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতিসহ কয়েকটি সংগঠন প্রতিবাদ সমাবেশ করবে। এছাড়া জুরাইন কবরস্তানে নিহত শ্রমিকদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি ও প্রতিবাদ সমাবেশ করবে শ্রমিক সংগঠনগুলো।